শ্রমিক যখন কাজে থাকে, তখন তার শ্রম নিরন্তর একটা রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যায় প্রথমে সে থাকে গতি পরে সে হয় গতিহীন একটা বিষয়; প্রথমে থাকে কর্মরত শ্রমিক, পরে হয় উৎপা দত জিনিস। এক ঘণ্টা সুতো কাটার শেষে, সেই কাজটি প্রতিফলিত হয় একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ সুতোয়; অন্য ভাবে বলা যায়, একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ শ্রম যেমন এক মাসের শ্রম, মূর্তি পরিগ্রহ করেছে ঐ তুলোয়। আমরা বলি শ্রম অর্থাৎ কাটুনী কর্তৃক তার প্রাণশক্তির <্যয়; আমরা বলি না সুতো কাটার শ্রম কেননা সুতো কাটার জন্য যে বিশেষ ধরনের শ্রম তা এখানে গণ্য হয় কেবল ততটা পর্যন্তই যতটা তা নির্বিশেষ শ্রম শক্তির ব্যয়, কাটুনীর বিশেষ ধরনের কাজ হিসাবে নয়।
আমরা এখন যে প্রক্রিয়াটি নিয়ে আলোচনা করছি তাতে এটা চরম গুরুত্বপূর্ণ যে, নির্দিষ্ট সামাজিক অবস্থায় তুলোকে সুতোয় রূপান্তরিত করতে যতটা সময় আবশ্যক হয়, যাতে তার চেয়ে বেশি সময় পরিভুক্ত না হয়। স্বাভাবিক অর্থাৎ উপানের গড় অবস্থায় যদি ‘ক’ পাউণ্ড তুলোকে ‘খ’ পাউণ্ড সুতোয় রূপান্তরিত করতে লাগে, এক ঘন্টার শ্রম, তা হলে ১২ ‘ক’ পাউণ্ড তুলোকে ১২ ‘খ’ পাউণ্ড সুতোয় পরিণত না। করলে এক দিনের শ্রমকে ১২ ঘণ্টার শ্রম বলে গণ্য করা হয়না কেননা মূল্যর সৃজনের ক্ষেত্রে একমাত্র সামাজিক ভাবে আবশ্যিক শ্রমকেই হিসাবে ধরা হয়।
কেবল এমই নয়, সেই সঙ্গে কাচামাল এবং উৎপন্ন দ্রব্যটিও এখন প্রতিভাত হয় সম্পূর্ণ নোতুন আলোয়—সাদামাটা শ্রম প্রক্রিয়ায় আমরা তাদেরকে যে আলোয় দেখে ছিলাম, তা থেকে সম্পূর্ণই আলাদা এক আলোয়। কঁচামাল এখন কাজ করে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ শ্রমের নিছক বিশেষক হিসাবে। এই বিশেষণের মাধ্যমেই বস্তুত পক্ষে, কঁচামাল পরিবর্তিত হয়, কেননা তা দিয়ে সুতো কাটা হয়, কেননা সুতো কাটার রূপে শ্রম শক্তি তার সঙ্গে যুক্ত হয়; কিন্তু উৎপন্ন দ্রব্যটি অর্থাৎ ঐ সুতো এখন আর তুলোর দ্বারা বিশেষিত শ্রমের একটা পরিমাপ ছাড়া আর কিছু নয়। যদি এক ঘণ্টায় ১৪ পাউণ্ড তুলো দিয়ে ১৪ পাউণ্ড সুতো কাটা যায়, তা হলে ১০ পাউণ্ড সুতো নির্দেশ করে ৬ ঘণ্টা শ্রমের বিশেষণ। উৎপন্ন দ্রব্যের বিভিন্ন নির্দিষ্ট পরিমাণ—এই পরিমাণ গুলি নির্ধারিত হয় অভিজ্ঞতার দ্বারা -এখন প্রতিনিধিত্ব করে কেবল বিভিন্ন নির্দিষ্ট পরিমাণে শ্রমের, বিভিন্ন নির্দিষ্ট আয়তনের স্ফটিকায়িত শ্রম-সময়ের। সেগুলি আর এত ঘণ্টার শ্রমে র বা এত দিনের শ্রমের বাস্তবায়িত রূপ ছাড়া কিছু নয়।
