আসলে এই ফল দেখে বিস্মিত হবার কিছু নেই। এক পাউণ্ড সুতোর মূল্য আঠারো পেন্স; আমাদের ধনিক যদি বাজার থেকে ১০ পাউণ্ড সুতা কেনে, তা হলে তাকে দিতে হবে ১৫ শিলিং। এটা স্পষ্ট যে কোন লোক একটা তৈরী বাড়িই কিনুক কিংবা সেটা নিজের জন্য তৈরি করিয়েই নিক, কোনো ক্ষেত্রেই আয়ত্তী করণের পদ্ধতি বাড়িটির জন্য অর্থ বিনিয়োগের পরিমাণ বৃদ্ধি করেন।
নিজের হাতুড়ে অর্থনীতির জ্ঞান নিয়ে আমাদের ধনিকটি চেঁচিয়ে ওঠে, কিন্তু আমি যে অর্থ আগাম দিয়েছিলাম আরো অর্থ পাবার প্রকাশ্য উদ্দেশ্যেই।” নরকের পথ অসদুদ্দেশ্য দিয়ে বাঁধানো, এবং তার সহজেই এই উদ্দেশ্য থাকতে পারে যে আদৌ কোন টাকা উৎপাদন না করেই সে সেই টাকা করবে।[৪] সে সব রকমের ভয় দেখায়। এমন অসতর্ক অবস্থায় আর কখনো সে ধরা দেবে না। ভবিষ্যতে নিজে উৎপাদন না করে সে বাজার থেকে পণ্যগুলি কিনে নেবে। কিন্তু যদি তার সব জাত ভাইয়েরা, বাকি সব ধনিকেরা একই কাজ করে তা হলে বাজারে কোথায় সে ঐ পণ্য পাবে? এবং তার টাকা সে খেতে পারে না। সে যুক্তি দিয়ে বোঝাতে চেষ্টা করে আমার ভোগ সংবরণের কথাটা বিবেচনা করে দেখুন; আমি ঐ ১৫ শিলিং দিয়ে যা খুশি তাই করতে পারতাম। কিন্তু তা না করে আমি তা উৎপাদন শীল ভাবে ব্যবহার করেছি এবং তা দিয়ে সুতো তৈরি করেছি।” তা বেশ, এবং তার পুরস্কার হিসাবে এখন সে খারাপ বিবেকের বদলে পেয়েছে ভাল সুতো; এবং কৃপণের মত টাকা ধরে রাখার কথাই যদি ভোলা হয়, সে কখনো এমন খারাপ পথে পা বাড়াবে না; আমরা আগেই দেখেছি এই ধরনের কৃচ্ছসাধন কোথায় নিয়ে যায়। তা ছাড়া, যেখানে রাজত্ব নেই সেখানে রাজার কোনো অধিকারও নেই, তার ভোগ-সংবরণের যা-ই গুণ থাক না কেন, তাকে বিশেষ ভাবে পুরস্কৃত করার মত কিছু নেই, কেননা উৎপন্ন দ্রব্যটির মূল্য হচ্ছে যে সব পণ্য উৎপাদন প্রক্রিয়ায় নিক্ষিপ্ত হয়েছিল কেবল তাদের মূল্যগুলিরই যোগফল। সুতরাং এই কথা ভেবেই সে সান্ত্বনা পাক যে পুণ্য কর্ম নিজেই নিজের পুরস্কার। কিন্তু না, সে হয়ে ওঠে নাছোড়বান্দা। সে বলে, “তোটা আমার কোনো কাজেই লাগে না; আমি ওটা উৎপাদন করেছিলাম বিক্রি করার জন্য। সে ক্ষেত্রে, সে সেটা বিক্রি করে দিক কিংবা আরো ভালো হয়, সে যদি ভবিষ্যতে কেবল তার ব্যক্তিগত অভাব পুরণের জন্যই জিনিস পত্র উৎপাদন করে এমন একটা দাওয়াই, যা তার চিকিৎসক ম্যাককুলক অতি-উৎপাদনের মহামারীর বিরুদ্ধে আগেই অভ্রান্ত প্রতিকার হিসাবে সুপারিশ করেছিলেন। তখন সে হয়ে ওঠে একগুয়ে। সে