অতএব, আমরা দেখতে পাচ্ছি, একটি ব্যবহার মূল্য কিভাবে গণ্য হবে, কঁচামাল হিসাবে, না শ্রম-উপকণ হিসাবে, না উৎপন্ন দ্রব্য হিসাবে, তা সম্পূর্ণভাবে নির্ধারিত হয় ম-প্রক্রিয়ায় তার ভূমিকার দ্বারা, সেখানে তা অবস্থানে থাকে তার দ্বারা; তা যখন বদলে যায়, তার চরিত্রও তখন বদলে যায়।
সুতরাং যখনি একটি উৎপন্ন দ্রব্য একটি নোতুন শ্রম-প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করে উৎপাদনের উপায় হিসাবে, তখনি তা তার দ্বারা তার উৎপন্ন দ্রব্যের চরিত্রটি হারায় এবং সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়াটিতে একটি উপাদান-মাত্রে পরিণত হয়। একজন সুতো-কাটুনী তার টাকুগুলিকে দেখে কেবল সুতো কাটার উপকরণ হিসাবে, শনকে দেখে কেবল সুতো কাটার কঁচামাল হিসাবে। অবশ্য, কাচামাল আর টাকু ছাড়া সুতো কাটা অসম্ভব। সুতরাং সুতো কাটার কাজটি আরম্ভ করার সময়ে উৎপন্ন দ্রব্য হিসাবে নিশ্চয়ই এই জিনিসগুলির অস্তিত্ব ধরে নিতে হবে। কিন্তু এই জিনিসগুলি যে পূর্বকৃত শ্রমের ফল, খোদ এই ঘটনা সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়াটিতে সম্পূর্ণ ভাবেই গুরুত্বহীন ব্যাপার। যেমন রুটিটা কৃষকের, ঘনি-ওয়ালার, না যে সেটা সঁাকে তার পূর্বকৃত শ্রমের ফল পরিপাক-প্রক্রিয়ায় তার কোনো গুরুত্ব নেই। উলটো, সাধারণতঃ উৎপন্ন দ্রব্য। হিসাবে তাদের বিভিন্ন ত্রুটির দ্বারাই কোনো প্রক্রিয়ার অন্তর্গত উৎপাদন উপকরণ সমূহ নিজেদেরকে প্রকাশ করে তাদের উৎপন্ন দ্রব্যগুলির চরিত্রে। একটি ভোতা ছুরি কিংবা ভঙ্গুর সুতো জোর করেই আমাদের মনে পড়িয়ে দেয় ছুরি-নির্মাতা এ ক-এর কথা, সুতো-কাটুনী ঐ খ-এর কথা। তৈরি জিনিসটিতে, যে-শ্রমের মাধ্যমে সেটা তার উপযোগিতা পূর্ণ গুণগুলি পেয়েছে, সেই শ্রম দৃষ্টিগোচর নয়, বাহ্যত তা অন্তর্হিত হয়ে গিয়েছে।
যে মেশিন প্রমের উদ্দেশ্য সাধন করেনা, তা অকেজো। উপরন্তু, তা প্রাকৃতিক শক্তিসমূহের বিধ্বংসী প্রভাবের কবলে পড়ে। লোহায় মরচে ধরে, কাঠ পচে যায়। যে সুতো দিয়ে আমরা সেলাইও করি না, বয়নও করি না, তা তুলোর অপচয় মাত্র। জীবন্ত শ্রম এদেরকে আয়ত্তে আনবে, মরণ-ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলবে, নিছক সম্ভাব্য ব্যবহার ধুলা থেকে এদের পরিবতিত করবে বাস্তব ও কার্যকর ব্যবহার-মূল্যে। এমের নিলে তিৰিক্ত হয়ে, এমের দেহযন্ত্রের অঙ্গীভূত হয়ে এবং ফেন সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়াটিতে মিলে কর্তব্য-কর্ম সম্পাদনের জন্য সঞ্জীবিত হয়ে এরা কান্তবিক পক্ষে পৰিভুক্ত হয় কিন্তু পরিভুক্ত হয় একটি উদ্দেশ্য অনুযায়ী—নোতুন নতুন ব্যবহার-মূল্যের নতুন নোতুন উৎপন্ন দ্রব্যের, বিবিধ প্রাথমিক উপাদান হিসাবে, যে-মূল্যগুলি তথা দ্রব্যগুলি প্রাণ-ধারণের উপায় হিসাবে ব্যক্তিগত পরিভোগর জন্য, উৎপাদনের উপায় হিসাবে কোন নোতুন শ্রম, প্রক্রিয়ার জন্য সদা-প্রস্তুত।