বিষয়টি নিজেই হচ্ছে একটি উৎপন্ন দ্রব্য এবং সেই কারণেই একটি কাচামাল -এই যে ঘটনা তাতে আমাদের যতটা আগ্রহ তার চেয়ে আমরা ঘটনাবলীতে বেশি আগ্রহী নই যে, শ্রম হচ্ছে সুতো কাটার নিদিষ্ট কাজ, তার বিষয় হচ্ছে তুলো এবং তার উৎপন্ন দ্রব্য সুতো। যদি সুতেকাটুনী, সুতো না কেটে কাজ করত কোন কয়লা খনিতে, তা হলে তার শ্রমের বিষয়টি অর্থাৎ কয়লা হত প্রকৃতির সরবরাহ; তৎসত্ত্বেও, উত্তোলিত কয়লার একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ, ধরা যাক, এক হর, একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ বিশশাষিত শ্রমের প্রতিনিধিত্ব করত।
শ্রমশক্তির বিক্রয়ের কালে আমরা ধরে নিয়েছিলাম যে এক দিনের শ্রমশক্তির মূল্য হল তিন শিলিং এবং ঐ তিন শিলিং এর মধ্যে বিধৃত আছে ছয় ঘণ্টার এম; এবং কাজে কাজেই, শ্রমিকের প্রাণ-ধারণের জন্য গড়পড়তা দৈনিক প্রয়োজনীয় দ্রব্য সামগ্রী উৎপাদন করতে আবশ্যক হয় এই পরিমাণ শ্রম। যদি এখন আমাদের কাটুনী এক ঘণ্টা কাজ করে ১ পাউণ্ড তুলে রূপান্তরিত করতে পারে ১*২/৩ পাউণ্ড সুতোয়[২] তা হলে অনুসৃত হয় যে ছয় ঘণ্টায় সে ১০ পাউণ্ড তুলোকে রূপান্তরিত করতে পারে ১০ পাউণ্ড সুতোয়। অতএব সুতোকাটার প্রক্রিয়ায় তুলে। বিশোষণ করে ছয় ঘণ্টার শ্রম। একই পরিমাণ শ্রম বিধৃত হয় তিন শিলিং মূল্যের এক টুকরো সোনায়। সুতরাং দেখা যাচ্ছে কেবল সুতো কাটার শ্রমের দ্বারাই তুলোয় সংযোজিত হচ্ছে তিন শিলিং পরিমাণ মূল্য।
এখন আমরা বিচার করব উৎপন্ন দ্রব্যটির ১০ পাউণ্ড সুতোর মোট মূল্য। এর মধ্যে মূর্তায়িত হয়েছে আড়াই দিনের শ্রম, যার মধ্যে দুদিনের শ্রম বিস্তৃত ছিল তুলে এবং টাকুটির ক্ষয় প্রাপ্ত অংশের মধ্যে আর আধ দিনের শ্রম বিশোষিত হয়েছিল সূতো কাটার প্রক্রিয়ায়। এই আড়াই দিনের শ্রমেরও প্রতিনিধিত্ব করে পনেরো শিলিং মূল্যের এক টুকরো সোনা। অতএব, ১০ পাউণ্ড সুতোর উপযুক্ত দাম হল পনের শিলিং অর্থাৎ এক পাউণ্ডের দাম হল আঠারো-পেন্স।।
আমাদের ধনিক-ব্যক্তিটি সবিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে তাকায়। উৎপন্ন দ্রব্যটিক মূল্য অগ্রিম প্রদত্ত মূলধনের ঠিক সমান। অগ্রিম প্রদত্ত ঐ মূল্যের কোন প্রসার ঘটেনি, কোনো উদ্ধৃত্ত মূল্যের সৃষ্টি হয়নি এবং স্বভাবতই অর্থ মূলধনে রূপান্তরিত হয়নি। সুতোর দাম পনেরো শিলিং, এবং পনেরো শিলিং ব্যয়িত হয়ে ছিল উৎপন্ন দ্রব্যটির সংগঠনী উপদানগুলির বাবদে, কিংবা অন্য ভাবে বলা যায়, শ্রম-প্রক্রিয়ার উপাদান গুলির বাবদে; দশ শিলিং দেওয়া হয়েছিল তুলোর বাবদে, দুই শিলিং টাকুর ক্ষয়প্রাপ্ত অংশটির বাবদে এবং তিন শিলিং, শ্রম শক্তির বাদে। সুতোর পরিস্ফীত মূল্যটি কোনো ব্যাপারই নয়, কেননা আগে যে মূল্যগুলি অবস্থান করত তুলোয়, টাকুতে এবং শ্রমশক্তিতে, সুতোর পরিস্ফীত মূল্যটি কেবল সেগুলিরই যোগফল; আগে থেকেই যে-মূল্যগুলি আছে, সেগুলির সরল যোগফলে কোন উদ্ব-মূল্যের উদ্ভব সম্ভব নয়।[৩] এই পৃথক পৃথক মূল্যগুলি এখন একটি মাত্র জিনিসে, কেন্দ্রীভূত হয়েছে, কিন্তু পণ্যগুলির ক্রয়ের মাধ্যমে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন অংশে পৃথগীভূত হবার আগে পর্যন্ত তারা তো পনেরো শিলিং এর মোট অঙ্কটির মধ্যে সেইভাবেই ছিল।