প্রশ্ন তোলে, শ্রমিক কি কেবল তার হাত পা দিয়ে শূন্য থেকে পণ্য উৎপাদন করতে পারে? আমি কি তাকে সেই সব দ্রব্য সামগ্রী যোপাইনি যা দিয়ে এবং কেবল যার মধ্যে তার শ্রম মূর্ত হয়ে উঠতে পারে? আর যেহেতু সমাজের বেশির ভাগটাই এই ধরনের কর্মহীন মানুষ নিয়ে তৈরি সেই হেতু আমার উৎপাদনের উপকরণ, আমার তুলল, আমার মাকু ইত্যাদি দিয়ে আমি কি সমাজের অপরিমেয় উপকার করিনি; এবং কেবল সমাজকেই নয়, শ্রমিকেরও করিনি, যাকে তা ছাড়াও আমি যুগিয়েছি প্রাণধারণের দ্রব্য সামগ্রী? এবং এই সব সেবার প্রতিদান হিসাবে আমাকে কি কিছুই দেওয়া হবেনা?” তা বেশ, কিন্তু তার তুলে এবং মাকুকে সুতোয় রূপান্তরিত করে শ্রমিক কি তাকে সমান সেবা দান করে নি। তা ছাড়া, এখানে সেবার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।[৫] একটি ব্যবহার মূল্যের ব্যবহার যোগ্য ফল ছাড়া সেবা আর বেশি কিছু নয়, তা সেই ব্যবহার মূল্যটি পণ্যেরই হোক বা শ্রমের হোক।[৬] কিন্তু এখানে আমরা আলোচনা করছি বিনিময় মূল্য নিয়ে। ধনিক শ্রমিককে দিয়ে ছিল ৩ শিলিং পরিমাণ মূল্য, এবং শ্রমিকও ঐ তুলোর সঙ্গে ৩ শিলিং সংযোজিত করে তাকে ফেরত দিয়েছিল ঠিক সমাৰ্ঘ এক বস্তু; দিয়ে ছিল মূল্যের বিনিময়ে মুল্য। আমাদের বন্ধুটি, এতক্ষণ যে ছিল টাকার গরমে এত গরম সে হঠাৎ ধারণ করল তার নিজেরই শ্রমিকের মত অত্যন্ত ঠাণ্ডা মেজাজ, এবং সরবে বলল : আমি নিজেও কি কাজ করিনি? আমি কি ব্যবস্থাপনা এবং কাটুনীকে তদারক করার কাজ করিনি? এবং এই শ্রমও কি মূল্য সৃষ্টি করে না? তার ম্যানেজার এবং সুপারিন্টেডেন্ট তখন তাদের হাসি লুকোতে চেষ্টা করে। ইতিমধ্যে একটা দিলখোলা অট্টহাসি হেসে সে আবার তার স্বাভাবিক চেহারা ধারণ করে। যদিও সে আমাদের কাছে আওড়ালে অর্থনীতিবিদদের গোটা তত্ত্বটা আসলে সে বলল, এর জন্য সে একটি কানাকড়িও দেবে না। এই সব কৌশল ও কথার মারপ্যাচ সে ছেড়ে দেয় অর্থনীতির অধ্যাপকদের উপরে, যারা তার জন্য টাকা পায়। সে নিজে হচ্ছে একজন কাজের লোক; এবং যদিও তার ব্যবসার বাইরে সে যা বলে তা নিয়ে সব সময়ে মাথা ঘামায় না, কিন্তু তার ব্যবসার ক্ষেত্রে সে জানে সে কি চায়।
