৪. এইভাবে ১৮৪৪-৪৭ সাল থেকে সে তার মূলধনকে উৎপাদনশীল বিনিয়োগ থেকে তুলে নেয় যাতে করে রেলওয়ে ফটকাবাজিতে খাটাতে পারে; একই ভাবে, আমেরিকার গৃহযুদ্ধের মধ্যেও, সে তার কারখানা বন্ধ করে দেয় এবং শ্রমিকদের রাস্তায় বের করে দেয়, যাতে করে লিভারপুল কটন এক্সচেঞ্জ’-এ জুয়ো খেলতে পারে।
৫. নিজের মহিমা গাও, ভালো বেশ-ভূষা পরো, নিজেকে সাজাও কিন্তু যখনি কেউ, যা সে দেয়, তার চেয়ে বেশি বা ভাল কিছু নেয়, সেটাই কুসীদবৃত্তি, সেটা মোটেই সেবাকার্য নয়; চুরি করা বা লুঠ করার মত সেটাও প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে অন্যায়। যাকে প্রতিবেশীর প্রতি সেবা বা উপকার বলা হয়, তার সবটাই সেবা বা উপকার নয়। একজন ব্যাভিচারিণী একজন ব্যাভিচারী পরস্পরকে প্রভূত সেবা করে এবং আনন্দ দেয়। কোন ঘোড়-সওয়ার যখন কোন দুবৃত্তকে সাহায্য করে রাজপথে রাহাজানি করতে, জমি ও বাড়ি লুঠ করতে, তখন সে তার মস্ত সেবা করে। পোপের অনুচরেরা আমাদের বড় উপকার করে, কেননা তারা সকলকে ডুবিয়ে বা পুড়িয়ে মারেনা বা খুন করেনা বা জেলে পচিয়ে মারেনা; তাদের কাউকে কাউকে বাঁচতে দেয়; কেবল তাদের ঘর-ছাড়া করে এবং যথাসর্বস্ব নিয়ে নেয়। শয়তান নিজে তার সেবকদের অপরিসীম উপকার করে। “এক কথায়, এই জগৎ মহান, মহিমাময়, প্রাত্যহিক সেবা ও epostappies of I” ( Martin Luther : “An die pfarrherrn wider: den Wucher zu predigen”, Wittenberg 1540 ).
৬. Zur Kritik der Pol. Oek”, পৃঃ ১৪, দ্রষ্টব্য। সেখানে আমি এই প্রসঙ্গে নিম্নেধৃত মন্তব্যটি করেছি : “এটা বোঝা কঠিন নয়, সেবা এই শব্দটি জে. বি. সে এক এফ, বাস্তিয়াং-এর মত অর্থনীতিকদের কী সেবা করবে।”
৭. যেসব ঘটনা দাস-শ্রমকে একটি ব্যয়বহুল প্রক্রিয়ায় পরিণত করে, এটি সেগুলির মধ্যে একটি। প্রাচীনদের দ্বারা ব্যবহৃত একটি চমকপ্রদ বাচনভঙ্গি অনুসরণ করে বলা যায়, শ্রমিক, জন্তু এবং যন্ত্রের মধ্যে পার্থক্য এই যে, শ্রমিক হল একটি সবাক যন্ত্র, জন্তু হল একটি অর্ধবাক যন্ত্র এবং যন্ত্র হল একটি অ-বা যন্ত্র। কিন্তু সে নিজেই যন্ত্র ও জন্তুকে বুঝিয়ে দেয় যে সে তাদের মধ্যে পড়েনা, সে মানুষ। জন্তুর প্রতি নির্মম আচরণ করে, যন্ত্রের দারুণ ক্ষতি সাধন করে সে পরম আত্মতৃপ্তি সহকারে নিজেকে বোঝায় যে সে ওদের চেয়ে আলাদা। এই জন্যই উৎপাদনের এই পদ্ধতিতে সর্বজনীন ভাবে অনুসৃত নীতি হচ্ছে সবচেয়ে স্কুল ও