আমাদের ধনিক-ব্যক্তিটি আগে থেকেই সেটা দেখতে পেয়েছিল এবং সেটাই ছিল তার অট্টহাসির কারণ। সুতরাং শ্রমিক তার কর্মশালায় দেখতে পায় ছয় ঘণ্টা কাজ করার মত উৎপাদনের উপায়-উপকরণ নয়, পরন্তু বার ঘণ্টা কাজ করার উপায় উপকরণ। ঠিক যেমন ছয় ঘণ্টার প্রক্রিয়া চলাকালে আমাদের ১০ পাউণ্ড তুলো বিশোষণ করেছিল ছয় ঘণ্টার শ্রম এবং হয়েছিল ১০ পাউণ্ড সূতা, তেমনি এখন ২০ পাউণ্ড তুলো বিশোষণ করে বারো ঘণ্টার শ্রম এবং হয়ে দাঁড়ায় ২০ পাউণ্ড সুতো। এখন এই দীর্ঘায়িত প্রক্রিয়ার উৎপন্ন দ্রব্যটি বিচার করে দেখা যাক। এখন এই ২০ পাউণ্ড সুতোয় বাস্তবায়িত রয়েছে পাঁচ দিনের শ্রম, যার মধ্যে চার দিন তুলল এবং টাকুটির ক্ষয়প্রাপ্ত ইস্পাতের দরুণ এবং বাকি দিনটি সুতো কাটার প্রক্রিয়ায় আত্মীকৃত হয়েছে তুলোর দ্বারা। সোনায় প্রকাশ করলে, পাঁচ দিনের শ্রম দাড়ায় ত্রিশ শিলিং। সুতরাং, আগের মত পাউণ্ড-প্রতি আঠারো-পেন্স দাম ধরে নিলে, এই ত্রিশ শিলিং হয় ২০ পাউণ্ড সুতোর দাম। কিন্তু সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়াটিতে যে-সব পণ্য প্রবেশ করেছিল, তাদের সকলের মূল্যের যোগফল দাঁড়ায় ২৭ শিলিং। সুতরাং, উৎপন্ন দ্রব্যটি উৎপাদনের জন্য যে-মূল্য আগাম দেওয়া হয়েছিল, তার চেয়ে তার মূল্য $ বেশি; ২৭ শিলিং পরিণত হয়েছে ৩০ শিলি-এ; সৃষ্টি হয়েছে ৩ শিলিং পরিমাণ একটি উদ্বৃত্ত-মূল্য। কৌশলটি শেষ পর্যন্ত সার্থক হয়েছে; অর্থ-রূপান্তরিত হয়েছে মূলধনে।
সমস্যার প্রতিটি শর্ত পূর্ণ হয়েছে সেই সঙ্গে যে নিয়মগুলি পণ্য-বিনিময়কে নিয়মিত করে সেগুলিও কোন ক্রমে লঙ্ঘিত হয়নি। বিনিময় হয়েছে সমানে সমানে। কারণ ক্রেতা হিসাবে ধনিক প্রত্যেকটি পণ্যের জন্য, তুলল, টাকু এবং শ্রমশক্তির জন্য পূরে মূল্য দিয়েছে। প্রত্যেক পণ্য-ক্রয়কারী যা করে থাকে, সে তখন তাই করে; সে ঐগুলির ব্যবহার-মূল্য পরিভোগ করে। শ্রমশক্তির পরিভোগ, যা আবার পণ্য। উৎপাদনেরও প্রক্রিয়া, পরিণত হয় ২০ পাউণ্ড সুতোয়, যার মূল্য ৩. শিলিং। আগে যে ছিল পণ্যের ক্রেতা, সেই ধনিক এখন বাজার ফিরে আসে পণ্যের বিক্রেতা হিসাবে। সে তার সুতো বিক্রয় করে পাউণ্ড-প্রতি আঠারো-পেন্স-এ, যা তার সঠিক মূল্য। কিন্তু সব কিছু সত্ত্বেও, সে গোড়ায় সঞ্চলনে যত টাকা ছুড়ে দিয়েছিল, তার চেয়ে ৩ শিলিং বেশি সে সঞ্চলন থেকে তুলে নেয়। এই রূপান্তরণ, অর্থের এই মূলধনে পরিবর্তন, সংঘটিত হয় সঞ্চলনের পরিধির ভিতরে এবং বাইরে, উভয় ক্ষেত্রেই; সঞ্চলনের ভিতরে, কেননা বাজার শ্রমশক্তি ক্রয়ের দ্বারা তা ব্যবস্থিত; সঞ্চলনের বাইরে, কেননা সঞ্চলনের ভিতরে যা করা হয়, তা হচ্ছে উদ্বৃত্ত-মূল্য উৎপাদনের পথে একটি সোপান মাত্ৰ-এমন একটি প্রক্রিয়া, যা সমগ্র ভাবে উৎপাদনের পরিধির মধ্যে নিবন্ধ। অতএব, “tout est pour le mieux dans le meilleur des mondes possibles.
