একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ শ্রমের সরল সংযোজনের দ্বারা সংযযাজিত হয় নূতন মূল্য এবং এই সংযোজিত শ্রমের গুণমানের দ্বারা উৎপাদনের উপায়সমূহের মূল্য, মূল্যগুলি সংরক্ষিত হয় উৎপন্ন দ্রব্যে। শ্রমের দ্বিবিধ চরিত্র থেকে উদ্ভূত এই দ্বিবিধ ফলটি বিবিধ ব্যাপারে লক্ষ্য করা যায়।
ধরা যাক, এমন একটা কিছু উদ্ভাবিত হল যার সাহায্যে কাটুনী সক্ষম হল, আগে ৩৬ ঘণ্টায় সে যে-পরিমাণ সুতো কাটত, এখন ৬ ঘণ্টায় সেই পরিমাণ সুতো কাটতে।। উপযোগপূর্ণ উৎপাদনের উদ্দেশ্য-সাধনে, তার শ্রম এখন আগের তুলনায় ছ-গুণ ফলপ্রসূ। ৬ ঘণ্টা কাজের উৎপন্ন ফল বেড়ে দাঁড়িয়েছে ছ-গুণ, ৬ পাউণ্ড থেকে ৩৬ পাউণ্ড। কিন্তু তখন ৩৬ পাউণ্ড তুলে। আত্মীকৃত করে কেবল সেই পরিমাণ শ্রম, যা আগে করত ৬ পাউণ্ড তুলে। এক-ষষ্ঠাংশ পরিমাণ নূতন শ্রম আত্মীকৃত হচ্ছে প্রত্যেক পাউণ্ড তুলোর দ্বারা এবং, তার ফলে, প্রত্যেকটি পাউণ্ডে শ্রমের দ্বারা সংযোজিত শ্রম আগের তুলনায় কমে গিয়ে দাড়াচ্ছে কেবল এক-ষষ্ঠাংশ। অন্য দিকে, উৎপন্ন দ্রব্যটিতে অর্থাৎ ৩৬ পাউণ্ড সুতোয় তুলো থেকে স্থানান্তরিত মূল্য বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ছ-গুণ। ৬ ঘণ্টা সুতো-কাটার ফলে, কাচামালের সংরক্ষিত এবং উৎপন্ন দ্রব্যটিতে স্থানান্তরিত মূল্য বেডে দাড়াচ্ছে আগের তুলনায় ছ-গুণ, যদিও ঐ একই কাচামালের প্রতি পাউণ্ডে কাটুনীর শ্রমের দ্বারা সংযোজিত কমে দাঁড়িয়েছে আগের তুলনায় এক-ষষ্ঠমাংশ। এ থেকে দেখা যায়, শ্রমের দুটি গুণ, যে-দুটি গুণের কল্যাণে সে এক ক্ষেত্রে সক্ষম হয় মূল্য সংরক্ষণ করতে এবং অন্য ক্ষেত্রে সক্ষম হয় মূল্য সৃষ্টি করতে, সেই গুণ দুটি মূলত ভিন্ন। এক দিকে, একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ তুলো থেকে সুতো প্রস্তুত করতে প্রয়োজনীয় সময় যত দীর্ঘ হয়, ততই তার মূল্যও বেশি হয়; অন্য দিকে, একটি নির্দিষ্ট সময়ে সুতোয় পরিণত তুলোর পরিমাণ যত বেশি হয়, ততই তা উৎপন্ন দ্রব্যে স্থানান্তরিত হবার ফলে, সংরক্ষিত মূল্যও বেশি হয়।
এখন ধরা যাক, কাটুনীর শ্রমের উৎপাদনশীলতা পরিবর্তিত না হয়ে স্থির রইল, সুতরাং এক পাউণ্ড তুলোকে সুতোয় পরিণত করতে তার আগে যে-সময় লাগত, এখনো সেই সময়ই লাগে, কিন্তু তুলোর বিনিময়-মূল্য পরিবর্তিত হল—হয় তা আগের চেয়ে ছ-গুণ বেড়ে গেল কিংবা কমে গিয়ে ছ-ভাগের একভাগ হল। এই উভয় ক্ষেত্রেই কাটুনী এক পাউণ্ড তুলোয় একই পরিমাণ শ্রম প্রয়োগ করে; অতএব, মূল্যে পরিবর্তন ঘটার আগেও সে যে-পরিমাণ মূল্য সংযোজিত করত, এখনো সেই পরিমাণ মূল্যই সংযোজিত করে; আগে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ সুতো যতটা সময়ে সে উৎপাদন করত, এখনো সেই পরিমাণ সুতো ততটা সময়েই সে উৎপাদন করে। তৎসত্বেও, তুলল। থেকে সুতোয় সে যে-মূল্য স্থানান্তরিত করে, তা ঐ পরিবর্তনের আগেকার মূল্যের হয় ছয় ভাগের এক ভাগ, আর নয়তোছ-গুণ—যে-ক্ষেত্রে যেমন। একই ফল পাওয়া যায়, যখন শ্রমের উপকরণসমূহের মূল্য বৃদ্ধি পায় বা হ্রাস পায়, অথচ উৎপাদন-প্রক্রিয়ায় তাদের প্রয়োজনীয় কার্যকরিতা অপরিবর্তিত থাকে।