ব্যাপারটাকে আরো ঘনিষ্ট ভাবে দেখা যাক। এক দিনের শ্রম শক্তির মূল্য দাঁড়ায় ৩ শিলিং কেননা আমরা ধরে নিয়েছি ঐ শ্রমশক্তির মধ্যে বিধৃত রয়েছে অর্ধ দিনের শ্রম, অর্থাৎ, কেননা শ্রমশক্তি উৎপাদনের জন্য দৈনিক যে-প্রাণ ধারণের উপকরণাদির প্রয়োজন হয় তাতে খরচ হয় অর্ধ-দিনের শ্রম। কিন্তু শ্রমশক্তির মধ্যে যে অতীত শ্রম বিবৃত থাকে এবং যে-জীবন্ত শ্রমকে সে সক্রিয় করে তুলতে পারে; শ্রমশক্তি কে পোষণ করার দৈনিক খরচ এবং কাজে তার দৈনিক ব্যয়-এই দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। প্রথমটি নির্ধারণ করে শ্রমশক্তির বিনিময় মূল্য এবং দ্বিতীয়টি নির্ধারণ করে তা ব্যবহার-মূল্য। ২৪ ঘণ্টা শ্রমিককে জীবিত রাখার জন্য যে আধ দিন শ্রমের প্রয়োজন হয়—এই ঘটনা তাকে একটি পুরো দিন কাজ করা থেকে নিবারণ করেনা। অতএব, শ্রমশক্তির মূল্য এবং ঐ শ্রমশক্তি শ্রম-প্রক্রিয়ায় যে মূল্য উৎপাদন করে—এই দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন রাশি; এবং দুটি মূল্যের মধ্যে এই যে পার্থক্য, সেটাই থাকে ধনিকের নজরে—যখন সে শ্রমশক্তি ক্রয় করে। শ্রমশক্তি যে প্রয়োজনপূর্ণ গুণগুলির অধিকারী এবং যার কল্যাণে সে সুতো বা জুতো তৈরি করে, সেগুলি তার কাছে অপরিহার্য শর্ত ( conditio sine qua non), কেননা, মূল্য সৃষ্টি করতে হলে শ্রমকে অবশ্যই প্রয়োজনপূর্ণ পদ্ধতিতে ব্যয় করতে হবে। যা তাকে বস্তুতই। প্রভাবিত করে, তা হল পণ্যটির বিশেষ ব্যবহার-মূল্যকে, যার সে অধিকারী—কেবল মূল্যের উৎস হবার জন্যই নয়। তার উপরে তার নিজের মুল্যের তুলনায় অধিকতর মূল্যের উৎস হবার জন্যই বটে। এটাই হচ্ছে সেই বিশেষ সেবা যা ধনিক শ্রমিকের কাছ থেকে প্রত্যাশা কবে, এবং এই লেনদেনে সে কাজ করে পণ্য-বিনিময়ের “চিরন্তন নিয়মাবলী” অনুযায়ী। অন্য যে-কোনো পণ্যের বিক্রেতার মত, শ্রমশক্তির বিক্রেতাও তার বিনিময় মূল্যকে আদায় করে এবং তার ব্যবহার-মূল্যকে হাতছাড়া করে। ওটাকে না দিয়ে সে এটাকে নিতে পারে না। শ্রমশক্তির ব্যবহার মূল্য, কিংবা ভাষান্তরে শ্রম, তার বিক্রেতার অধিকারে ততটুকুই থাকে। ঠিক যতটুকু থাকে তেলের ব্যবহার-মূল্য তার বিক্রয়কারী কারবারীর হাতে -তা বিক্রি হয়ে যাবার পৰে। টাকার মালিক এক দিনের শ্রমশক্তির দাম দিয়েছে; সুতরাং তার ব্যবহারের অধিকার এক দিনের জন্য তারই হাতে; এক দিনের শ্রমের সে-ই মালিক। এক দিকে, শ্রমশক্তির দৈনিক প্রাণ-ধারণের জন্য খরচ হয় মাত্র আধ দিনের এম, যখন, অন্য দিকে, সেই একই শ্রমশক্তি কাজ করতে পারে একটা পুরো দিন এবং ফল, এক দিন জুড়ে তার ব্যবহার সৃষ্টি করে যে-মূল্য, তা সে যা দেয় তার দ্বিগুণ-এই তা নিঃসন্দেহে ক্রেতার পক্ষে একটা সৌভাগ্য কিন্তু বিক্রেতার পক্ষে কোনক্রমেই তা ক্ষতিজনক নয়।
