অস্থির মূলধনে প্রারম্ভিক রূপটি নিয়ে আরো একটি সমস্যার সৃষ্টি হয়। আমাদের দষ্টান্তটিতে ম= £4 ১০ স্থি-মূ+£৯০ অ-মূ+£৯০ উ-মূ; কিন্তু £৯০ হল একটি নির্দিষ্ট এবং সেই কারণে একটি স্থির রাশি; সুতরাং তাকে অস্থির বলে গণ্য করা অদ্ভুত বলে প্রতিভাত হয়। কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে £৯০ অ-মূ কথাটি এখানে একটি প্রতীক মাত্র, যা ব্যবহার করা হয়েছে এটা দেখাবার জন্য যে এই মূল্যটি একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পার হয়। মূলধনের যে-অংশটি শ্রমশক্তি ক্রয়ের জন্য বিনিয়োজিত হয়, সেটি বাস্তবায়িত প্রমের একটি নির্দিষ্ট অংশ—ক্রীত শ্রমশক্তির মূল্যের মত একটি স্থির মূল্য। কিন্তু উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় £৯০-এর স্থান গ্রহণ করে সক্রিয় এম-শক্তি মৃত শমের স্থান গ্রহণ করে জীবন্ত এম, যা ছিল বদ্ধ তার স্থান গ্রহণ করে এমন কিছু যা বহমান, স্থিরের স্থান গ্রহণ করে অস্থির। তার ফলে ঘটে অ-এর পুনরুৎপাদন যোগ অ-এর বৃদ্ধিপ্রাপ্তি। তা হলে ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের দৃষ্টিকোণ থেকে, গোটা প্রক্রিয়াটি প্রতিভাত হয় মূলত স্থির মূল্যের স্বতঃস্ফু, পরিবর্তন হিসাবে, যা রূপান্তরিত হয় এম-শক্তিতে। প্রক্রিয়া এবং পরিণতি- দুই-ই প্রতিভাত হয় এই মূল্যজনিত ঘটনা হিসাবে। সুতরাং, যদি ৪৯০ অস্থির মূলধন’ কিংবা এই পরিমাণ স্বয়ং সম্প্রসারণশীল মূল্য’–এই ধরনের কথাগুলি পরস্পর বিরোধী বলে মনে হয়, তা হলে তার কারণ এই যে সেগুলি ধনতাক উৎপাদনের মধ্যে নিহিত একটি স্ব-বিরোধকে প্রকাশ করে দেয়।
স্থির মূলধনকে শূন্যের সঙ্গে সমীকরণ করাকে প্রথম দৃষ্টিতে অদ্ভুত এক কাণ্ড বলে মনে হয়। অথচ এই জিনিসটাই আমরা প্রতিদিন করে চলেছি। দৃষ্টান্তস্বরূপ, যদি আমরা তুলা শিল্প থেকে ইংল্যাণ্ডের মুনাফার পরিমাণ হিসাব করতে চাই, তা হলে আমরা তুলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, মিশর এবং অন্যান্য দেশকে যে যে পরিমাণ অর্থ দেওয়া হয়, তা বাদ দিই; অন্য ভাবে বলা যায়, মূলধনের মূল্য, যা উৎপন্ন দ্রব্যটির মূল্যের মধ্যে কেবল পুনরাবির্ভূতই হয়, তাকে ধরা হয় = ০।