সুতরাং, একদিকে, তৈরি জিনিস সমূহ যদি শ্রম-প্রক্রিয়ার কেবল ফলই না হয়, সেই সঙ্গে শ্রম-প্রক্রিয়ার আবশ্যিক শর্তও হয়, তা হলে, অন্যদিকে, উক্ত প্রক্রিয়ায় তাদের অন্তভুক্তি তথা জীবন্ত শ্রমের সঙ্গে তাদের সংস্পর্শই হবে একমাত্র উপায়, যার দ্বারা ব্যবহার-মূল্য হিসাবে তাদের চরিত্র রক্ষা করা যায়, তাদেরকে কাজে লাগানো যায়।
শ্রম তার বস্তুগত উপাদানগুলিকে, তার বিষয়-সামগ্রীকে এবং তার উপকরণসমূহকে ব্যবহারে লাগায়, সেগুলিকে পরিভোগ করে এবং সেই কারণে শ্রম একটি পরিভোগেরও প্রক্রিয়া। ব্যক্তিগত পরিভোগ এবং এই ধরণের উংপাদনশীল পরিভোগের মধ্যে পার্থক্য এই যে, প্রথমটি উৎপন্ন-দ্রব্যকে ব্যবহারে লাগায় জীবিত ব্যক্তির প্রাণধারণের উপকরণ হিসাব; দ্বিতীয়টি তা ব্যবহারে লাগায় উপায় হিসাবে, একমাত্র যে-হিসাবে জীবিত ব্যক্তির শ্রমকে তথা শ্রমশক্তিকে সক্রিয় হতে সক্ষম করা যায়। সুতরাং ব্যক্তিগত পরিভোগর উৎপন্ন ফল হচ্ছে পরিভোক্তা নিজেই, অন্যদিকে, উৎপাদনশীল পরিভোগর ফল কিন্তু এমন একটি উৎপন্ন দ্রব্য সেটি পরিভোক্তা থেকে স্বতন্ত্র।
সুতরাং, শ্রমের উপকরণসমূহ ও বিষয়-সামগ্রী যে-পর্যন্ত নিজেরাই হচ্ছে উৎপন্ন দ্রব্য, সে পর্যন্ত দেখা যায়, শ্রম উৎপন্ন দ্রব্য পরিভোগ করে পুনরায় উৎপন্ন দ্রব্য সৃষ্টি করার জন্যই অর্থাৎ এক প্রস্ত দ্রব্য পরিভোগ করার মাধ্যমে সেগুলিকে পরিণত করে আরেক প্রস্তু দ্রব্যে। কিন্তু ঠিক যেমন শুরুতে শ্রম-প্রক্রিয়ার শরিক ছিল কেবল মানুষ এবং পৃথিবী, যার অস্তিত্ব মানুষের অস্তিত্ব-নিরপেক্ষ, ঠিক তেমন এখনো আমরা শ্ৰম-প্রক্রিয়ায় নিয়োগ করি উৎপাদনের এমন অনেক উপায়, যেগুলি পাওয়া যায় সরাসরি প্রকৃতির কাছ থেকে, যেগুলির মধ্যে প্রতিফলিত হয় না মানুষের শ্রমের সঙ্গে প্রাকৃতিক বস্তু-সামগ্রীর কোনো সম্মিলিন।
উপরে যেন করা হয়েছে, তেমনিভাবে শ্রম-প্রক্রিয়াকে যদি তার বিবিধ প্রাথমিক উপাদানে পর্যবসিত করা হয়, তা হলে সেটা হয় ব্যবহার মূল্য উৎপাদনের উদ্দেশ্যে মানুষের সক্রিয়তা, মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে প্রাকৃতিক বস্তু-সামগ্রীর উপযোজন, মানুষ এবং প্রকৃতির মধ্যে বস্তুর বিনিময় ঘটাবার জন্য এটা একটা আবশ্যিক শর্ত; মানুষের পক্ষে এটা হচ্ছে প্রকৃতি কর্তৃক আরোপিত একটা চিরন্তন শর্ত এবং স্বভাবতই সেই অস্তিত্বের প্রত্যেকটি সামাজিক পর্যায় থেকে নিরপেক্ষ অথবা, বরং বলা যায়, এমন প্রত্যেকটি পর্যায়ের ক্ষেত্রেই সমাপেক্ষ (কমন’ )। সুতরাং, অন্যান্য শ্রমিকের সঙ্গে সংঘোগে আমাদের শ্রমিককে উপস্থাপিত করার আবশ্যক হয়নি; একদিকে মানুষ আর তার প্রম এবং অন্যদিকে প্রকৃতি ও তার বস্তু-সামগ্রীই আমাদের পক্ষে যথেষ্ট ছিল। যেমন ‘পরিজ’-এর স্বাদ থেকে বোঝা যায় নাকে ওট উৎপাদন কয়েছিল, তেমনি এই সরল প্রক্রিয়াটি নিজে থেকে আপনাকে বলে দেয়না কি সেই সামাজিক অবস্থাবলী, যার অধীনে সেটি সংঘটিত হচ্ছে; দাস-মালিকের পাশবিক চাবুকের তলায় নাকি, ধনিকের ব্যগ্র চোখের নীচে, সিসিন্যাটাস তার ছোট্ট ক্ষেতটি চাষ করার সময়ে নাকি একজন বন্য মানুষ পাথর দিয়ে বুনো জানোয়ার মারার সময়ে। [৯]
