যেমন কাচামালের মূল্যে পরিবর্তন ঘটতে পারে, তেমন ঐ প্রক্রিয়ায় নিযুক্ত শ্রমের উপকরণসমূহের, যন্ত্রপাতি ইত্যাদির মূল্যেও পরিবর্তন ঘটতে পারে, এবং তার ফলে, উৎপন্ন দ্রব্যের মূল্যের যে-অংশটি সেগুলি থেকে তাতে স্থানান্তরিত হয়, তারও পরিবর্তন ঘটতে পারে। যদি একটি নূতন উদ্ভাবনের ফলে, একটি বিশেষ ধরনের যন্ত্র অল্পতর শ্রম ব্যয় করে উৎপাদন করা যায়, তা হলে পুরনো যন্ত্রের মূল্যে কম-বেশি অবচয় ঘটে এবং কাজে কাজেই, তা উৎপন্ন দ্রব্যে তদনুযায়ী অল্পতর মূল্য স্থানান্তরিত করে। কিন্তু এখানেও মূল্যের পরিবর্তনের উৎপত্তি ঘটে প্রক্রিয়াটির বাইরে—যে প্রক্রিয়াটিতে ঐ যন্ত্রটি উৎপাদনের উপায় হিসাবে কাজ করছে। একবার এই প্রক্রিয়াটিতে নিযুক্ত হলে, যন্ত্রটি নিজে ঐ প্রক্রিয়া থেকে আলাদা ভাবে যতটা মূল্যের অধিকারী, তার চেয়ে বেশি মূল্য স্থানান্তরিত করতে পারে না।
এমনকি, শ্রম-প্রেক্রিয়ায় অংশ গ্রহণ করতে শুরু করার পরে যেমন উৎপাদনের উপায় সমূহের মূল্যে কোন পরিবর্তন ঘটলে, তা স্থির মূলধন হিসাবে তাদের যে চরিত্র, তাতে কোনো পরিবর্তন ঘটায় না, ঠিক মোন অস্থির মূলধনের সঙ্গে স্থির মূলধনের যে অনুপাত, তাতে কোন পরিবর্তনও এই দুই ধরনের মূলধনের নিজ নিজ ভূমিকায় কোন পরিবর্তন ঘটায় না। শ্ৰম-প্রক্রিয়ার কৃৎকৌশলগত অবস্থাগুলি এতটা পর্যন্ত বিপ্লবায়িত হতে পারে যে, যেখানে আগে দশজন লোক অল্প মূল্যের দশটি হাতিয়ার ব্যবহার করে অপেক্ষাকৃত অল্প পরিমাণ কাচামালকে তৈরি জিনিসে পরিণত করতে পারত, সেখানে এখন একজন লোক একটি ব্যয়বহুল যন্ত্রের সাহায্যে তার চেয়ে শতগুণ বেশি কঁাচামালকে তা করতে পারে। দ্বিতীয় ক্ষেত্রটিতে আমরা দেখি স্থির মূলধনে একটি বিপুল বৃদ্ধি, যা প্রতিফলিত হয় ব্যবহৃত উৎপাদন-উপায়সমূহের মোট মূল্যে, এবং সেই সঙ্গে দেখি অস্থির মূলধনে একটি দারুণ হ্রাস, যা বিনিয়োজিত হয় শ্রমশক্তিতে। যাই হোক এমন একটি বিপ্লব পরিবর্তন ঘটায় কেবল স্থির এবং অস্থির মূলধনের পরিমাণগত সম্পর্কটিতে, কিংবা, যে যে অনুপাতে মোট মূলধন বিভক্ত হয় স্থির এবং অস্থির উপাদানে, সেই সেই অনুপাতে, তা এই দুটির মর্মগত পার্থক্যকে ন্যুনতম মাত্রাতেও পরিবর্তিত করে না।
————
১. একটির অবসান ঘটিয়ে এম আর একটি নোতুনের সৃষ্টি করে। (An Essay on the polit. Econ of Nations”, London 1821, P, 13 )
২. শ্রমের যন্ত্রপাতি মেরামতির বিষয়টি এখানে আমাদের আলোচ্য নয়, বরং সেটা হয়ে পড়ে শ্রম-প্রয়োগের বিষয়। মেরামতি চলাকালে ঐ যন্ত্রপাতি দিয়ে আর। কাজ করা হয় না, উলটে ঐগুলির উপরেই কাজ করা হয়। আমাদের পক্ষে এটা ধরে নেওয়া খুবই সঙ্গত যে, যন্ত্রপাতির মেরামতিতে যে-শ্রম ব্যয় করা হয়, তা ঐ যন্ত্রপাতির মূল উৎপাদনে আবশ্যক শ্রমেরই অন্তর্গত। কিন্তু বইয়ে আমরা সেই সব ক্ষয়-ক্ষতি নিয়ে আলোচনা করেছি, যা কোনো চিকিৎসকই সারাতে পারেন না, যা আস্তে আস্তে মৃত্যুতে ঘনিয়ে নিয়ে আসে-“সেই সব ক্ষয়-ক্ষতি, যা মাঝে-মধ্যে মেরামত করে সারানো যায়না, যেমন, একটি ছুরির বেলায় ঐ ক্ষয়-ক্ষতির ফলে শেষ পর্যন্ত এমন অবস্থা হয়, যাতে ছুরি-নির্মাতা নিজেই তখন বলে ওটাতে নূতন ফলা লাগানো হবে বাজে খরচ। আমরা বইতে দেখিয়াছি, একটি যন্ত্র প্রত্যেকটি শ্রম প্রক্রিয়াতে অংশ নেয় একটা গোটা যন্ত্র হিসাবেই কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে মূল্য