আমরা যেন এই ঘটনার দ্বারা বিভ্রান্ত না হই যে যখন টাকুটির উপাদান ব্যবহারের ফলে কিছু মাত্রায় ক্ষয় পেযেছে, তখন তুলেটা একটা নোতুন আকার ধারণ করেছে। মূল্যের সাধারণ নিয়ম অনুসারে, যদি ৪০ পাউণ্ড সুতোর মূল্য হয় = ৪ ০ পাউণ্ড তুলে+ একটি গোটা টাকুর মূল্য অর্থাৎ যদি এই সমীকরণের উভয় দিকের পণ্য-সমূহ উৎপাদন করতে একই কাজের সময়ের প্রয়োজন হয়, তা হলে ১০ পাউণ্ড সুতো হবে একটি টাকুর এক-চতুর্থাংশ সমেত ১০ পাউণ্ড তুলোর সমার্থ। আলোচ্য ক্ষেত্রটিতে একই কাজের সময় এক দিকে বাস্তবায়িত হয় ১০ পাউণ্ড সুতোয়, অন্য দিকে ১০ পাউণ্ড তুলল এবং একটি টাকুর ভগ্নাংশে। সুতরাং মুল্য তুলোয়, টাকুতে বা সুতোয় যাতেই আবির্ভূত হোক, তাতে মূল্যের পরিমাণে কোনো পার্থক্য ঘটেনা। টাকু এবং সুতো পাশাপাশি শান্তভাবে অবস্থান না করে, সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়াটিতে এক সঙ্গে যুক্ত হয়, তাদের রূপ পালটে যায় এবং তারা পরিবর্তিত হয় সুতোয়; কিন্তু তারা যদি কেবল তাদের সমার্থ সুতোর সঙ্গে বিনিমিত হত তার তুলনায় এই ঘটনার দ্বারা তাদের মূল্য বেশি প্রভাবিত হয় না।
তুলোর উৎপাদনের জন্য যে শ্রমের প্রয়োজন হয়, সুতোর জন্য যে কাচামালের প্রয়োজন হয়, তা সুতো উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় শ্রমের অংশ এবং সেই কারণেই সুততার মধ্যে বিস্তৃত। এই একই কথা টাকুর মধ্যে বিধৃত শ্রমের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, যে-টাকুর ক্ষয়-ক্ষতি ছাড়া তুলো থেকে সুতো কাটা যেত না।
অতএব, সুতোর মূল্য বা তা উৎপাদনের জন্ত আবশ্যক এম-সময়ের মূল্য নির্ধারণের ব্যাপারে বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন স্থানে যত বিশেষ প্রক্রিয়া সম্পাদনের প্রয়োজন হয়েছে, যেমন, প্রথমতঃ তুলো এবং টাকুর অপচিত অংশটি উৎপাদনের জন্য সম্পাদিত প্রক্রিয়া এবং তারপরে ঐ তুলোও টাকু দিয়ে সুতো কাটার জন্য সম্পাদিত প্রক্রিয়া, এই সমস্ত প্রক্রিয়াগুলিকে একটি অভিন্ন প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ও পরম্পরাগত পর্যায় হিসাবে গণ্য করা যায় সুতোর মধ্যে বিধৃত গোটা শ্রমটাই হল অতীত শ্রম; এবং এটা মোটেই কোনো গুরুত্বপুর্ণ ব্যাপার নয় যে, তার সংগঠনী উপাদানগুলি উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কর্মকাণ্ডগুলি সম্পাদিত হয়েছিল এমন এমন সময়ে, যা আজকের এই সুতো কাটার চুড়ান্ত কর্মকাণ্ডটির চেয়ে অনেক পূর্ববর্তী। যদি একটি বাড়ি নির্মাণ করতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ শ্রম; ধরা যাক, ত্রিশ দিন লাগে তা হলে তার মধ্যে বিধৃত মোট শ্রমের পরিমাণ এই ঘটনার দ্বারা পরিবর্তিত হয় না যে, প্রথম দিনের চেয়ে উনত্রিশ দিন পরে সম্পাদিত হয়, শেষ দিনের কাজটি। সুতরাং কঁচামাল ও শ্রম-উপকরণ সমূহের মধ্যে বিধৃত শ্রমকে গণ্য করা যায় যেন তা এমন শ্রম যা ব্যয়িত হয়েছিল সুতো কাটার প্রক্রিয়ার গোড়ার দিকের একটি পর্যায়ে, যথার্থ অর্থে সুতো কাটার শ্রম যখন শুরু হয়নি।
উৎপাদনের উপায়সমূহের, অর্থাৎ তুলো ও টাকুর, মূল্যগুলি, যা প্রকাশিত হয় বারো শিলিং দামের মধ্যে সেগুলি স্বভাবতই সুতোর মূল্যের কিংবা, অন্যভাবে বলা যায়, উৎপন্ন দ্রব্যটির মূল্যের সংগঠনী উপাদান।