অবশ্য, মূলধনের যে-অংশ থেকে উদ্ব-মূল্য প্রত্যক্ষ ভাবে উদ্ভূত হয় এবং যার মূল্যের পরিবর্তনকে তা প্রতিফলিত করে, কেবল সেই অংশের সঙ্গেই তার অনুপাতটি নয়, সেই সঙ্গে অগ্রিম-প্রদত্ত মূলধনের মোট পরিমাণের সঙ্গে তার অনুপাতটিও অর্থ নৈতিক ভাবে বিরাট তাৎপর্যপূর্ণ। সুতরাং তৃতীয় গ্রন্থে আমরা এই অনুপাত সম্পর্কে নিঃশেষে পর্যালোচনা করব। মূলধনের একটি অংশ যাতে শ্রমশক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে তার মূল্য সম্প্রসারিত করতে সক্ষম হয়, সেই জন্য মূলধনের আর একটি অংশের উৎপাদনের উপায়সমূহে রূপান্তরিত হওয়া আবশ্যক। অস্থিব মূলধন যাতে এর কাজ সম্পাদন করতে পারে, তার জন্য স্থির মূলধন যথােচিত অনুপাতে অগ্রিম দিতে হবে— প্রত্যেকটি শ্রম-প্রক্রিয়ার বিশেষ বিশেষ কারিগরি অবস্থাবলীতে যে-অনুপাতের প্রয়োজন হয়, সেই অনুপাতে। যাই হোক, একটি রাসায়নিক প্রক্রিয়ার জন্য যে বকযন্ত্র (রেটট’ ) ও অন্যান্য পাত্রের ( ভেসেলস’-এর) প্রয়োজন হয়, এই ঘটনাটি কিন্তু রসায়নবিদকে ( ‘কেমিস্ট’-কে) বাধ্য করে না তার বিশ্লেষণের ফলের মধ্যে সেগুলিকে লক্ষ্য করতে। যদি আমরা মূল্য সৃজনের সঙ্গে এবং মূল্যের পরিমাণে পরিবর্তনের সঙ্গে উৎপাদন-উপায় সমূহের সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের দিকে তাকাই, তা হলে, অন্য সব কিছু থেকে আলাদা ভাবে, তারা আমাদের কাছে প্রতিভাত হয় কেবল সেই সামগ্রী হিসাবে, যে সামগ্রীর মধ্যে শ্রমশক্তি তথা মূল্যস্রষ্টা নিজেকে সম্প্রযুক্ত করে। এই সামগ্রীর প্রতি বা মূল্য-কোনোটারই কোনো মূল্য নাই। একমাত্র যেটা আবশ্যিক শর্ত সেটা এই যে, উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় ব্যয়িত শ্রমকে আত্মভূত করার মত পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকতে হবে। সেই সরবরাহ যদি থাকে, তা হলে সামগ্রীটির মূল্য বৃদ্ধি বা হ্রাস পেতে পারে অথবা এমনকি ভূমি ও সমুদ্রের মত, নিজের কোনো মূল্য নাও থাকতে পারে; কিন্তু মূল্য সৃজনের উপরে বা মূল্যের পরিমাণে পরিবর্তনের উপরে তার কোনো প্রভাব পড়বে না।[২]
অতএব, প্রথমে আমরা স্থির মূলধনকে শূন্যের সঙ্গে সমীকরূণ করি। ফলে অগ্রিম প্রদত্ত মূলধন ম’+অ থেকে কমে গিয়ে দাড়ায় অ এবং উৎপন্ন দ্রব্যটির মূল্যের পরিবর্তে, (ম+ অ +উ-এর পরিবর্তে, আমরা পাই উৎপাদিত মূল্যটি অর্থাৎ ( অ+উ)। নূতন উৎপাদিত মূল্যটি যদি = £১৮, যে মূল্যটি স্বভাবতই প্রতিফলিত করে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্যয়িত সমগ্ৰ শ্ৰম, তা হলে তা থেকে অস্থির মূলধন £৯. বিয়োগ করে আমরা পাই বাকি ৪৯০, যা হচ্ছে উদ্ব-মূল্যের পরিমাণ। এই £৯০ কিংবা উ প্রতিফলিত করে উৎপাদিত