যেসমস্ত জিনিস শ্রমকে তার বিষয়টিতে প্রত্যক্ষ ভাবে স্থানান্তরিত করতে ব্যবহৃত হয় এবং যেগুলি সেই কারণে কোন-না-কোন ভাবে সক্রিয়তার পরিবাহী হিসাবে কাজ করে, সেই সমস্ত জিনিস ছাড়াও, ব্যাপকতর অর্থে আমরা শ্রমের উপকরণসমূহের মধ্যে ধরতে পারি এমন যাবতীয় বিষয় শ্রম-প্রক্রিয়া সম্পাদনের জন্য যেগুলির প্রয়োজন হয়। এগুলি প্রত্যক্ষ ভাবে শ্রম-প্রক্রিয়ার মধ্যে প্রবেশ করে না, কিন্তু এগুলিকে বাদ দিয়ে শ্ৰম-প্রক্রিয়া আদৌ সম্পাদিত হওয়া অসম্ভব কিংবা যদি সম্ভবও হয়, তা হলেও কেবল আংশিক মাত্রায়। আরো একবার আমরা পৃথিবীকে দেখি এই ধরনের একটি সর্বজনীন উপকরণ হিসাবে, কেননা তা শ্রমিককে দেয় দাঁড়াবার ঠাই এবং তার কাজের জন্য নিয়োগ-ক্ষেত্র। যেসব উপকরণ পূর্ব-কৃত শ্রমের ফল এবং সেই সঙ্গে আবার এই শ্রেণীরও অন্তভুক্ত, সেগুলির মধ্যে আমরা দেখি কর্মশালা, খাল, সড়ক ইত্যাদি।
সুতরাং শ্রম-প্রক্রিয়ায় মানুষের সক্রিয়তা, শ্রম-উপকরণের সহায়তায়, শ্রমের সামগ্রীর উপরে সংঘটিত করে এমন একটি পরিবর্তন, যা শুরু থেকেই পরিকল্পনা করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়াটি উৎপাদিত দ্রব্যটির মধ্যে অন্তর্হিত হয়ে যায়; দ্রব্যটি হয় একটি ব্যবহার-মূল্য-প্রকৃতির সামগ্রী, যাকে পরিবর্তনের মাধ্যমে উপযোজিত করা হয়েছে মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে। শ্রম নিজেকে তার বিষয়টির মধ্যে অঙ্গীভূত করেছে; এম হযেছে বাস্তবায়িত এবং বিষয়টি হয়েছে রূপান্তরিত। যা শ্রমিকদের মধ্যে দেখা গিয়েছিল গতিশীল সক্রিয় হিসাবে, উৎপাদিত দ্রব্যটিতে তাই এখন দেখা যায় গতিহীন অব্যয় গুণ হিসাবে। কর্মকার (গরম নরম লোহাকে ) কোন আকার দেবার জন্য। হাতুড়ি চালায়; যা উৎপন্ন হয়, তা একটি নির্দিষ্ট আকার ( আকার-প্রাপ্ত সামগ্রী)।
আমরা যদি গোটা প্রক্রিয়াটিকে তার ফলের দিক থেকে উৎপন্ন দ্রব্যটির দিক থেকে বিচার করি, তা হলে এটা পরিষ্কার হয়ে যায় শ্রমের উপকরণ এবং শ্রমের বিষয়—উভয়ই হল উৎপাদনের উপায়,[৬] এবং এম নিজেই হল উৎপাদনশীল শ্রম।[৭]
যদিও শ্রম-প্রক্রিয়া থেকে উৎপন্ন হয় একটি দ্রব্যের আকারে একটি ব্যবহার-মূল্য, তা হলেও পূর্ব-কৃত শ্রমের দ্বারা উৎপন্ন দ্রব্যসমূহ উৎপাদনের উপায় হিসাবে তার মধ্যে প্রবিষ্ট হয়। একই ব্যবহার-মূল্য একই সঙ্গে পূর্ববর্তী একটি প্রক্রিয়ার উৎপন্ন ফল এবং পরবর্তী একটি প্রক্রিয়ার উৎপাদনের উপায়। সুতরাং উৎপন্ন দ্রব্য কেবল ফুলই নয়, সেই সঙ্গে শ্রমের আবশ্যিক শর্তও বটে।
