বয়লারের নীচে দগ্ধ কয়লা নিঃশেষে অন্তহিত হয়ে যায়, চাকার ধুরায় ( ‘অ্যাক্সেল’-এ) যে চর্বি মাখানো হয় তাও সেই ভাবে অন্তর্কিত হয়ে যায়। রঞ্জক দ্রব্যাদি এবং অন্যান্য সহায়ক সামগ্রীও অন্তর্হিত হয় কিন্তু উৎপন্ন দ্রব্যের গুণ হিসাবে আবার আবির্ভূত হয়। কাঁচামাল উৎপন্ন দ্রব্যের অবয়ব গঠন করে কিন্তু তা করতে গিয়ে নিজের রূপ পরিবর্তন করে। অতএব কাচামাল ও সহায়ক সামগ্রীগুলি যে যে রূপে আচ্ছাদিত থাকে, শ্রম-প্রক্রিয়ায় প্রবেশের পরে তারা সেই স্ববিশেষ রূপগুলি থেকে বঞ্চিত হয়। শ্রমের উপকরণগুলির ক্ষেত্রে ব্যাপারটা অন্য রকম। হাতিয়ার ‘টুল, যন্ত্রপাতি (মেশিন’), কর্মশালা ( ‘ওয়ার্কশপ’) এবং পাত্র (ভেসল’) কেবল তত কাল পর্যন্তই শ্রম-প্রক্রিয়ায় উপযোগ পূর্ণ থাকে যত কাল পর্যন্ত তারা তাদের মূল রূপ বজায় রাখে এবং প্রত্যেক সকালে তাদের অপরিবর্তিত রূপে প্রক্রিয়াটি নতুন করে শুক করতে প্রস্তুত থাকে। এবং ঠিক যেমন তাদের জীবন কালে, অর্থাৎ যে-শ্ৰম-প্রক্রিয়ায় তারা কাজ করে তা অব্যাহত থাকা কালে, তারা উৎপ-দ্রব্য-নিরপেক্ষ ভাবে তাদের বজায় রাখে, ঠিক তেমনি তাদের মৃত্যুর পরেও তাড়া তাই করে। যন্ত্র, হাতিয়ার, কর্মশালা ইত্যাদির শবগুলি, তারা যে দ্রব্য উৎপাদনে সাহায্য করে, তা থেকে সব সময়েই ভিন্ন ও স্বতন্ত্র থাকে। এখন যদি আমরা কোন শ্রম-উপকরণের ব্যাপারটি তার সমগ্র কর্মকাল ধরে-কর্মশালায় প্রবেশের দিনটি থেকে বাতিল ঘরে নির্বাসনে যাবার দিনটি পর্যন্ত বিচার করি, আমরা দেখতে পাই যে এই সময়কালে তার ব্যবহার মূল্য সম্পূর্ণ ভাবে পরিভুক্ত হয়ে গিয়েছে, এবং ফলত তার বিনিময়মূল্য সম্পূর্ণ ভাবে উৎপন্ন দ্রব্যে স্থানান্তরিত হয়ে গিয়েছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, যদি একটি সুতো কাটার যন্ত্র ( ‘স্পিনিং মেশিন’ টিকে থাকে, ১০ বছর তা হলে এটা পরিষ্কার যে তার সেই কর্মকাল জুড়ে তার মোট মূল্যে ক্রমে ক্রমে স্থানান্তরিত হয়ে যায় তার সেই ১০ বছরের উৎপন্ন সম্ভারে। সুতরাং একটি শ্রম-উপকরণের জীবন-কাল ব্যয়িত হয় একই রকমের কর্মকাণ্ডের কম বা বেশি সংখ্যক পুনরাবর্তনে। একটি মানুষের জীবন-কালের সঙ্গে তার জীবন-কালের তুলনা করা যেতে পারে। প্রত্যেকটি দিন একটি মানুষকে তার মৃত্যুর দিকে ২৪ ঘণ্টা করে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু কেবল তার মুখের দিকে তাকিয়েই কেউ সঠিক ভাবে বলতে পারে না আরো কত দিন তাকে সেই পথ ধরে চলতে হবে। অবশ্য, এই সমস্যা বীমা কোম্পানির পক্ষে, গড়ের নিয়ম অনুসারে, খুবই সঠিক এবং সেই সঙ্গে খুবই মুনাফাজনক সিদ্ধান্তে উপনীত হবার পথে কখনো বাধা সৃষ্টি করে না। শ্রম-উপকরণের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই। অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, গড়ে কত কাল একটা বিশেষ ধরনের মেশিন টিকে থাকবে। ধরা যাক, শ্রম-প্রক্রিয়ায় তার ব্যবহার মূল্য টেকে মাত্র ছয় দিন। তা হলে, গড়ে প্রতিদিন তা এক-ষষ্ঠাংশ করে ব্যবহার-মূল্য হারায়; সুতরাং দৈনিক উৎপাদন দ্রব্যে তার নিজের মুল্যের এক-ষষ্ঠাংশ করে স্থানান্তরিত করে। সমস্ত শ্রম-উপকরণের ক্ষয়-ক্ষতি, এবং উৎপন্ন দ্রব্যে স্থানান্তরিত মূল্যের অনুপাতে তাদের ব্যবহার-মূল্যের, এবং তদনুযায়ী মূল্যের, পরিমাণে হ্রাসপ্রাপ্তি এই ভিত্তিতে হিসাব করা হয়।