আবার, যদি সুতো কাটার প্রক্রিয়ার কৃৎকৌশলগত অবস্থাবলী অপরিবর্তিত থাকে, এবং উৎপাদনের উপায়সমূহে মূল্যের কোনো পরিবর্তন না ঘটে, তা হলে কাটুনী সমান শ্রম-সময়ে অপরিবর্তিত মূল্যের সেই সমান পরিমাণ কাঁচামাল এবং সমান পরিমাণ যন্ত্রপাতি পরিভোগ করতে থাকে। যে-মূল্য সে উৎপন্ন দ্রব্যটিতে সংরক্ষিত করে তা সে উৎপন্ন দ্রব্যটিতে যে নূতন মূল্য স্থানান্তরিত করে, তার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ভাবে আনুপাতিক। এক সপ্তাহে সে যতটা শ্রম এবং, ফলত, যতটা মূল্য অঙ্গীভূত করত, দু-সপ্তাহে তার দ্বিগুণ করে এবং একই সময়ে সে পরিভোগ করে দ্বিগুণ কাচামাল এবং ক্ষয় করে দ্বিগুণ যন্ত্রপাতি—প্রতি ক্ষেত্রেই দ্বিগুণ মূল্যের। যতক্ষণ পর্যন্ত উৎপাদনের অবস্থাবলী অভিন্ন থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত শ্রমিক নূতন শ্রমের দ্বারা যত বেশি মূল্য স যোজিত করে, তত বেশি মূল্য সে স্থানান্তরিত এবং সংরক্ষিত করে; কিন্তু সে তা করে কেবল এই কারণে যে নূতন মূল্যের এই সংযোজন সংঘটিত হয় এমন অবস্থাবলীতে, যা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়নি এবং যা তার নিজের শ্রম-নিরপেক্ষ। অবশ্য, এক অর্থে এই কথা বলা চলে যে, শ্রমিক যে-পরিমাণ নূতন মূল্য সংযোজিত করে, তার অনুপাতে পুরনো মূল্য সে সর্বদাই সংরক্ষিত করে। তুলোর মূল্য এক শিলিং থেকে বেড়ে গিয়ে দু শিলিং হোক, বা কমে গিয়ে ছ’ পেন্স হোক, শ্রমিক দু ঘণ্টায় যতটা মূল্য উৎপাদন করে, এক ঘণ্টায় অবধারিত ভাবেই উৎপাদন করে তার অর্ধেকটা। অনুরূপ ভাবেতার নিজের শ্রমের উৎপাদনশীলতায় যদি পরিবর্তন ঘটে, হাস-বৃদ্ধি ঘটে, তা হলে সে আগে এক ঘণ্টায় যতটা পরিমাণ তুলো কাটত তার তুলনায়, ক্ষেত্র অনুযায়ী, কম বা বেশি কাটবে এবং স্বভাবতই এক ঘণ্টার উৎপন্ন দ্রব্যটিতে তদনুযায়ী সংরক্ষিত করবে তুলোর কম বা বেশি মূল্য; কিন্তু সব কিছু সত্ত্বেও, শ্রমের দ্বারা সে যতটা মূল্য সংরক্ষিত করবে, দু ঘণ্টা শ্রমের দ্বারা করবে তার দ্বিগুণ।
মূল্যের অবস্থান কেবল উপযোগিতাপূর্ণ দ্রব্যসমূহে, বিষয়সমূহে, বিবিধ অভিজ্ঞানের মাধ্যমে তার নিছক প্রতীকী প্রকাশ আমরা বিবেচনার বাইরে রাখছি। (শ্রমশক্তির ব্যক্তিরূপায়ণ হিসাবে দেখলে মানুষ নিজেই একটি প্রাকৃতিক বিষয়, একটি জিনিস, অবশ্য একটি সজীব, সচেতন জিনিস, এবং শ্রম হচ্ছে তার মধ্যে অবস্থিত এই শক্তির অভিব্যক্তি )। সুতরাং, কোন দ্রব্য যদি তার উপযোগিতা হারায়, তা হলে সে তার মূল্যও হারায়। উৎপাদনের উপায়সমূহ যখন তাদের ব্যবহার-মূল্য সেই সঙ্গে তাদের মূল্যও হারায় না কেন, তার কারণ এই : শ্ৰম-প্রক্রিয়ায় তারা তাদের ব্যবহারমূল্যের মূল রূপটি হারায় কেবল উৎপন্ন দ্রব্যটিতে একটি নূতন ব্যবহার-মূল্যের রূপ ধারণ করার জন্য। কিন্তু, মূল্যের পক্ষে তা যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক না কেন, তা যে নিজেকে তার মধ্যে মূর্ত করে তুলতে অবলম্বন করে একটি উপযোগিতাপূর্ণ দ্রব্য, অথচ কোন বিশেষ দ্রব্যটি সেই উদ্দেশ্য সাধন করে সেটা থাকে সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত একটা ব্যাপার, এটা আমরা দেখেছিলাম পণ্যের রূপান্তরণ সম্পর্কে আলোচনা করার সময়ে। সুতরাং এ থেকে অনুসৃত হয় যে শ্রম-প্রক্রিয়ায় উৎপাদনের উপায়সমূহ তাদের মূল্য উৎপন্ন দ্রব্যে স্থানান্তরিত করে ততটা পর্যন্ত, যতটা পর্যন্ত তারা তাদের ব্যবহার-মূল্যের সঙ্গে সঙ্গে বিনিময়মূল্যও হারায়। উৎপন্ন দ্রব্যটিতে তার একমাত্র সেই মূল্যটিই ছেড়ে দেয়, যেটি তারা নিজেরা উৎপাদনের উপায় হিসাবে হারায়। কিন্তু এ ব্যাপারে শ্রম-প্রক্রিয়ার সমস্ত বস্তুগত উপাদানগুলি একই ভাবে আচরণ করে না।
