অধিকন্তু, একটি জিনিস উৎপাদনে কেবল ততটা সময়ই পরিগণিত হবে, যা নির্দিষ্ট সামাজিক অবস্থায় কেবল আবশ্যিক। এর ফলাফল নানাবিধ। প্রথমত, এটা আবশ্যক যে এম সম্পাদিত হচ্ছে স্বাভাবিক অবস্থায়। যদি সুতো কাটার জন্য স্বয়ংক্রিয় ‘মিউল সাধারণ ভাবে প্রচলিত থাকে, তা হলে কাটুনীকে কাটিম আর চরকা যোগানো হবে একটা আজগুবি ব্যাপার। তুলোও এমন হলে চলবে না যে তা এত বাজে যে তা দিয়ে কাজ করতে গেলে বাড়তি অপচয় ঘটে; তাকে হতে হবে উপযুক্ত গুণমান-সমম্বিত। অন্যথা, সামাজিক ভাবে যতটা শ্ৰম আবশ্যিক, দেখা যাবে কাটুনীকে এক পাউণ্ড সুতো কাটতে তার চেয়ে বেশি সময় ব্যয় করতে হচ্ছে, যে-ক্ষেত্রে এই বাড়তি সময়টা মূল্যও উৎপাদন করবে না, অর্থও উৎপাদন করবে না। কিন্তু সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ার বস্তুগত উপাদান গুলি স্বাভাবিক গুণমান-সমন্বিত কিনা, তা নির্ভর করে শ্রমিকের উপরে নয়, সমগ্র ভাবেই ধনিকের উপরে। তার পরে আবার স্বয়ং শ্রমশক্তিকেও হতে হবে গড় কর্ম ক্ষমতার অধিকারী। যে-শিল্পে তাকে নিযুক্ত করা হবে, তাকে তার গড় দক্ষতা, স্বপ্রতিভতা ও তৎপরতার অধিকারী হতে হবে এবং আমাদের ধনিককেই এই ধরনের স্বাভাবিক কুশলতা-সম্পন্ন শ্রমশক্তি ক্রয় করার জন্য উপযুক্ত যত্ন নিতে হবে। এই শক্তিকে প্রয়োগ করতে হবে গড পরিমাণ সক্রিয় এবং স্বাভাবিক মাত্রার তীব্রতা সহকারে; এবং ধনিক এ ব্যাপারে সমান ভাবে সতর্ক যাতে তার শ্রমিকের মুহূর্তের জন্যও অলস না থাকে এবং তাদের শ্রমশক্তি উল্লিখিত সক্রিয়তা ও তীব্রতা সহকারে প্রযুক্ত হয়। একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সে শ্রমশক্তির ব্যবহার ক্রয় করেছে এবং তার অধিকারগুলি সে প্রয়োগ করে। বঞ্চিত হবার কোনো ইচ্ছা তার নেই। সর্বশেষে, এবং এইজন্য আমাদের ধনিক বন্ধুটির একটি নিজস্ব দণ্ডবিধিও আছে, কাঁচামাল ও শ্রম উপকরণের যাবতীয় অপচয়পূর্ণ পরিভোগ কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ, কেননা এইভাবে যা বিনষ্ট হয়, তা হল বিনা-প্রয়োজনে ব্যয়িত শ্রম, যে-শ্ৰম উৎপন্ন দ্রব্যের মধ্যে গণ্য হয়না বা তার মূল্যের মধ্যে প্রবেশ করে না।[৭]
আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি, এমকে বিবেচনা করা যায়, একদিকে, উপযোগিতার উৎপাদনকারী হিসাবে, অন্যদিকে, মূল্যের সৃজনকারী হিসাবে; উপযোগিতার উৎপাদন কারী হিসাবে এবং মূল্যের সৃজনকারী হিসাবে এই যে পার্থক্য, যা আমরা আবিষ্কার করেছি পণ্যের বিশ্লেষণের মাধ্যমে, তা নিজেকে পর্যবসিত করে একই উৎপাদন-প্রক্রিয়ার দুটি দিকের মধ্যে পার্থক্য হিসাবে।
উৎপাদন-প্রক্রিয়াকে যখন বিবেচনা করা যায়, একদিকে, শ্রম-প্রক্রিয়া এবং মূল্য সৃজন-প্রক্রিয়ার ঐক্য হিসাবে, তখন তা হল পণ্যের উৎপাদন; অন্যদিকে, যখন তাকে বিবেচনা করা যায় শ্রম-প্রক্রিয়া এবং উদ্ব-মূল্য উৎপাদনের প্রক্রিয়া হিসাবে, তখন তা উৎপাদনের ধনতান্ত্রিক পদ্ধতি বা পণ্যের ধনতান্ত্রিক উৎপাদন।