ভারি যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা যাতে কেবল সেগুলির কিস্তুত আকারের জন্যই সেগুলির ক্ষতি করা দুঃসাধ্য হয়। মেক্সিকো উপসাগরের কূলে দাস রাষ্ট্রগুলিতে গৃহযুদ্ধের আমল পর্যন্ত কেবল দেখা যেত চীন-কায়দায় তৈরি লাঙল, যা মাটিকে ফালের মত না কেটে, শুয়োর বা দুচোর মত গর্ত-গর্ত করত। দ্রষ্টব্য : J. E. Cairnes, “The Slave Power”, London, 1862, p. 46 sqq. $17 “Sea-Bord Slave-States”-নামক বইয়ে ওমস্টেভ বলেন, আমাকে এখানে এমন সব যন্ত্রপাতি দেখানো হল, যেগুলিকে কোনো কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন মানুষ, যে মজুরি দিয়ে লোক খাটায়, সে তার শ্রমিকদের উপরে চাপিয়ে দেবেনা; এই যন্ত্রপাতিগুলি এমন বেশি ভারি এবং বেঢপ যে আমার মনে হয় তার দরুণ মামুলি যন্ত্রপাতির তুলনায় কাজের চাপ অন্তত দশ শতাংশ বেশি হয়। এবং আমাকে সজোরে বলা হল যে, যেমন হেলাফেলা করে আনাড়ির মত দাসেরা সেগুলি ব্যবহার করে, তাতে অপেক্ষাকৃত হালকা ও মানানসই কিছু তাদের হাতে তুলে দেওয়া মানে অপচয় করা; এবং আমরা। আমাদের শ্রমিকদের যে-সব যন্ত্র দিয়ে কাজ করাই ও মূনাফা আয় করি, সেগুলি ভার্জিনিয়ার শস্যক্ষেত্রে একদিনও টিকবে না—যদিও আমাদের ক্ষেতগুলির চেয়ে মুড়িপাথর মুক্ত ও অনায়াস সাধ্য। ঠিক তেমনি, যখন আমি জিজ্ঞাসা করি কেন ক্ষেতের কাজে এমন ব্যাপক ভাবে ঘোড়ার বদলে খচ্চর ব্যবহার করা হচ্ছে, তখন সর্বপ্রথম যে যুক্তিটি দেওয়া হয়—এবং তাদের স্বীকৃতি অনুসারে এটাই চূড়ান্ত যুক্তি-তা এই যে, নিগ্রোরা যে-রকম ব্যবহার করে, ঘোড় তা সহ্য করতে পারেনা। তারা অচিরেই ঘোড়াগুলোকে পঙ্গু ও অকেজো করে ফেলে কিন্তু খচ্চরগুলি তাদের লাঠি-পেটা সহ্য করে অথবা এক-আধ দিন না খেতে পেলেও কাবু হয় না; এগুলির এমন শারীরিক ক্ষতি হয়না যে অকেজো হয়ে পড়ে; হেলাফেলা বা বাড়তি খাটুনির ফলে এগুলির ঠাণ্ডা লাগেনা বা অসুখ হয়না। কিন্তু বেশি দূরে না গিয়ে আমার ঘরের জানালা দিয়েই আমি সব সময়ে দেখতে পাই গোরু-ঘোড়া-খচ্চর ইত্যাদির উপরে কী আচরণ করা হচ্ছে আমাদের উত্তরাঞ্চলে কোন চালক এমন করলে যে-কোন খামার মালিক তাকে তৎক্ষণাৎ তাড়িয়ে দেবে।”