যাই হোক, দুটি শর্তকে অবশ্যই পূর্ণ করতে হবে। প্রথমত, ঐ তুলো ও সুতোক সংযুক্ত হয়ে অবশ্যই একটি ব্যবহার-মূল্য উৎপাদন করতে হবে। বর্তমান ক্ষেত্রে এই দুটিকে মিলিত হয়ে হতে হবে সুতো। যে-বিশেষ ব্যবহার মূল্যটি তাকে ধারণ করে, তা থেকে মূল্য সেটি থেকে নিরপেক্ষ, কিন্তু তাকে কোন-না-কোন প্রকারের ব্যবহার। মূল্যের মধ্যে অবশ্যই মুর্ত হতে হবে। দ্বিতীয়ত, উৎপাদনের কাজে শ্রম যে সময় লাগায় তা উপস্থিত সামাজিক অবস্থায় যতটা সময় বস্তুতই প্রয়োজন, তার চেয়ে কিছুতেই বেশি হওয়া চলবে না। সুতরাং, ১ পাউণ্ড সুতো কাটতে যদি ১ পাউণ্ডের চেয়ে বেশি তুলো না লাগে, তা হলে ব্যবস্থা নিতে হবে যাতে ১ পাউণ্ড সুতো উৎপাদনে ১ পাউণ্ডের চেয়ে বেশি তুলো পরিভুক্ত না হয় অনুরূপ ভাবে, টাকু সম্পর্কেও ঐ একই কথা। যদি ধনিক-ব্যক্তিটির সখ থাকে এবং সে ইস্পাতের টাকুর বদলে সোনার টাকু ব্যবহার করে, তা হলেও সুতোর মূল্যের যে-কোনো ব্যাপারে একমাত্র যে-মূল্যটি গণ্য হয়, তা হল ইস্পাতের টাকু তৈরি করতে যে-শ্ৰম লাগে, কেবল সেই শ্রম, কেননা উপস্থিত সামাজিক অবস্থায় তার চেয়ে বিশি কিছুর প্রয়োজন নেই।
আমরা এখন জানি সুতোর মূল্যের কতটা অংশ তুলো এবং টাকু থেকে সঞ্জাত। তার পরিমাণ দাঁড়ায় বারো শিলিং কিংবা দু দিনের কাজ। আমাদের আলোচনার পরবর্তী বিষয়টি হল : সুতোর মূল্যের কতটা অংশ কাটুনীর শ্রমের দ্বারা তুলোয় সংযোতিত হয়।
এই শ্রমকে আমাদের এখন দেখতে হবে এমন একটি আকারে যা শ্রম-প্রক্রিয়া চলা কালে সে যে আকার নিয়েছিল; তা থেকে সম্পূর্ণ পৃথক; শ্রম-প্রক্রিয়ায় তাকে আমরা দেখেছিলাম একান্ত ভাবে মানুষের সক্রিয়তার এমন একটি বিশেষ আকারে যা তুলোকে পরিবতিত করে সুতোয়; সেখানে বাকি সব কিছু অপরিবর্তিত থাকলে শ্রম। যতই সেই কাজের পক্ষে উপযুক্ত হয় ততই সুতো উৎকৃষ্ট হয়। কাটুনীর শ্রমকে তখন দেখা হয়েছিল অন্যান্য প্রকারের উৎপাদনশীল শ্রম থেকে নির্দিষ্ট ভাবে পৃথক আকারে একদিকে পৃথক তার বিশেষ উদ্দেশ্যের বিচারে, যা ছিল সুতো কাটা; অন্য দিকে, পৃথক তার কর্মকাণ্ডের বিশেষ চরিত্রের, তার উৎপাদনী উপায় উপকরণের বিশেষ প্রকৃতির এবং তার উৎপন্ন দ্রব্যটির বিশেষ ব্যবহার মূল্যটির বিচারে। সুত কাটার কর্ম কাণ্ডটির জন্য তুলে এবং টাকু অপরিহার্য প্রয়োজন, কিন্তু কামান তৈরির কাজে সেগুলো কোনো কাজেই লাগে না। উলটো দিকে এখানে আমরা কাটুনীর শমকে দেখি কেবল মূল্য সৃজন কারী হিসাবে অর্থাৎ মূল্যের একটি উৎস হিসাবে এবং এই বিচারে তার শ্ৰম কোনো ভাবেই যে লোকটি কামানের নল ছেদা করে তার শ্রম থেকে কিংবা ( আরো কাছের উদাহরণ নিলে ‘ উৎপাদনের উপায় উপকরণের মধ্যে বিধৃত তুলে উৎপাদন কারী ও টাকু-প্রস্তুত কারীর যে শ্রম তা থেকে ভিন্ন নয়। একমাত্র এই অভিন্নতার কারণেই তুলো-আবাদ টাকু তৈরি এবং সুতো-কাটা একটি সমগ্রের অর্থাৎ সুতোর মূল্যের উপাদানগত বিবিধ অংশ হতে পারে, যে-অংশগুলি পরস্পর থেকে কেবল পরিমাণগত ভাবেই বিভিন্ন। এখানে শ্রমের গুণ, প্রকৃতি এবং বিশেষ চরিত্র নিয়ে আমাদের কোনো কিছু বিবেচ্য নেই আমাদের বিবেচ্য একমাত্র তার পরিমাণ। এবং সেটা সহজেই হিসাব করে ফেলা যায়। আমরা এটা ধরে নিচ্ছি যে সুতো কাটা হচ্ছে সরল অদক্ষ শ্রম, সমাজের নিদিষ্ট অবস্থার গড় শ্রম। এর পর আমরা দেখতে পাব, বিপরীত কিছু ধরে নিলেও কোনো পার্থক্য ঘটে না।