আগে এক পৃষ্ঠায় আমরা বলেছি, উত্তমূল্যের-সৃজনে এতে এতটুকুও এসে যায়না যে, ধনিক যে-শ্রম আত্মীকৃত করে, তা সরল অদক্ষ গড়পড়তা গুণমানের শ্রম, নাকি জটিলতর সুদক্ষ শ্রম। গড়পড়তা শ্রমের তুলনায় উন্নততর ও জটিলতর চরিত্রের সমস্ত শ্রমই হচ্ছে অধিকতর মহার্ঘ ভ্ৰম-শক্তি ব্যয়—এমন শ্রমশক্তি, যা উৎপাদন করতে ব্যয় করতে হয় অধিকতর সময় ও শ্রম, এবং সেই কারণেই সরল ও অদক্ষ শ্রমশক্তির তুলনায় যার মূল্য হয় বেশি। এই শ্রমশক্তির মূল্য বেশি হওয়ায় তার পরিভোগও হচ্ছে উন্নততর শ্রেণীর এম, এমন শ্রম যা সমান সময়ে অদক্ষ শ্রমের তুলনায় আনুপাতিক ভাবে উচ্চতর মূল্য উৎপাদন করে। একজন সুতো-কাটুনীর শ্রম এবং একজন স্বর্ণকারের শ্রমের মধ্যে যে পার্থক্যই থাক না কেন, তার শ্রমের যে-অংশ দিয়ে স্বর্ণকার কেবল তার নিজের শ্রমশক্তির মূল্য প্রতিস্থাপিত করে, সেই অংশের সঙ্গে তার শ্রমের বাকি বাড়তি অংশ যা দিয়ে সে উদ্বৃত্ত-মূল্য সৃষ্টি করে, তার কোনো গুণমানগত পার্থক্য নেই। যেমন অলংকার তৈরিতে, তেমন সুতো কাটায়, উদ্ব-মূল্যের উদ্ভব ঘটে কেবল শ্রমের পরিমাণগত আধিক্য থেকে, একই অভিন্ন প্ৰম-প্রক্রিয়ার প্রসারণ থেকে—এক ক্ষেত্রে অলংকার তৈরির প্রক্রিয়ার প্রসারণ এবং অন্য ক্ষেত্রে সুতো তৈরির প্রক্রিয়ার প্রসারণ।[৮]
কিন্তু অন্য দিকে, মূল্য সৃজনের প্রত্যেকটি প্রক্রিয়ায় গড়পড়তা সামাজিক শ্রমে দক্ষ শ্রমের পর্যবসন, যথা ছয় দিনের অদক্ষ শ্রমে এক দিনের দক্ষ শ্রমের পর্যসন, অপরিহার্য।[৯] সুতরাং এমটা বাড়তি হিসাবে কাজ এড়াবার জন্য এবং আমাদের বিশ্লেষণকে সরলতর করার জন্য আমরা ধরে নিচ্ছি যে, ধনিকের দ্বারা নিযুক্ত শ্রমিকের শ্রম হচ্ছে অদক্ষ গড়পড়তা শ্রম।
————
১. যে কথা পূর্ববর্তী একটি টীকায় বলা হয়েছে শ্রমের এই দুটি ভিন্ন ভিন্ন দিকের জন্য দুটি ভিন্ন ভিন্ন শব্দ আছে : সরল এমপ্রক্রিয়ায়, ব্যবহার-মূল্য উৎপাদনের প্রক্রিয়ায়, তা হচ্ছে ‘ওয়ার্ক (কাজ); মূল্য সৃজনের প্রক্রিয়ায়, তা হচ্ছে ‘লেবর (এম)-কথাটিকে এখানে ধরা হচ্ছে তার যথাযথ অর্থনৈতিক অর্থে।
২. এই সংখ্যাগুলি ইচ্ছামত নেয়া হয়েছে।
৩. এটাই হচ্ছে মূল বক্তব্য যার উপরে ফিজিওক্র্যাটদের যে-তত্ত্ব, বলে কৃষি কার্য ছাড়া বাকি সব শ্রমই অনুৎপাদক, তার ভিত্তি; সনাতন পন্থী অর্থনীতিকদের কাছে এই যুক্তি অকাট্য। “Cette facon d’imputer a une seule chose la valeur de plusieurs autres” (par exemple au lin la consommation du tisserand), “d’appliquer, pour ainsidire, couche sur couche, plusieurs valcurs sur une seule, fait que celle-ci grossit d’autant… Le terme d’addition peint tres-bien la maniere dont se forme le prix des ouvrages de maind’oeuvre, ce prix n’est qu’un total de plusieurs valeurs consommees et additionnees ensemble’ or, additionner n’est pas multiplier”, (“Mercier de la Riviere”, 1,c, p, 599,)