উদ্ব-মূল্যের অপেক্ষিক পরিমাণ। এটা পরিষ্কার যে আপেক্ষিক উৎপাদিত পরিমাণ কিংবা অস্থির মূলধনের সঙ্গে উদ্ব-মূল্যের অনুপাতের দ্বারা, যা অভিব্যক্ত হয় উ দ্বারা। আমাদের দৃষ্টান্তটিতে এই অনুপাতটি হল, যার মানে দাড়ায় ১০০% বৃদ্ধি। অস্থির মূলধনের মূল্যে এই আপেক্ষিক বৃদ্ধিকে, কিংবা উদ্ধও মূল্যের আপেক্ষিক আয়তনকে আমরা বলি “উত্তমূল্যের হার”।[৩]
আমরা দেখেছি যে শ্রমিক শ্ৰম-প্রক্রিয়ার একটি অংশে কেবল শ্রমশক্তির মূল্যই, অর্থাৎ তার জীবনধারণের উপকরণাদির মূল্যই উৎপাদন করে। যেহেতু এখন তার কাজ শ্রমের সামাজিক বিভাজনের উপরে প্রতিষ্ঠিত একটি প্রণালীর অংশমাত্র, সে আর প্রত্যক্ষভাবে সেই সব আবশ্যিক দ্রব্য উৎপাদন করে না, যেগুলি সে নিজে পরিভোগ করে, পরিবর্তে সে উৎপাদন করে একটি মাত্র পণ্য, যেমন সুতো, যার মূল্য ঐ আবশ্যিক। দ্রব্যাদির মূল্যের সমান কিংবা যে-পরিমাণ অর্থের সাহায্যে সেগুলি ক্রয় করা যায়, তার সমান। তারা দিনের শ্রমের যে-অংশ এই উদ্দেশ্যে নিয়োজিত হয়, তা বেশি বা কম হবে, তার গড়ে দৈনিক কত পরিমাণ দ্রব্য প্রয়োজন হয়, তার মূল্যের অনুপাতে; অথবা ভাষান্তরে বলা যায়, ঐ দ্রব্যাদি উৎপাদন করতে গড়ে কত শ্রম-সময়ের প্রয়োজন হয় তার অনুপাতে। যদি ধনিকের জন্য কাজ না করে, সে তার নিজের জন্য স্বাধীন ভাবে কাজ করত, তা হলেও বাকি সব কিছু একই রকম থাকলে, তার শ্রমশক্তির মূল্য উৎপাদন করতে এবং এই ভাবে তার অস্তিত্ব-সংবরণ কিংবা অব্যাহত পুনরুৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জীবনধারণের সামগ্রী অর্জন করতে তাকে একই সংখ্যক ঘণ্টা এম করতে হত। কিন্তু যেমন আমরা দেখেছি, তার দিনের শ্রমের যে-অংশে সে তার শ্ৰম-শক্তির মূল্য, ধরা যাক তিন শিলিং, উৎপাদন করে, অথচ সে কেবল তার শ্রমশক্তির জন্য ধনিক ইতিপূর্বেই যে-মূল্য অগ্রিম দিয়েছে তারই সমার্য সামগ্রী উৎপাদন করে;[৪] নূতন সৃষ্ট মূল্য কেবল অগ্রিম-প্রদত্ত মূল্যটিকেই প্রতিস্থাপিত করে। এই ঘটনার দরুনই তিন শিলিং পরিমাণ নূতন মূল্যটির উৎপাদন কেবল পুনরুৎপাদনেরই চেহারা ধারণ করে। তা হলে শ্রম-দিবসের যে-অংশটিতে পুনরুৎপাদন সংঘটিত হয়, তাকে আমি “আবশ্যিক” শ্রম-সময়, এবং সেই সময়ে ব্যয়িত শ্রমকে বলি “আবশ্যিক” শ্রম।[৫] শ্রমিকের পক্ষে “আবশ্যিক”, কেননা তা শ্রমের সামাজিক রূপ থেকে নিরপেক্ষ; মূলধন ও ধনিক-কুলের পক্ষে “আবশ্যিক”, কেননা শ্রমিকের অব্যাহত অস্তিত্বের উপরেই নির্ভর করে তাদের অস্তিত্ব।
