যাই হোক, আগে যা বলা হয়েছে, তা থেকে আমরা জানি যে, শ্রমশক্তির মূল্যের নিছক সমমূল্য পুনরুৎপাদন করা এবং উৎপন্ন দ্রব্যে তা অঙ্গীভূত ক’র পরেও শ্রম প্রক্রিয়া চালু থাকতে পারে। উল্লিখিত উদ্দেশ্য-সাধনে ছ ঘণ্টাই যথেষ্ট কিন্তু শ্ৰম-প্রক্রিয়। চলতে পারে বারো ঘণ্টা। সুতরাং শ্রম-প্রক্রিয়ার ক্রিয়াশীলতা কেবল তার নিজের মূল্যই পুনরুৎপাদন করে না, তার উপরেও মূল্য উৎপাদন করে। এই উদ্বৃত্ত-মূল্য হচ্ছে, একদিকে, উৎপন্ন দ্রব্যের মূল্য এবং, অন্যদিকে, সেই দ্রব্যটির গঠনে পরিভুক্ত উপাদান গুলির, ভাষান্তরে, উৎপাদনের উপায়-উপকরণ ও শ্রমশক্তির, মূল্যের মধ্যেকার পার্থক্য।
উৎপন্ন দ্রব্যের মূল্য গঠনে শ্রম-প্রক্রিয়ার বিবিধ উপাদান যে বিভিন্ন অংশ গ্রহণ করে, সেইসব অংশের ব্যাখ্যার মাধ্যমে, আমরা, বাস্তবিক পক্ষে, মূলধনের বিভিন্ন উপাদানকে তার মূল্য-সম্প্রসারণের প্রক্রিয়ায় যে-বিভিন্ন ভূমিকা বরাদ্দ করা হয়েছে, সেই ভূমিকা গুলির চরিত্র উদঘাটিত করছি। উৎপন্ন দ্রব্যের সংগঠনী উপাদানগুলির মূল্যসমূহের যোগফলের উপরে তার মোট মূল্যের উদ্বৃত্তটিই হচ্ছে শুরুতে যে-মূলধন অগ্রিম দেওয়া হয়, তার উপরে সম্প্রসারিত মূলধনটির উত্ত। একদিকে উৎপাদনের উপায়সমূহ, অন্যদিকে শ্রমশক্তি—এ দুটি হচ্ছে অস্তিত্বের সেই দুটি রূপ যা প্রারম্ভিক মূলধনটি ধারণ করেছিল, যখন তা অর্থ থেকে রূপান্তরিত হয়েছিল শ্ৰম-প্রক্রিয়ার বিবিধ উপাদানে। অতএব, মূলধনের যে-অংশ উৎপাদনের উপায়সমূহের দ্বারা, কঁচামাল, সহায়ক সাম ও এম-উপকরণসমূহের দ্বারা প্রতিরূপায়িত হয়, উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় সেই অংশটির মূল্যের কোনো পরিমাণগত পরিবর্তন ঘটে না। এই অংশটিকে আমি বলি মূলধনের স্থির অংশ, কিংবা, আরে সংক্ষেপে, গির মূলধন।।
অন্যদিকে, মূলধনের যে-অংশ প্রতিরূপায়িত হয় এম-শক্তির দ্বারা, উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় সেই অংশটির মূল্যের পরিবর্তন ঘটে। এই অংশটি তার নিজের মূল্যের সমান একটি মূল্য পুনরুৎপাদিত করে এবং, তা ছাড়াও আবার, একটি বাড়তি মূল্য, উদ্ধত্ত মূল্য উৎপাদন করে—যে উদ্বৃত্ত-মূল্যটি নিজেও পরিবর্তিত হতে পারে, অবস্থানুযায়ী বেশি বা কম হতে পারে। মূলধনের এই অংশটি নিরন্তর স্থির রাশি থেকে অস্থির রাশিতে রূপান্তরিত হয়। সুতরাং আমি তাকে বলি মূলধনের অস্থির অংশ, কিংবা সংক্ষেপে, অগির মূলধন। মূলধনের সেই একই উপাদানসমূহ, যেগুলি, শ্ৰম-প্রক্রিয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে, নিজেদেরকে উপস্থিত করে যথাক্রমে বিষয়গত এবং বিষয়ীগত উপাদান হিসাবে, উৎপাদনের উপায় এবং শ্রমশক্তি হিসাবে, সেইগুলিই আবার উদ্ব-মূল্য সৃষ্টির প্রক্রিয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে নিজেদেরকে উপস্থিত করে স্থির এবং অস্থির মূলধন হিসাবে।
