এখন আমাদের ভাবী ধনিকটির কাছে ফিরে যাওয়া যাক। আমরা তাকে ছেড়ে এসেছিলাম ঠিক তখন, যখন সে সবে, খোল বাজারে, শ্রম-প্রক্রিয়ার যাবতীয় প্রয়োজনীয় উপাদানগুলি ক্রয় করেছিল—শ্রম-প্রক্রিয়ার বিষয়গত উপাদানগুলি অর্থাৎ উৎপাদনের উপায়সমূহ এবং সেই সঙ্গে তার বিষয়ীগত উপাদানগুলিও অর্থাৎ শ্রম শক্তিও। একজন বিশেষজ্ঞের তীক্ষ দৃষ্টিতে সে বাছাই করে নিয়েছে তার বিশেষ শিল্পটির পক্ষে সবচেয়ে বেশি উপযোগী উৎপাদনের উপায় এবং বিশেষ ধরণের শ্রমশক্তি -তা সেই শিল্প সুতো কাটাই হোক, জুতো তৈরিই হোক বা অন্য কিছুই হোক। তার পরে সে অগ্রসর হয় ঐ পণ্যটিকে, তার সদ্য-ক্রীত শ্রমশক্তিকে পরিভোগ করতে; তা করতে গিয়ে সে শ্রমিককে দিয়ে, শ্রমশক্তির ব্যক্তি-ঘূর্তিটিকে দিয়ে, তার শ্রমের মাধ্যমে উৎপাদনের উপায়গুলিকে পরিভোগ করায়। এটা স্পষ্ট যে শ্রম-প্রক্রিয়ার সাধারণ চরিত্রটি এই ঘটনার দ্বারা পরিবর্তিত হয় না যে, শ্রমিক তার নিজের জন্য কাজ না করে, কাজ করে ধনিকের জন্য, অধিকন্তু, জুতো-তৈরি বা সুতো-কাটায় যে যে বিশেষ পদ্ধতি ও প্রণালী নিয়োগ করা হয়, ধনিকের এই প্রবেশের ফলে তা সঙ্গে সঙ্গেই পরিবর্তিত হয়ে যায় না। বাজারে শ্রমশক্তি যে অবস্থায় পাওয়া যায়, সেই অবস্থাতেই তাকে নিয়ে ধনিককে কাজ শুরু করতে হয়। সুতরাং, ধনিকদের অভ্যুদয়ের অব্যবহিত প্রাক্কালে যে-ধরণের শ্রম পাওয়া যায়, তাই নিয়েই তাকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়। মূলধনের কাছে শ্রমের বশ্যতা-প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে উৎপাদনের পদ্ধতিতে পরিবর্তন শুরু হতে পারে কেবল পরবর্তী এক কালে; সুতরাং তা নিয়ে আলোচনাও করা হবে পরবর্তী কোন পরিচ্ছেদে।
যে-প্রক্রিয়ায় ধনিক শ্রমশক্তিকে পরিভোগ করে, সেই প্রক্রিয়াতে পরিণত হলে শ্রম-প্রক্রিয়ায় দুটি বৈশিষ্ট্য-সূচক ব্যাপার সূচিত হয় প্রথমত, শ্রমিক কাজ করে তার শ্রমের যে মালিক, সেই ধনিকের নিয়ন্ত্রণে; যাতে করে কাজটি সঠিক ভাবে সম্পন্ন হয়, উৎপাদনের উপায়গুলি বুদ্ধির সঙ্গে ব্যবহৃত হয়, কোনো কাঁচামালের অপচয় না ঘটে, কাজ চলাকালে স্বাভাবিকভাবে যে ক্ষয়-ক্ষতি হয় তার চেয়ে বেশি যাতে না হয়, সেই সবের জন্য ধনিক ভাল রকম তদারকি করে।
দ্বিতীয়তঃ, উৎপন্ন দ্রব্যটি হয় ধনিকের সম্পত্তি, শ্রমিকের অর্থাৎ প্রত্যক্ষ উৎপাদন কারীর নয়। ধরুন, একজন ধনিক একদিনের এম-শক্তি তার মূল্য অনুযায়ী ক্রয় করল; তা হলে একদিনের জন্য সেই শ্রমশক্তি ব্যবহারের অধিকার সে আয়ত্ত করে যেমন এক দিনের জন্য একটি ঘোড়া ভাড়া করলে, সে দিনের জন্য সেটি ব্যবহারের অধিকার সে পায়; অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রেও যা হয়। শ্রমশক্তি ক্রয় করে ধনিক সেই শ্রমকে প্রাণের দ্যোতনা হিসাবে একীভূত করে উৎপাদ্য দ্রব্যটির নিষ্প্রাণ উপাদানগুলির সঙ্গে। তার দিক থেকে, শ্রম-প্রক্রিয়া তার