সুতরাং এটা অত্যন্ত পরিষ্কার যে, তাদের নিজেদের ব্যবহার-মূল্যের ধ্বংসের ফলে উৎপাদন-উপায়সমূহ শ্ৰম-প্রক্রিয়া চলাকালে যতটা মূল্য হারায়, তার চেয়ে বেশি মূল্য তারা কখনো উৎপন্ন দ্রব্যে স্থানান্তরিত করে না। যদি এমন একটি উপকরণের হারাবার মত কোনো মূল্যই না থাকে, অর্থাৎ যাদ তা মনুষ্য-শ্রমের ফল না হয়, তা হলে তা উৎপন্ন দ্রব্যে কোনো মূল্যই স্থানান্তরিত করে না। বিনিময়মূল্য গঠনে কোনো অবদান না দিয়েই তা ব্যবহার-মূল্য সৃষ্টিতে সাহায্য করে। এই শ্রেণীর মধ্যে পড়ে সেই যাবতীয় উৎপাদনের উপায়সমূহ, মানুষের সহায়তা ছাড়াই যেগুলি প্রকৃতি সরবরাহ করে থাকে, যেমন ভূমি, বায়ু, জল, খনিগর্ভস্থিত ধাতু, কুমারী অরণ্যজাত গাছ।
অধিকন্তু, এখানে আরেকটি কৌতুহলকর ব্যাপার আত্মপ্রকাশ করে। ধরা যাক, একটি মিেশনের মূল্য $১,০০০ এবং তা ক্ষয় হয়ে যায় ১,০০০ দিনে। তা হলে, ঐ মেশিনটির এক হাজার ভাগের এক ভাগ প্রতিদিন স্থানান্তরিত হয় উৎপন্ন দ্রব্যে। একই সময়ে, যদিও ক্রমহ্রাসমান জীবনীশক্তি নিয়ে, মেশিনটি সমগ্র ভাবে শ্ৰম-প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে থাকে। অতএব, দেখা যায় যে শ্রম-প্রক্রিয়ার একটি উপাদান, একটি উৎপাদনের উপায়, ক্রমাগত শ্ৰম-প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করে সমগ্র ভাবে, যদিও মূল্য গঠনের প্রক্রিয়ায় তা প্রবেশ করে কেবল ভগ্নাংশ হিসাবে। দুটি প্রক্রিয়ার মধ্যেকার পার্থক্য এখানে প্রতিফলিত হয় তাদের বস্তুগত উপাদানগুলিতে-উৎপাদনের একই উপকরণের সমগ্র ভাবে শ্রম-প্রক্রিয়ায় ভূমিকা গ্রহণের দ্বারা, সেই একই সময়ে মূল্য-গঠনের একটি উপাদান হিসাবে তা প্রবেশ করে কেবল অংশ-অংশ হিসাবে।[২]
অন্যদিকে আবার, একটি উৎপাদনের উপায় মূল্য গঠনে সমগ্র ভাবে ভূমিকা গ্রহণ করে শ্রম-প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করতে পারে টুকরো টুকরো ভাবে। ধরা যাক, তুলো থেকে সুতো কাটতে গিয়ে ব্যবহৃত প্রতি ১১৫ পাউণ্ড পিছু অপচয় হয় ১৫ পাউণ্ড করে, যা রূপান্তরিত হয় সুতোয় নয়, “শয়তানের ধুলোয়” ( সোেয়)। এখন. এই ১৫ পাউণ্ড তুলো কখনো সুতোর সংগঠনী উপাদান হয় না, তবু এই অপচয়কে সুতো-কাটার গড় অবস্থায় স্বাভাবিক ও অনিবার্য ধরে নিলে, তার মূল্য অবধারিত ভাবেই স্থানান্তরিত হয় সুতোর মূল্যে, ঠিক যেমন স্থানান্তরিত হয় সেই .০০ পাউণ্ডের মূল্য, যা রচনা করে সুতোব দেহ। ১০০ পাউণ্ড সুতো তৈরি হবাব আগে ১৫ পাউণ্ড তুলোর ব্যবহার মূল্যকে অবশ্যই ধুলোয় পর্যবসিত হতে হবে। সুতরাং সুতো উৎপাদনে এই তুলোটার ধ্বংসপ্রাপ্তি হচ্ছে একটা আবশ্যিক শর্ত। এবং যেহেতু এটা একটা আবশ্যিক শর্ত, একমাত্র সেই কারণেই ঐ তুলোর মূল্যটা স্থানান্তরিত হয় উৎপন্ন দ্রব্যটিতে। কোন শ্রম-প্রক্রিয়ার ফলে এইভাবে পরিত্যক্ত প্রত্যেক ধরনের আবর্জনার ক্ষেত্রেই এটা প্রযোজ্য~-অন্তত ততটা পরিমাণে প্রযোজ্য যতটা পরিমাণে তা নূতন ও স্বতন্ত্র ব্যবহার-মূল্য উৎপাদনের একটি উপায় হিসাবে সেই আবর্জনাটিকে আর নিয়োগ করা যায় না। আবর্জনার এইরকম নিয়োগ দেখা যেতে পারে ম্যাঞ্চেস্টারের বড় বড় মেশিন কারখানাগুলিতে, যেখানে প্রতিদিন সন্ধ্যায় ছট-লোহার পাহাড় গাডি-বোঝাই করে নিযে যাওয়া হয় ঢালাই-কারখানায়, যাতে করে পরদিন সকালে তা আবার কর্মশালায় আবির্ভূত হতে পারে জমাট লৌহপিণ্ড হিসাবে।