স্থির মূলধনের যে সংজ্ঞা উপরে দেওয়া হল, তা উপাদানগত দিক থেকে মূল্যের পরিবর্তন-সম্ভাবনাকে খারিজ করে দেয় না। ধরুন, তুলোর দাম একদিন পাউণ্ড-প্রতি ছ-পেন্স, পরের দিন, তুলোর ফলন খারাপ হওয়ার দরুন, পাউণ্ড-প্রতি এক শিলিং। ছ-পেন্স দামে ক্রীত এবং দাম বৃদ্ধির পরে সুতোয় রূপান্তরিত প্রত্যেক পাউণ্ড তুলো উৎপন্ন দ্রব্যটিতে স্থানান্তরিত করে এক শিলিং মূল্য, এবং যে তুলোটা দাম-বৃদ্ধির আগেই কাটা হয়ে গিয়েছে এবং সম্ভবতঃ সুতো হিসাবে বাজারে চালু হয়ে গিয়েছে, তা উৎপন্ন দ্রব্যটিতে স্থানান্তরিত করে তার মূল মূল্যের দ্বিগুণ। যাই হোক, এটা পরিষ্কার যে, মূল্যের এই পরিবর্তনগুলি ঐ বৃদ্ধি-প্রাপ্তি থেকে, উদ্বৃত্ত-মূল্য থেকে নিরপেক্ষ, যে উদ্ব-মূল্যটি সুতো কাটার ফলেই তুলোর সঙ্গে সংযোজিত হয়েছে। যদি পুরনো তুলোটা কখনো কাটা না হত, তা হলে দাম বাড়ার পরে, সেটাকে প্রতি-পাউণ্ড ছ-পেন্সের বদলে এক শিলিং করে আবার বিক্রি করে দেওয়া যেত। অধিকন্তু, তুলে। যত কমসংখ্যক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পার হয়, তত বেশি নিশ্চিত হয় তার ফল। তাই আমরা দেখতে পাই, মূল্যে যখন এইরকম আচমকা পরিবর্তন ঘটে, তখন ফটকাবাজদের রেওয়াজই হল সেই দ্রব্যটি নিয়ে ফটকাবাজি করা, যার উপরে ব্যয়িত হয়েছে সবচেয়ে কম পরিমাণ শ্ৰম : যেমন, কাপড় নিয়ে ফটকাবাজি না করে, সুতো নিয়ে করা; সুতো নিয়ে না করে খোদ তুলে নিয়ে করা। আলোচ্য ক্ষেত্রটিতে, মূল্যের পরিবর্তনের উৎপত্তি ঘটে সেই প্রক্রিয়াটিতে নয়, যার মধ্যে তুলে। অংশ নেয় উৎপাদনের উপায় হিসাবে, সুতং যার মধ্যে তা কাজ করে স্থির মূলধন হিসাবে, পর সেই প্রক্রিয়াটিতে যাতে তুলে নিজেই উৎপাদিত হয়। এটা সত্য যে, পণ্যের মূল্য নির্ধারিত হয় তার মধ্যে বর্ধত শ্রমের পরিমাণের দ্বারা, কিন্তু এই পরিমাণটি নিজেই নিয়ন্ত্রিত হ{ সামাজিক অবস্থাবলীর দ্বা। যদি কোনো পণ্য উৎপাদনের জন্য সামাজিক ভাবে আবশ্যক শ্রম পরিবর্তিত হয়ে যায় এবং একটি ভাল ফলনের পরে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ তুলে যতট। শ্রমের প্রতিনিধিত্ব করে তার তুলনায় একটি খারাপ ফলনের পরে তা বেশি পরিমাণ শ্রমের প্রতিনিধিত্ব করে-তা হলে, ঐ শ্রেণীর যত পণ্য আগে থেকেই ছল, সেগুলি তার দ্বারা প্রভাবিত হয়, যেন সেগুলি একই প্রজাতিভুক্ত বিভিন্ন সদস্য [৮] এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ে সেগুলির মূল্য পরিমাপ করা হয় সামাজিক ভাবে আবশ্যক শ্রমের দ্বারা, অর্থাৎ, তৎকালে উপস্থিত সামাজিক অবস্থাবলীতে সেগুলির উৎপাদনে যতটা সময় লাগে, তার দ্বারা।
