শ্ৰম-প্রক্রিয়ার দ্বিতীয় অংশে, যখন তার শ্রম আর আবশ্যিক শ্রম নয়, তখনো শ্রমিক, একথা সত্য, শ্রম করে, তার শ্রমশক্তি ব্যয় করে; কিন্তু যেহেতু তখন তার শ্রম আর আবশ্যিক শ্রম নয়, সে তার নিজের জন্য কোনো মূল্য সৃষ্টি করে না। সে সৃষ্টি করে উদ্বৃত্ত-মূল্য, ধনিকের কাছে যা শূন্য থেকে সৃষ্ট কোন কিছুর মতই মনোমুগ্ধকর। শ্রম-দিবসের এই অংশটিকে আমি বলি উদ্বৃত্ত শ্রম-সময়। এটা সর্বতোভাবে গুরুত্বপূর্ণ যে, উদ্ব-মূল্যকে সঠিকভাবে বোঝার জন্য আমরা তাকে ধারণা করি উদ্বৃত্ত-শ্রম-সময়ের ঘনীভূত রূপ হিসাবে, সে সত্যিই যা ঠিক সেই হিসাবে অর্থাৎ নিছক বাস্তবায়িত উত্ত শ্রম হিসাবে; মূল্যকে সঠিকভাবে বোঝার জন্য আমরা তাকে ধারণা করি এত ঘণ্টা শ্রমের ঘনীভূত রূপ হিসাবে, নিছক বাস্তবায়িত শ্রম হিসাবে। সমাজের বিভিন্ন অর্থ নৈতিক রূপের মধ্যে, যেমন দাস-শ্রমের উপরে ভিত্তিশীল সমাজ-রূপ এবং মজুরি শ্রমের উপরে ভিত্তিশীল সমাজ-রূপের মধ্যে মর্মগত পার্থক্য নিহিত থাকে কিভাবে প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে আসল উৎপাদকের কাছ থেকে তথা শ্রমিকের কাছ থেকে এই উদ্ধ মূল্য নিষ্কর্ষিত করা হয়, কেবল সেই পদ্ধতিটির মধ্যে।[৬]
যেহেতু, এক দিকে, অস্থির মূলধনের এবং সেই মূলধন দিয়ে ক্রীত শ্রমশক্তির মূল্য সমান এবং এই শ্রমশক্তির মূল্য নির্ধারণ করে শ্রম-দিবসের আবশ্যিক অংশ, এবং যেহেতু, অন্য দিকে, উদ্বৃত্ত-মূল্য নির্ধারিত হয় শ্রম-দিবসের উদ্ধৃত্ত-অংশের দ্বারা, সেই হেতু অনুসৃত হয় যে, আবশ্যিক শ্রমের সঙ্গে উত্ত-শ্রমের যে সম্পর্ক অস্থির মূলধনের সঙ্গে উত্ত মূল্যের সম্পর্কও তাই, —এই দুটি হারই একই অভিন্ন কথা ভিন্ন ভিন্ন ভাবে প্রকাশ করে, এক ক্ষেত্রে বাস্তবায়িত, বিধৃত শ্রমের পরিপ্রেক্ষিতে, অন্য ক্ষেত্রে জীবিত’ বহতা শ্রমের পরি প্রেক্ষিতে সুতরাং উদ্ধৃত্ত মূল্যের হার হল মূলধনের দ্বারা শ্রমশক্তির কিংবা ধনিকের দ্বারা শ্রমিকের শোষণের মাত্রার যথাযথ প্রকাশ।[৭]
আমাদের দৃষ্টান্তটিতে আমরা ধরে নিয়েছিলাম, উৎপন্ন দ্রব্যটির মূল্য=১০ চ্ছি- +৯০অ-মূ +৯.উ- এবং অগ্রিম-প্রদত্ত মূলধন ৫ ৫০০। যেহেতু উদ্বৃত্ত-মূল্য£৯০ এবং অগ্রিম-প্রদত্ত মূলধন= ৫০০, সেহেতু মামুলি হিসাবের নিয়ম অনুযায়ী উত্তমূল্যের হার হিসাবে (সাধারণত মুনাফার হারের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়। আমাদের পাওয়া উচিত ১৮%, হারটা এত নিচু যে সম্ভবত মিঃ ক্যারি এবং অন্যান্য সামঞ্জস্যকারীদের কাছে এটা সানন্দ বিস্ময়ের কারণ হবে। কিন্তু আসলে উন্নত মূল্যের হার ৪ কিংবা উ-এর সমান নয় পরন্তু এর সমান; অতএব নয়, পরন্তু কিংবা ১০০%, যা শোষণের বাহিক মাত্রার চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি। যদিও আমরা যে-ক্ষেত্রটি ধরে নিয়েছি, সেখানে এম দিবসের যথার্থ দৈর্ঘ্য সম্পর্কে এবং শ্রম-প্রক্রিয়ার স্থায়িত্বকালের দিন বা সপ্তাহ সম্পর্কে এবং সেই সঙ্গে নিযুক্ত শ্রমিকের সংখ্যা সম্পর্কেও অজ্ঞ, তবু উত্তমূল্যের হার ও তার সমাৰ্থ আভিব্যক্তি ও -এর সাহায্যে শ্রম-দিবসের দুটি আবশ্যিক শ্রম। অংশের মধ্যে সম্পর্কটিকে আমাদের কাছে যথাযথভাবে প্রকাশ করে। এই সম্পর্কটি হচ্ছে সমতার সম্পর্ক, হারটি হচ্ছে ১০০%। অতএব, এটা পরিষ্কার যে আমাদের দৃষ্টান্তের শ্রমিকটি দিনের অর্ধাংশ কাজ করে নিজের জন্য, বাকি অর্ধাংশ ধনিকের জন্য।