সৃজনের প্রক্রিয়ায় তা প্রবেশ করে একটি ভগ্নাংশ হিসাবে। এই ব্যাপারে ধ্যান-ধারণায় যে কত বিভ্রান্তি থাকে নিচের অনুচ্ছেদটি তার প্রমাণ। “রিকার্ডো বলেন, (মোজা তৈরির) যন্ত্র নির্মাণে ইঞ্জিনিয়র যে-শ্রম প্রয়োগ করে, তার একটি অংশ” এক জোড়া মোজার মূল্যে অন্তর্ভুক্ত হয়। তবু প্রতি-জোড়া মোজা তৈরিতে যে-মোট শ্রম লাগে: তার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয় ইঞ্জিনীয়রের গোটা শ্রমটাই, একটা অংশমাত্র নয়; কারণ একটি যন্ত্রে অনেক জোড়া মোজা তৈরি হয় এবং কোনো একটি জোড়াও যন্ত্রের কোনো অংশ বাদ দিয়ে করা যায় না।” ( Obs. on certain Verbal Disputes in pol, Econ., Particularly Relating to Value”, p. 54 ), লেখক একজন অসাধারণ আত্মসন্তুষ্ট পাণ্ডিত্যভিমানী ব্যক্তি যার বিভ্রান্ত ধারণায় এবং তদনুযায়ী বক্তব্যে এইটুকুই মাত্র সঠিক যে, তার আগে বা পরে, রিকার্ডো বা অন্য কোনো অর্থনীতিবিদই শ্রমের এই দুটি দিকে পার্থক্য করতে পারেন নি; আরো কম পেরেছেন মূল্য-সৃজনে এই দুটি দিকের কোন্ দিকটি কতটা অংশ গ্রহণ করেছে, তার মধ্যে পার্থক্য করতে।
৩. এ থেকে আমরা জে. বি. সে’র বক্তব্যের আজাব চরিত্রের বিচার করতে পারি; তিনি উত্তমূল্যের ( সুদ, মুনাফা, খাজনা-র) ব্যাখা দিতে চান “উৎপাদনশীল কার্যাবলীর” সাহায্যে-জমি, যন্ত্রপাতি ও কাচামাল ইত্যাদি উৎপাদনের উপকরণ গুলি তাদের ব্যবহার-মূল্যসমূহের মাধ্যমে এম-প্রক্রিয়ায় যে-কার্যাবলী সম্পাদন করে, তার সাহায্যে। মিঃ উইলিয়ম রশার, যিনি তার স্বকপোল-কল্পিত কৈফিয়ৎগুলি কাগজে-পত্রে ধরে রাখবার কোনো সুযোগই হারান না, তিনি এইভাবে তার একটি নমুনা রেখেছেন :-‘জে. বি. সে’ ( Traite,।. 1. ch. 4) খুব সঠিক ভাবেই মন্তব্য করেন, সমস্ত খরচ-খরচা বাদ দেবার পরে একটি তেল-কলে যে-মূল্য উৎপাদিত হয়, সেটা একটা নোতুন কিছু—এমন কিছু যা, যে-শ্রমের দ্বারা তেল-কলটি তৈরি হয়েছিল, তা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। (l.c. p. 82, note ) আপনি ঠিকই বলেছেন, অধ্যাপক মশাই, তেল-কলে যে তেল তৈরী হয়, তা এমন কিছু, যা কলটি তৈরি করতে ব্যয়িত এম থেকে খুবই আলাদা। মূল্য বলতে রশার যা বোঝেন, তা হল ‘তেল”-এর মত মাল, কেননা তেলের মূল্য আছে, যদিও প্রকৃতি ‘অল্প অল্প পরিমাণে পেট্রোল উৎপাদন করে, তৎসত্ত্বেও-একটা ঘটনা যার প্রতি তিনি তার আরো একটি মন্তব্যে উল্লেখ করেছেন বলে মনে হয়। সে প্রকৃতি যৎসামান্যই বিনিময়মূল্য উৎপাদন করে। মিঃ রশারের প্রকৃতি এবং সে যে-বিনিময়মূল্য উৎপাদন করে সেই বিনিময় মূল্য বরং বোকা কুমারী মেয়েটির মত যে স্বীকার করেছিল যে তার একটি সন্তান আছে, তবে সেটি এত টুকুন। এই পণ্ডিত-পুঙ্গবটি তার পরে মন্তব্য করেন, ‘রিকার্ডোর শিষ্য-গোষ্ঠী মূলধনকে শ্রমের শিরোনামের অধীনে ‘সঞ্চয়ীকৃত শ্রম হিসাবে অন্তভুক্ত করতে অভ্যস্ত। এটা অকৌশলী কাজ, কেননা, বাস্তবিক পক্ষে, মূলধনের মালিক উপরন্তু এমন কিছু করে যা মূলধনকে শুধূ সৃষ্টি ও রক্ষা করার কাজের চেয়ে বেশি : যথা, তার ভোগ থেকে আত্ম-সংবরণ, যার জন্য সে দাবি করে সুদ। (l.c.) রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির এই ‘অজস্থানিক-শারীরবৃত্তীয় পদ্ধতি (অ্যানাটমিক-ফিজিওলজি ক্যাল মেথড’ ) কত বেশি ‘কৌশলী’ যা বাস্তবিক পক্ষে একটি কামনাকে রূপান্তরিত করে ‘উপরন্তু’ মূল্যের একটি উৎসে।।
