সুতরাং আধ্যাত্মিক দিক থেকে হীনম্মন্যতার এক ব্যাপক বোধ কাজ করছিল। আরবরা যেসব ইহুদি ও ক্রিশ্চানের সংস্পর্শে আসত তারা ঈশ্বরের কাছ থেকে প্রত্যাদেশ না পাওয়ায় তাদের বর্বর জাতি বলে ক্ষেপাত। আরবরা তাদের চেয়ে বেশি জ্ঞানের অধিকারী এসব লোকদের প্রতি একধরনের মিশ্র অসন্তোষ আর শ্রদ্ধা বোধ করত। ইহুদিবাদ ও খৃস্টধর্ম এ অঞ্চলে খুব বেশি সাফল্য অর্জন করতে পারেনি যদিও, আরবরা ধর্মের এই অগ্রসর রূপকে নিজেদের প্রচলিত পৌত্তলিকতাবাদের চেয়ে উচ্চতর বলে স্বীকার করত। মক্কার উত্তরে ইয়াসরিব (পরবর্তীকালে মদিনা] ও ফাদাক নামের বসতিতে অজ্ঞাত উৎসের কিছু ইহুদি গোত্রের বাস ছিল; এবং পার্সিয়ান ও বাইযান্তাইন সাম্রাজ্যের মধ্যবর্তী সীমান্ত এলাকার উত্তরাঞ্চলীয় গোত্রগুলোর কিছু কিছু গোত্র মনোফিসাইট বা নেস্টোরিয়ান খৃস্টধর্ম গ্রহণ করেছিল। কিন্তু বেদুঈনরা মারাত্মক রকম স্বাধীনচেতা ছিল, তারা ইয়েমেনি ভাইদের মতো পরাশক্তির শাসনাধীনে না যাবার ব্যাপারে ছিল দৃঢ়প্রতিজ্ঞ; তারা এটাও বুঝতে পেরেছিল যে পারসিয় ও বাইয়ান্তাইন উভয় এলাকাই সাম্রাজ্য বিস্তারের স্বার্থে ইহুদিবাদ ও খৃস্টধর্মকে ব্যবহার করছে। সম্ভবত তারা সহজাত প্রবৃত্তির বশে এও বুঝেছিল যে নিজস্ব ঐতিহ্য ক্ষয়ে যাওয়ায় সাংস্কৃতিকভাবে যথেষ্ট স্থানচ্যুতির স্বীকার হয়েছে তারা; আর যাহোক বিদেশী ভাষা ও ঐতিহ্যের আশ্রয়ে বিদেশী কোনও মতাদর্শ অন্তত চায়নি তারা।
আরবদের কেউ কেউ যেন সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে সংস্রবহীন অধিকতর নিরপেক্ষ একশ্বেরবাদের একটা ধরন আবিষ্কারের প্রয়াসে নিয়েজিত ছিল। পঞ্চম শতাব্দীতে প্যালেস্তাইনি ক্রিশ্চান ইতিহাসবিদ সোযোমেনোস আমাদের জানাচ্ছেন, সিরিয়াবাসী আরবদের কেউ কেউ তাদের ভাষায় আব্রাহামের সত্য ধর্ম পুনরাবিষ্কার করেছিল। ঈশ্বর তোরাহ্ বা গস্পেল প্রেরণের আগেই এসেছিলেন আব্রাহাম, সুতরাং তিনি ইহুদি বা ক্রিশ্চান কোনওটাই ছিলেন না। মুহাম্মদ (স) তাঁর নিজস্ব পয়গম্বরত্বের আহ্বান পাওয়ার অল্পদিন আগে, তার প্রথম জীবনীকার মুহাম্মদ ইবন ইসহাক (মৃ. ৭৬৭) আমাদের জানাচ্ছেন যে, মক্কার চারজন কুরাইশ আব্রাহামের সত্য ধর্ম হানিফায়ার সন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কোনও কোনও পশ্চিমা পণ্ডিত এই ক্ষুদ্র হানিফায়াহ্ দলটিকে জাহিলিয়াহ্র সময়ের আধ্যাত্মিক অস্থিরতার প্রতীক ধর্মীয় কাহিনী বলে যুক্তি দেখিয়েছেন, কিন্তু এর কিছু ঐতিহাসিক বাস্তবতা থাকতে বাধ্য। চারজন হানিফের মধ্যে তিনজন প্রথম দিকের মুসলিমদের সুপরিচিত ছিলেন: উবায়দাল্লাহ ইবন জাহশ ছিলেন মুহাম্মদ (স)-এর চাচাত ভাই, ওয়ারাকা ইবন নওফল, যিনি পরে খৃস্টধর্ম গ্রহণ করেন, ছিলেন