অর্থকে বিভিন্ন পণ্যে রূপান্তরিত করে, যে-পণ্যগুলি কাজ করে নতুন একটি উৎপন্ন দ্রব্যের বিবিধ বস্তুগত উপাদান হিসাবে, সেই পণ্য সমূহের মৃত সত্তায় জীবন্ত শ্রম সঞ্চারিত করে, ধনিক একই সঙ্গে মূল্যকে অর্থাৎ অতীত, বাস্তবায়িত এবং মৃত শ্রমকে রূপান্তরিত করে মূলধনে, মূলে-সংযোজনের মাধ্যমে বৃহত্তর মূল্যে, একটা জীবন্ত দানবে, যা ফলপ্রসূ এবং বৃদ্ধিশীল।
এখন যদি আমরা মূল্য উৎপাদনের এবং উদ্ব-মূল্য সৃজনের দুটি প্রক্রিয়াকে তুলনা করি, আমরা দেখতে পাই যে দ্বিতীয়টি প্রথমটিরই একটি নির্দিষ্ট বিন্দুর বাইরে অনুবর্তন ছাড়া কিছু নয়। যদি একদিকে ঐ নির্দিষ্ট বিন্দুটির বাইরে—যে বিন্দুটিতে শ্রমশক্তির জন্য ধনিক যে-মূল্যটি দিয়েছে, তা একটি যথাযথ সমাৰ্ঘে বস্তুর দ্বারা প্রতি স্থাপিত হয়, সেই বিন্দুটির বাইরে—আর সম্পাদিত না হয়, তা হলে সেটা হবে কেবল মূল্য উৎপাদনেরই একটা প্রক্রিয়া; যদি, অন্য দিকে, তাকে ঐ বিন্দুটির বাইরেও অব্যাহত রাখা হয়, তাহা হলে সেটা পরিণত হয় উদ্বৃত্ত সৃজনের প্রক্রিয়ায়।
আমরা যদি আরো অগ্রসর হই এবং সহজ সরল শ্রম-প্রক্রিয়ার সঙ্গে মূল্য উৎপাদন প্রক্রিয়াটির তুলনা করি, আমরা দেখতে পাই যে প্রথমটি গঠিত হয় উপযোগিতাপূর্ণ শ্রমের দ্বারা, কাজের দ্বারা, যা উৎপাদন করে ব্যবহার-মূল্য। এখানে আমরা এমকে বিবেচনা করি একটি বিশেষ জিনিসের উৎপাদনকারী হিসাবে; আমরা তাকে দেখি
একমাত্র তার গুণগত চেহারায়—তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের পরিপ্রেক্ষিতে। কিন্তু তাকে। যদি আমরা দেখি একটি মূল্য সৃজনকারী প্রক্রিয়া হিসাবে, তা হলে ঐ একই শ্রম-প্রক্রিয়া আমাদের সামনে হাজির হয় একমাত্র তার পরিমানগত চেহারায়। এখানে প্রশ্নটা কেবল এই যে কাজটা করতে শ্রমিকের কত সময় লেগেছে, কতটা সময় ধরে শ্রমশক্তি উপযোগিতাপূর্ণ ভাবে ব্যয়িত হয়েছে। এখানে, যে-পণ্যগুলি ঐ প্রক্রিয়ায় অংশ গ্রহণ করে, সেগুলিকে আর একটি নির্দিষ্ট প্রয়োজনীয় দ্রব্য উৎপাদনে শ্রমশক্তির আবশ্যিক অনুষঙ্গ হিসাবে গণ্য করা হয় না। সেগুলিকে গণ্য করা হয় কেবল এতটা বিশেষিত বা বাস্থবায়িত শ্রমের আধার হিসাবে; সেই শ্রম, তা সে উৎপাদনের উপায়সমূহে আগে থেকেই বিধৃত থাক কিংবা প্রক্রিয়াটি চলাকালে শ্রমশক্তির সক্রিয়তার দ্বারা সেগুলির মধ্যে এই প্রথম সংযোজিত হোক, উভয় ক্ষেত্রেই তা পরিগণিত হয় কেবল তার স্থায়িত্বের সময়ের দ্বারা; তা দাঁড়ায় এতগুলি দিন বা এতগুলি ঘণ্টা– যেখানে যেমন।
