৬. এটা আপাত-বিরোধী বলে মনে হয় যে মাছ ধরা পড়েনা, তাই হল মৎস্য শিল্পে উৎপাদনের অন্যতম উপায়। কিন্তু যে জলে মাছ নেই, সেই জলে মাছ ধরার কৌশলটি কেউই আবিষ্কার করেনি।
৭. উৎপাদনশীল শ্ৰম কি একমাত্ৰ শ্ৰম-প্রক্রিয়া থেকেই তা নির্ধারণ করার পদ্ধতিটি কোন ক্রমেই উৎপাদনের ধনতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
৮. সত্যকার কাচামালকে এবং সহায়ক নামকে স্টর্চ অভিহিত করেন যথাক্রমে Matieres” এবং “Materiaux” বলে। সহায়ক সামীকে Cherbuliez বলেন “Matieres instrumentales”.
৯. যুক্তিবিদ্যার অদ্ভুত কেরামতি দেখিয়ে কনেল টরেন্স বন্য মানুষের এই পাথরের মধ্যে আবিষ্কার করেছেন মূলধনের উৎপত্তি। “বন্য মানুষে বন্য পশুকে তাড়া করে প্রথম যে-পাথরটি ছুড়ল, নাগালের বাইরে কোন ফল পাড়বার জন্য প্রথম যে-লগুড়টি হাতে নিল, তারি মধ্যে আমরা লক্ষ্য করি আরেকটি জিনিস সংগ্রহে সাহায্যের জন্য একটি জিনিসের ব্যবহার, তারি মধ্যে লক্ষ্য করি মূলধনের উৎপত্তি।” (R, Torrens : “An Essay on the production of Wealth. &c. pp. 70-71 )।
১০. উৎপন্ন দ্রব্যাদির মূলধনে রূপান্তরিত হবার আগেই দখলভুক্ত হয়, এই রূপান্তরণ তাদের এই দখলভুক্ত হওয়া থেকে নিরাপত্তা দেয়না।” (Cherbuliez: “Richesse ou pauvrete” edit. paris, 1841, p. 54 )। প্রাণ-ধারণের আবশ্যিক সামগ্রীর একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের বিনিময়ে তার শ্রম বিক্রি করে দিয়ে ‘প্রেলেতারিয়ান’ উৎপন্ন দ্রব্যে কোন অংশ প্রাপ্তির দাবি ছেড়ে দেয়। উৎপন্ন দ্রব্যাদির ভোগ-দখলের পদ্ধতি আগের মতই থেকে যায়; উল্লিখিত ক্রয়-বিক্রয়ের দরুণ তাতে কোনো রদ-বদল ঘটেনা। উৎপন্ন দ্রব্যসম্ভারের মালিকানা থাকে একান্ত ভাবেই সেই ধনিকের দখলভুক্ত, যে কাচামাল ও প্রাণ-ধারণের সামগ্রী সরবরাহ করে, এবং এটা হল ভোগ-দখলের (আত্মীকরণের) নিয়মটির-সুকঠোর পরিণাম; অথচ যে-নিয়মটির মৌল নীতিটি ছিল ঠিক বিপরীত : শ্রমিক যা উৎপাদন করে, তার মালিকানা একান্ত ভাবে তারই।” (1.c. p. 58 ) “যখন শ্রমিকেরা তাদের শ্রমের জন্য মজুরি পায়….. তখন ধনিক কেবল সেই মূলধনেরই মালিক থাকে না”, (তিনি বোঝাতে চাইছেন “উৎপাদনের উপায়-উপকরণ” ) শ্রমেরও মালিক হয়। যদি মজুরি হিসাবে যা দেওয়া হয়, তা মূলধনের মধ্যে ধরা হয়, যা সাধারণতঃ করা হয়, তা হলে মূলধন থেকে এমকে আলাদা বলে ধরা অসম্ভব। এই ভাবে ব্যবহৃত মূলধন’ শব্দটির মধ্যে দুটোই অভুক্ত—এম এবং মূলধন।” (James Mill : Elements of pol. Econ.* &c., Ed. 1821, pp. 70, 71 )।
.
.