মুহাম্মদের (স) প্রথমদিকের আধ্যাত্মিক পরামর্শক এবং যায়েদ ইবন আমর ছিলেন মুহাম্মদের (স) অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহচর এবং ইসলামি সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় খলিফা উমর ইবন আল খাত্তাবের চাচা। একটা গল্প প্রচলিত আছে: আব্রাহামের ধর্মের সন্ধানে মক্কা ত্যাগ করে সিরিয়া ও ইরাকের পথে রওনা দেওয়ার আগে যায়েদ একদিন কাবাহগৃহের দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে উপাসনাগৃহকে ঘিরে প্রাচীন কায়দায় প্রদক্ষিণরত কুরাইশদের উদ্দেশে বলছিলেন: “হে কুরাইশগণ, যার হাতে যায়েদের আত্মা তার দোহাই, আমি ছাড়া তোমাদের আর কেউই আব্রাহামের ধর্ম অনুসরণ করছ না।’ এরপর দুঃখের সঙ্গে আবার যোগ করেছেন, “হে খোদা, যদি জানতাম কীভাবে উপাসনা আপনার পছন্দ আমি সেভাবেই আপনার উপাসনা করতাম; কিন্তু আমি যে জানি না।
যায়েদের ঐশ্বরিক প্রত্যাদেশের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয় ৬১০ সালের রমজান মাসের সপ্তদশ রাতে, যখন মুহাম্মদ (স) ঘুম থেকে অকস্মাৎ জেগে উঠে এক সর্বগ্রাসী স্বর্গীয় উপস্থিতিতে নিজেকে আচ্ছন্ন অবস্থায় আবিষ্কার করেছিলেন। পরে এই অনির্বচনীয় অভিজ্ঞতাকে তিনি স্পষ্ট আরবীয় পরিভাষায় ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেছেন যে একজন দেবদূত তাঁর সামনে আবির্ভূত হয়ে জোরাল নির্দেশ দিয়েছেন: ‘আবৃতি কর’ (ইকরা)। হিব্রু পয়গম্বরগণ যেমন প্রায়শঃই ঈশ্বরের বাণী উচ্চারণে অনীহা দেখিয়েছেন, মুহাম্মদ (স) তেমনি প্রতিবাদ করে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, “আমি আবৃত্তিকার নই!’ তিনি কাহিন অর্থাৎ আরবের সেসময়ের অনুপ্রাণিত ভবিষ্যৎ-বক্তা গণক বা সন্যাসী ছিলেন না। কিন্তু, বলেছেন মুহাম্মদ (স), দেবদূত তাকে তীব্র আলিঙ্গনে আবদ্ধ করেন, তখন তাঁর মনে হয়ে ছিল বুঝি দম বেরিয়ে যাচ্ছে। যখন মনে হচ্ছিল আর সহ্য করতে পারবেন না, দেবদূত তাকে ছেড়ে দিয়ে আবার নির্দেশ দেন ‘আবৃত্তি কর? ইকরা! ফের আপত্তি জানান মুহাম্মদ (স) এবং আবার তাকে আলিঙ্গন করলেন দেবদূত, সহ্যের শেষ সীমা অতিক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত জাপ্টে ধরে রাখলেন। অবশেষে, তৃতীয় ভয়ঙ্কর মারাত্মক আলিঙ্গনের শেষ পর্যায়ে মুহাম্মদ (স) আবিষ্কার করলেন তাঁর মুখে এক নতুন ঐশীগ্রন্থের প্রথম শব্দগুলো উচ্চারিত হচ্ছে:
পাঠ, কর তোমার প্রতিপালকের নামে, যিদি সৃষ্টি করিয়েছেন-সৃষ্টি করিয়াছেন মানুষকে আলাক* হইতে। পাঠ কর, আর তোমার প্রতিপালক মহামহিমান্বিত, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়াছেন–শিক্ষা দিয়াছেন মানুষকে যাহা সে জানিত না**