ক্রীত পণ্যের তথা শ্রমশক্তির পরিভোগের চেয়ে বেশি কিছু নয়; কিন্তু উৎপাদনের উপায়সমূহ দিয়ে শ্রমশক্তিকে সমন্বিত না করে এই পরিভোগ সম্পন্ন করা যায় না। যে সমস্ত জিনিস ধনিক ক্রয় করেছে, যে সমস্ত জিনিস তার সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে, সেই সমস্ত জিনিসের মধ্যেকার প্রক্রিয়াটিই হচ্ছে শ্রম-প্রক্রিয়া। যেমন তার কুঠরির মধ্যে গজিয়ে তোলার প্রক্রিয়ার ফলে যে-মদ উৎপন্ন হয়, সেই মদের সে মালিক, ঠিক তেমনি উল্লিখিত শ্রম-প্রক্রিয়ার ফলে যে দ্রব্য উৎপন্ন হয়, সেই দ্রব্যেরও সে মালিক।[১০]
————
১. পৃথিবীর স্বতঃস্ফূর্ত উৎপাদনসমূহ পরিমাণে অল্প এক মানুষ থেকে সম্পূর্ণ তন্ত্র; এই কারণে মনে হয় যেমন কোন যুবককে কিছু অর্থ দেওয়া হয় যাতে সে কোন একরকমের এম-শিল্পে ব্যাপৃত হয়ে তার ভাগ্য গড়ে নিতে পারে যেন তেমন গবেই প্রতি একলিকে দিয়েছে।(James Stuart : Principles of polit. Econ* edit. Dablin, 1770,v. I. Pw116 )
২. যুক্তি-বুদ্ধি যেমন শক্তিশালী, তেমন সুকৌশল। তার এই সুকৌশলী দিকটি প্রকাশ পায় প্রধানত তার মধ্যস্থতার ভূমিকায়, যা বিভিন্ন জিনিসকে তাদের নিজ নিজ প্রকৃতি অনুযায়ী পরস্পরের উপরে ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়া করার সুযোগ দিয়ে, এবং এইভাবে সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়াটিতে কোনো প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ না করেই, যুক্তি বুদ্ধির অভিপ্রায়কে কার্যকরী করে।” ( Hegel : “Enzyklopadie, Erster Theil, Die Logik”, Berlin, 1840, p. 382 ).
৩. (Theorie de l Econ. Polit. Paris, 1815) নামক তার গ্রন্থটি অন্যদিক থেকে শোচনীয় হলেও, গ্যানিল ‘ফিজিওক্র্যাটদের বিরোধিতা করে এক দীর্ঘ তালিকা উপস্থিত করেছেন, যাতে তিনি আশ্চর্যজনক ভাবে দেখিয়েছেন, সঠিক ভাবে যাকে কৃষিকার্য বলা যায়, তার সুচনার জন্য কতগুলি প্রক্রিয়া পার হওয়া আবশ্যক
৪. তুর্গো তার “Reflexions sur la Formation et la Distribution des Richesses” (1766) নামক বইয়ে সভ্যতার শৈশবে গৃহপালিত জন্তু জানোয়ারের গুরুত্বের কথা বিবৃত করেছেন।
৫. উৎপাদনের বিভিন্ন যুগের মধ্যে কৃৎকৌশলগত তুলনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ পণ্য হচ্ছে যাকে যথাযথ ভাবে বলা যায় ‘বিলাস-দ্রব্য। সমগ্র সমাজ জীবনের, অতএব, সমগ্র বাস্তব জীবনের ভিত্তিই হচ্ছে বস্তুগত উৎপাদনের বিকাশ; এতাবৎকাল আমাদের লিখিত ইতিহাসগুলি বস্তুগত উৎপাদনের বিকাশ সম্পর্কে যত সামান্যই লিখুক না কেন, তবু প্রাগৈতিহাসিক আমলকে কিন্তু শ্রেণীবিভক্ত করা হয়েছে তথাকথিত ঐতিহাসিক অনুসন্ধানের ফলাফল অনুসারে নয়, বরং বস্তুগত অনুসন্ধানের ফলাফল অনুসারেই। যে যুগে সে সামগ্রী দিয়ে উপকরণ ও হাতিয়ার তৈরি হত, সেই অনুসারেই হয়েছে তার নামকরণ, যেমন প্রস্তরযুগ, বোগ-যুগ ও লৌহ-যুগ।