৩.২ উদ্বৃত্ত–মূল্যের উৎপাদন
ধনিকের দ্বারা আত্মীকৃত উৎপন্ন দ্রব্যটি হল একটি ব্যবহার মূল্য, যেমন সুতো, বা জুতো। কিন্তু যদিও জুতো হচ্ছে এক অর্থে সমস্ত সামাজিক প্রগতির ভিত্তি, এবং আমাদের ধনিক-ব্যক্তিটি নিঃসংশয়ে একজন প্রগতিবাদী”, কিন্তু তা হলেও সে জুতোর জন্যই জুতো তৈরি করে না। পণ্যের উৎপাদনে ব্যবহার মূল্য কোনো ক্রমেই তার মূল্য লক্ষ্য নয়। ধনিক ব্যবহার-মূল্য উৎপাদন করে কেবল এই কারণে এবং ততক্ষণ পর্যন্ত, যতক্ষণ তা বিনিময়-মূল্যের বস্তুগত ভিত্তি, তার আধার। আমাদের ধনিক ব্যক্তিটির চোখের সামনে আছে দুটি উদ্দেশ্য : প্রথমত, সে চায় এমন একটি ব্যবহার মূল্য উৎপাদন করতে যার বিনিময়-মূল্যও আছে অর্থাৎ সে চায় এমন একটি জিনিস উৎপাদন করতে যেটি বিক্রির জন্য পূর্বনির্ধারিত, তার মানে একটি পণ্য; এবং, দ্বিতীয়ত, সে চায় এমন একটি পণ্য উৎপাদন করতে যার মূল্য হবে উক্ত পণ্যটি উৎপাদন করতে যে সব পণ্য ব্যবহার করা হয়েছে, সে সব পণ্যের মোট মূল্যের চেয়ে বেশি, অর্থাৎ খোলা বাজার থেকে তার সাধের টাকা দিয়ে সে যে-উৎপাদনের উপায় উপকরণ এবং শ্রমশক্তি ক্রয় করেছিল, সেগুলি মোট মূল্যের চেয়ে বেশি। তার লক্ষ্য কেবল ব্যবহার-মূল্যই উৎপাদন করা নয়, মূল্যও উৎপাদন করা; কেবল মূল্যই নয়, সেই সঙ্গে উদ্বৃত্ত-মূল্যও।
মনে রাখতে হবে যে আমরা এখন পণ্যোৎপাদন নিয়ে আলোচনা করছি এবং এই পর্যন্ত আমরা কেবল উক্ত প্রক্রিয়ার একটি মাত্র দিক নিয়ে বিবেচনা করেছি। ঠিক যেমন পণ্যদ্রব্যগুলি একই সঙ্গে ব্যবহার-মূল্য এবং মূল্য, তেমনি সেগুলির উৎপাদনের প্রক্রিয়াও অবশ্যই হবে একটি শ্রম-প্রক্রিয়া এবং সেই একই সঙ্গে আবার মূল্য-সৃজনের প্রক্রিয়াও।[১]
আমরা এখন উৎপাদনকে পরীক্ষা করব মূল্যের সৃজন হিসাবে।
আমরা জানি, প্রত্যেক পণ্যেরই মূল্য নির্ধারিত হয় তার উপরে ব্যয়িত এবং তার মধ্যে বাস্তবায়িত শ্রমের পরিমাণের দ্বারা, বিশেষ সামাজিক অবস্থার মধ্যে তার উৎপাদনের জন্য আবশ্যক কর্ম-কালের দ্বারা। আমাদের ধনিক ব্যক্তিটির জন্য সম্পাদিত শ্রম-প্রক্রিয়ার ফলে তার হাতে যে উৎপন্ন দ্রব্য আসে, সেই তার ক্ষেত্রেও এই নিয়মটি প্রযোজ্য। যদি ধরে নেওয়া যায়, এই উৎপন্ন দ্রব্যটি হল ১০ পাউণ্ড সুতো আমাদের পদক্ষেপ হবে তার মধ্যে রূপায়িত শ্রমের পরিমাণটি হিসাব করা।
সুতো কাটার জন্য কচিমাল লাগে; ধরা যাক, এ ক্ষেত্রে তা হচ্ছে ১০ পাউণ্ড তুলল। বর্তমানে আমাদের এই তুলোর মূল্য হিসাব করার কোনো দরকার নেই, কেননা আমরা ধরে নেব আমাদের ধনিক-ব্যক্তিটি তা ক্রয় করেছে তার পূর্ণ মূল্যে, ধর। যাক, দশ শিলিং মূল্যে। তুলোর উৎপাদনের জন্য যে-শ্ৰম লেগেছিল সেটা এই দামের মধ্যে সমাজের গড় শ্রমের হিসাবে প্রকাশিত হয়েছে। আমরা আরো ধরে নেব যে আমাদের টাকুর ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ, যে টাকু আমাদের উপস্থিত উদ্দেশ্য সাধনের জন্য প্রতিনিধিত্ব করছে বিনিয়োজিত সমস্ত শ্রম-উপকরণের, সেই টাকুর ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ হচ্ছে ২ শিলিং পরিমাণ মূল্য। তা হলে, যদি ২৪ ঘণ্টার শ্রম কিংবা দুটি শ্রম-দিবসের প্রয়োজন হয় ১২ শিলিং দ্বারা প্রকাশিত সোনার পরিমাণ উৎপাদন করতে, তা হলে আমরা শুরুতেই পাই ইতিমধ্যেই সুতোর মধ্যে অঙ্গীভূত দুদিনের শ্রম।