সুতরাং উদ্বৃত্তমূল্য গণনা করার পদ্ধতিটি সংক্ষেপে এই : আমরা উৎপন্ন দ্রব্যটির মোট মূল্যটি নিই এবং স্থির মূলধনটি—যা ঐ দ্রব্যের মধ্যে কেবল পুনরাবির্ভূত হয়, তাকে-ধরি শূন্য। যা থাকে, সেটাই হল একমাত্র মূল্য যেটা পণ্য উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় সত্য সত্যই সৃষ্টি হয়েছে। যদি উত্তমূল্যের পরিমাণটি দেওয়া থাকে তা হলে অস্থির মূলধনটি পেতে হলে আমাদের কেবল এই বাকি অংশটি থেকে তাকে বিয়োগ করতে হবে। এবং, উলটোটা করতে হবে—যদি অস্থির মূলধনটি দেওয়া থাকে, এবং আমাদের উদ্বৃত্ত-মূল্যটি পেতে হয়। যদি দুটিই দেওয়া থাকে, তা হলে আমাদের কেবল শেষের কাজটি করতে হবে, অর্থাৎ ও কে, অস্থির মূল ধনের সঙ্গে উত্তমূল্যের অনুপাতটিকে হিসাব করতে হবে।
যদিও পদ্ধতিটি সরল, তা হলেও কয়েকটি উদাহরণের সাহায্যে পাঠককে এই পদ্ধতিটির অন্তর্নিহিত অভিনব নীতিগুলির প্রয়োগে অবহিত করা অবান্তর হবে না।
প্রথমে আমরা একটি সুতা কলের ( ‘স্পিনিং মিল’-এর ) দৃষ্টান্ত নেব, যাতে আছে ১০,০০০ ‘মিউল’-টাকু, তৈরি হয় মার্কিন তুলো থেকে ৩২নং সুতো এবং উৎপন্ন হয় প্রতি সপ্তাহে টাকু-পিছু ১ পাউণ্ড করে সুতো। আমরা ধরে নিচ্ছি ঝড়তি-পড়তির পরিমাণ ৬%; এই অবস্থাবলীর মধ্যে প্রতি সপ্তাহে পরিভুক্ত হয় ১৩,৬০০ পাউণ্ড তুলে, যার মধ্যে ৬০০ পাউণ্ড যায় ঝড়তি-পড়তিতে। ১৮৭১ সালের ১লা এপ্রিল তুলোর দাম ছিল পাউণ্ড পিছু ৭ পেল, সুতরাং কঁচামাল বাবদ খরচ হচ্ছে কম বেশি ৩৪১। প্রস্তুতিমূলক-মেশিনারি এবং সঞ্চলক শক্তি (মোটিভ পাওয়ার) সমেত ১০,০০০ টাকু খরচ, আমরা ধরে নিচ্ছি, টাকু-পিছু ৫১, তা হলে মোট দাড়ায় ১০,০০০। ক্ষয়ক্ষতি ধরে নেওয়া যাক১০% অর্থাৎ বার্ষিক £১,০০০ = সপ্তাহিক ৪২০। বাড়িভাড়া বাবদে ধরে নিচ্ছি বছরে ৩০০, মানে সপ্তাহে ৫৬। কয়লা খরচ (যাট ঘণ্টার ঘণ্টা-পিছু অশ্ব-শক্তি-প্রতি ৪ পাউণ্ড কয়লা ধরে নিয়ে এবং সেই সঙ্গে মিল গরম রাখার কয়লা খরচ যোগ করে) সপ্তাহে ১১ টন প্রতি টন ৮শি. এপে. দামে প্রতি সপ্তাহে লাগে প্রায় £s; গ্যাস প্রতি সপ্তাহে £১, তেল ইত্যাদি প্রতি সপ্তাহে ৫৪। উল্লিখিত সহায়ক সামগ্ৰীসমূহের সপ্তাহ-প্রতি মোট খরচ দাঁড়ায় £১০। সুতরাং সাপ্তাহিক উৎপন্ন দ্রব্যের মূল্যের স্থির অংশ হয় £৩৭৮। মজুরির পরিমাণ সপ্তাহে ৫৫২। সুতোর দাম পাউণ্ড-পিছু ১২৪ পেন্স, তা হলে ১০,০০০ পাউণ্ডের মূল্য পডে £৫১০। অতএব, এক্ষেত্রে উদ্বৃত্ত মূল্য বাড়ায় ৪৫ ১০ – £৪৩০ =£৮০। আমরা উৎপন্ন দ্রব্যের মূল্যের স্থির অংশটি ধরছি= ৩, কারণ তা মূল্য-সৃজনে কোনো ভূমিকা নেয় না। তা হলে থাকে এক সপ্তাহে সৃষ্ট মূল্য = £,৩২, যা £৫২ অস্থির মূলধন ৫৮০ উদ্বৃত্ত-মূল্য। সুতরাং উত্তমূল্যের হার দাঁড়ায় ৮ঃ = ১৫৩৪%। গড়ে ১০ ঘণ্টার একটি শ্রম-দিবসে ফল হয় : অবশ্যিক শ্রম = ৩*৩১/৩৩ ঘণ্টা এবং এবং উদ্ধত্ত শ্রম = ৬*২/৩৩ ঘণ্টা।[৮]
