[* সংযুক্ত, ঝুলন্ত, রক্ত, রক্তপিণ্ড ইত্যাদি। তফসীরকারগণ এর অর্থ রক্তপিণ্ড করেছেন। কিন্তু আধুনিক জীববিজ্ঞানীগণ মাগর্ভে জ্বণের ক্রমকিবাশের বর্ণনায় বলেন যে, পুরুষের শুক্র ও নারীর ডিম্বানু মিলিত হয়ে যে জ্বণের সৃষ্টি হয় তা গর্ভধারণের পঞ্চম বা ষষ্ঠ দিনে জরায়ু গাত্র সংলগ্ন হয়ে পড়ে এবং এই সম্পৃক্তি সংঘটিত না হলে গর্ভাধান স্থায়ী হয় না। একারণে বর্তমানে ‘আলাক’ শব্দের অনুবাদ করা হয় এমন কিছু যা লাগিয়া থাকে। সূত্র আল-কুরানুল করীম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ।
** মুহাম্মদ (স)-এর ৪০ বছর বয়সে প্রতি হেরা গুহায় এই সুরার প্রথম পাঁচটি আয়াত সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়। এটাই প্রথম প্রত্যাদেশ ।]
আরবী ভাষায় প্রথমবারের মতো ঈশ্বরের বাণী উচ্চারিত হয়েছিল। এই ঐশীগ্রন্থটি শেষ পর্যন্ত কুরান: আবৃত্তি নামে পরিচিত হয়ে উঠবে।
আতঙ্ক ও বিতৃষ্ণায় সজাগ হয়ে ওঠেন মুহাম্মদ (স); একজন তুচ্ছ ঘৃণিত কাহিনে পরিণত হয়েছেন ভেবে শঙ্কা বোধ করেছেন তিনি, লোকে উট হারালে পরামর্শ করার জন্যে কাহিনদের কাছে যেত। কাহিনের ওপর জিনের আসর হয়েছে বলে মনে করা হতো, এক ধরনের পরী যারা সারা এলাকা ঘুরে বেড়ায়, এরা খুব খেয়ালি হতে পারে, মানুষকে ভুল পথে টেনে নিতে পারে। কবিরাও নিজেদের জিনের আসরগ্রস্ত মনে করতেন। এভাবে হাসান ইবন সাবিত নামে ইয়াসরিবের এক কবি, যিনি পরে মুসলিম হয়েছিলেন, বলেছেন যে, তিনি যখন কবিত্ব অর্জন করেন তখন তাঁর জিন আবির্ভূত হয়ে তাকে জোর করে মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে মুখ দিয়ে অনুপ্রাণিত কথামালা বের করিয়েছিল। কেবল এধরনের অনুপ্রেরণার সঙ্গেই মুহাম্মদ (স) পরিচিত ছিলেন। নিজেই হয়তো একজন জিনের আসরগ্রস্ত মজনুন-এ পরিণত হয়েছেন, এই চিন্তা তাঁকে এমন হতাশায় পূর্ণ করে দিয়েছিল যে বেঁচে থাকার ইচ্ছাশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। কাহিনদের আগাগোড়া ঘৃণা করতেন মুহাম্মদ (স), এদের ভবিষ্যদ্বাণীগুলো সাধারণত দুর্বোধ্য প্রলাপের মতো ছিল, তিনি সবসময় কোরানকে আরবের প্রচলিত কবিতা হতে স্বতন্ত্র বোঝাতে যত্নবান ছিলেন। এবার গুহা থেকে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে এসে পাহাড়-চূড়া থেকে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত। নিয়ে ফেললেন তিনি। কিন্তু পাহাড়ের পাশে আবার এক সত্তার মুখোমুখি হয়েছিলেন, যাকে তিনি পরে জিব্রাইল বলে শনাক্ত করেছেন:
আমি যখন পাহাড়ের মাঝামাঝি জায়গায় পৌঁছেছি, আকাশ থেকে ভেসে আসা একটা কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম: “হে মুহাম্মদ! আপনি আল্লাহর পয়গম্বর এবং আমি জিব্রাইল!’ কে কথা বলছে দেখার জন্যে আকাশের দিকে তাকালাম, আর অদ্ভুত ব্যাপার, মানুষের রূপ ধরে দিগন্তে দাঁড়িয়ে আছেন জিব্রাইল…তার দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম আমি, সামনেও যেতে পারছিলাম না, পেছনেও না; এবার তার ওপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিলাম, কিন্তু আকাশের যেদিকেই তাকাই, দেখি আগের মতোই দাঁড়িয়ে আছেন তিনি।
ইসলামে জিব্রাইলকে প্রায়ই প্রত্যাদেশের পবিত্র আত্মা হিসাবে শনাক্ত করা হয়ে থাকে যার মাধ্যমে আল্লাহ্ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ইনি কোনও সাধারণ প্রাকৃতিক দেবদূত নন, বরং এক সীমাহীন সর্বব্যাপী উপস্থিতি, যার কাছ থেকে পলায়ন অসম্ভব। ঐশ্বরিক সত্তার অপরিমেয় উপলব্ধি অর্জন করেছিলেন মুহাম্মদ (স), হিব্রু পয়গম্বরগণ যাকে কাদ্দোশ, পবিত্রতা, ঈশ্বরে ভীতিকর অন্যরূপ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। এই উপলব্ধি অর্জনের সময় তাঁরাও মৃত্যুর কাছাকাছি এবং শারীরিক ও মানসিক পর্যায়ে চরম অবস্থার বোধে আক্রান্ত হয়েছেন। কিন্তু ইসায়াহ্ বা জেরেমিয়ার বিপরীতে, মুহাম্মদ (স)-এর সমর্থন পাওয়ার মতো প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যের কোনও সান্ত্বনার স্থল ছিল না, যেন বিনা মেঘে বজ্রপাতের যন্ত্রণায় নিজের অজান্তেই স্ত্রী খাদিজার শরণাপন্ন হলেন মুহাম্মদ (স) ।
থরথর কাঁপতে কাঁপতে চার হাত-পায়ে হামাগুড়ি দিয়ে খাদিজার কোলে আঁপিয়ে পড়লেন মুহাম্মদ (স)। আমাকে আবৃত্ত করো!’ আবৃত্ত করো!’ স্বর্গীয় সত্তার কবল হতে নিজেকে আড়াল করার জন্যে জোর গলায় চেঁচালেন । আতঙ্ক খানিকটা প্রশমিত হওয়ার পর মুহাম্মদ (স) খাদিজার কাছে জানতে চাইলেন সত্যিই তিনি মজনুনে পরিণত হয়েছেন কিনা। ঝটপট তাকে আশ্বস্ত করেন খাদিজা: ‘আপনি আপনার আত্মীয়স্বজনদের প্রতি সহানুভূতিশীল। আপনি দরিদ্র ও অবহেলিতকে সাহায্য করেন, তাদের ভার বহন করেন। আপনি আপনার জাতির হারিয়ে যাওয়া উন্নত নৈতিক চরিত্রের পুন:প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন। অতিথিদের আপনি সম্মান দেখান, দুর্গতদের সাহায্যে এগিয়ে যান। এমনটা হতে পারে না, প্রিয়তম! ঈশ্বর এমন খামখেয়ালি আচরণ করেন না । খাদিজা বর্তমানে ক্রিশ্চান ও ঐশীগ্রন্থ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ তাঁর চাচাত ভাই ওয়ারাকা ইবন নওফলের সঙ্গে আলোচনার পরামর্শ দিলেন। ওয়ারাকার মনে সন্দেহের বিন্দুমাত্র অবকাশ ছিল নাঃ মুহাম্মদ (স) মোজেস এবং অন্য পয়গম্বরদের ঈশ্বরের কাছ থেকে প্রত্যাদেশ পেয়েছেন, আরবদের জন্যে স্বর্গীয় দূতে পরিণত হয়েছেন। শেষ পর্যন্ত, কয়েক বছর পেরুনোর পর মুহাম্মদ (স) নিশ্চিত হন যে, আসলেও ব্যাপারটা তাই; কুরাইশদের মাঝে প্রচারণা শুরু করেন তিনি, তাদের নিজস্ব ভাষার এক ঐশীগ্রন্থ উপহার দেন।