৮. কুশলী ও অকুশলী শ্রমের মধ্যেকার পার্থক্যটি অংশত দাড়িয়ে আছে নিছক একটি বিভ্রমের উপরে, কিংবা, বড় জোর বলা যায়, এমন সব পার্থক্যের উপরে যেগুলি বাস্তবে অনেক কাল আগেই অন্তর্হিত হয়ে গিয়েছে এবং যেগুলি আজও টিকে আছে কেবল চিরাচরিত প্রথা হিসাবে-আংশিক ভাবে কয়েক ধরনের শ্রমিকের এমন এক অসহায় অবস্থার উপরে, যে অবস্থার দরুন তারা বাকিদের মত তাদের শ্রমের মূল্য আদায় করে নিতে পারে না। আপতিক ঘটনাবলী এখানে এত বড় একটা ভূমিকা নেয় যে, অনেক সময় এই দু ধরনের শ্রম তাদের পরস্পরের মধ্যে স্থান-বিনিময় করে। দৃষ্টান্তম্বরূপ, যেখানে শ্রমিক-শ্রেণীর শারীরিক অবনতি ঘটেছে এবং তুলনামূলক ভাবে বলা যায়, অবসিত হয়ে পড়েছে-সমস্ত অগ্রসর ধনতান্ত্রিক দেশেই অবস্থা যা দাড়িয়েছে। সেখানে বিবিধ স্থূল রূপের শ্রম, যার জন্য ব্যয় করতে হয় অধিকতর পেশী শক্তি, তাকে, শ্রমের সূক্ষ্ম রূপগুলির তুলনায়, কুশলী শ্রম বলে গণ্য করা হয়। এই সূক্ষ্ম রূপগুলি অবনমিত হয় অকুশলী শ্রমের পর্যায়ে। যেমন, ইংল্যাণ্ডে একজন রাজমিস্ত্রীকে একজন নক্সা ভোলা বস্তু-বয়নকারীর তুলনায় উচ্চতর স্থান দেওয়া হয়। আবার, যদিও একজন মোটা-কাপড়-কাটিয়ের ( ‘ফাক্টিয়ান-কাটার’-এ) এম দাবি করে দারুণ শারীরিক বল প্রয়োগ এবং সেই সঙ্গে তা স্বাস্থ্যের পক্ষেও হানিকর, তবু কিন্তু তাকে ধরা হয় অকুশলী শ্রম হিসাবে। তা ছাড়া ভুললে চলবে না, যে তথা কথিত কুশলী শ্ৰম জাতির মোট শ্রমের ক্ষেত্রে একটা বড় অংশ নয়। ল্যাইং এর হিসাব করে দেখিয়েছেন, ইংল্যাণ্ডে (এবং ওয়েল-এ) ১,১৩,০০,০০০ মানুষের জীবিকা নির্ভর করে অকুশলী শ্রমের উপরে। যখন তিনি লিখেছিলেন, তখন ইংল্যাণ্ডের মোট জনসংখ্যা ছিল ১,৮০,০০,০০০; এ থেকে যদি আমরা বাদ দেই ১৩,৩,০০০ “অভিজাত”, ১৫,০০,০০০ ভিখারী, ভবঘুরে, দুবৃত্ত, বেশ্যা ইত্যাদি ৪৬,৫০,০০০ মধ্য-শ্রেণীর মানুষ, তা হলে থাকে উল্লিখিত ঐ ১,১৩,৩০,০০০ জন। কিন্তু তার মধ্য-শ্রেণীতে তিনি অন্তর্ভুক্ত করেছেন ক্ষুদ্র বিনিয়োগের আয়ের উপরে নির্ভরশীল লোকদের, সরকারি কর্মচারীদের, বিদ্বান শিল্পী, স্কুল-শিক্ষক প্রভৃতিদের এবং এদের সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানোর জন্য তিনি এর মধ্যে ধরেছেন কারখানার উচ্চ বেতন-প্রাপ্ত ৪৬,৫০,০০০ কর্মীকেও ! এমনকি তাদের মধ্যে ধরা হয়েছে রাজ Taong 1 (S. Laing : “National Distress”, &c., London, 1844.). “সেই বিশাল শ্রেণী যাদের খাদ্য সংগ্রহ করার জন্য মামুলি শ্রম ছাড়া দেবার মত আর কিছু নেই, তারাই হল জনসংখ্যার বিপুল অংশ।” ( James Mill, in art. in “Colony” : Supplement to the, Encyclop. Brit.–1831. )