আহরণমূলক শিল্পগুলি ছাড়া, যেখানে প্রকৃতিই সাক্ষাৎভাবে শ্রমের সামগ্রী যোগায়, যেমন খনি-খনন, শিকার, মাছ-ধর। ও কৃষিকাজ, (যখন তা কুমারী মাটি চাষ করার ব্যাপার ),—এগুলি ছাড়া, শিল্পের বাকি সকল শাখাই কাজ করে কাঁচামাল নিয়ে, শ্রমের মাধ্যমে পরিশ্রুত সামগ্রী নিয়ে, শ্রম-জাত দ্রব্যাদি নিয়ে। কৃষিকার্যে যেমন বীজ। জীবজন্তু এবং গাছপালা, যেগুলিকে আমরা প্রকৃতির উৎপাদন বলে ভাবতে অভ্যস্ত, সেগুলি তাদের বর্তমান রূপে কেবল, ধরুন, গত বছরেরই শ্রমের ফল নয়, সেগুলি মানুষের তত্ত্বাবধানে এবং মানুষের শ্রমের মাধ্যমে বহু প্রজন্ম-ব্যাপী অব্যাহত ক্রমিক রূপান্তরের ফল। কিন্তু বিপুলতর সংখ্যক ক্ষেত্রেই এমনকি খুব ভাসা-ভাসা দর্শকের চোখেও শ্রমের উপকরণসমূহের মধ্যে ধরা পড়ে বিভিন্ন অতীত যুগের চিহ্ন।
কাচামাল গঠন করতে পারে কোন উৎপন্ন দ্রব্যের প্রধান উপাদান, নয়তো, তার গঠনে প্রবেশ করতে পারে একটি সহায়ক সামগ্রী হিসাবে। সহায়ক সামগ্রী পরিভুক্ত হতে পারে শ্রমের উপকরণসমূহের দ্বারা, যেমন বয়লার-এর নিচেকার কয়লা, তেল পরিভুক্ত হয় চাকার দ্বারা, খড় চাষের ঘোড়ার দ্বারা; কিংবা কোন কাচামালে কিছু পরিবর্তন ঘটাবার জন্য তাকে মেশানো যেতে পারে সেই কঁচামালটির সঙ্গে, যেমন কোরা কাপড়ে ক্লোরিন, লোহার সঙ্গে কয়লা, উলের সঙ্গে রঙ; কিংবা তা সাহায্য করতে পারে খোদ কাজটিকেই সম্পাদন করতে, যেমন কর্মশালায় তাপ ও আলোর ব্যবস্থা করবার জন্য জিনিসগুলি। প্রধান উপাদান এবং সহায়ক সামগ্রীর মধ্যেকার পার্থক্য খাঁটি রাসায়নিক শিল্পগুলিতে অন্তর্হিত হয়ে যায়, কেননা তার মূল গঠনে উৎপন্ন দ্রব্যটির সত্তায় কাঁচামালের কোনটিরই পুনরাবির্ভাব ঘটে না।[৮]
প্রত্যেক বিষয়েরই থাকে বিবিধ গুণ এবং সেই জন্য প্রয়োগ করা যায় বিভিন্ন ব্যবহারে। সুতরাং একই অভিন্ন উৎপন্ন দ্রব্য একেবারে ভিন্ন ভিন্ন প্রক্রিয়ায় কাঁচামাল হিসাবে কাজ করতে পারে। যেমন, দানাশস্য; ঘানি-ওয়ালা, শ্বেতসার-প্রস্তুতকারক, মদ-চোলাইকারী এবং গো-পালক -সকলের কাছেই তা কাচামাল। তা তার নিজের উৎপাদনেও বীজের আকারে কাঁচামাল হিসাবে প্রবেশ করে, কয়লাও কয়লা-খননের শিল্পের একই সঙ্গে উৎপন্ন দ্রব্য এবং উৎপাদনের উপকরণ।
আবার, একটি বিশেষ উৎপন্ন দ্রব্য একই অভিন্ন প্রক্রিয়ায় শ্রমের উপকরণ এবং কাচামাল উভয় ভাবেই ব্যবহৃত হতে পারে। যেমন ধরুন, গো-মেদ-বর্ধন, যেখানে জন্তুটি একই সঙ্গে কাঁচামাল এবং সার-উৎপাদনের একটি উপকরণ।
একটি উৎপন্ন দ্রব্য, পরিভোগর জন্য প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও, অন্য একটি দ্রব্য উৎপাদনের কাঁচামাল হতে পারে, যেমন আঙর ফল, যখন তা ব্যবহৃত হয় মদ তৈরি করার জন্য। অপর পক্ষে, এম তার উৎপন্ন দ্রব্য এমন এক রূপে আমাদের দিতে পারে, যাতে আমরা তাকে কেবল কঁচামাল হিসাবেই ব্যবহার করতে পারি, যেমন তুলে, সুতো ইত্যাদি। এমন একটি কাচামাল, যা নিজে একটি উৎপন্ন দ্রব্য হওয়া সত্ত্বেও, যেতে পারে গোটা এক প্রস্ত বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে : যে সব প্রক্রিয়ার প্রত্যেকটিতে আবার তা নিরন্তর পরিবর্তনশীল রূপে কাজ করে কাঁচামাল হিসাবে, যে পর্যন্ত ঐ প্রস্তটির সর্বশেষ প্রক্রিয়া সমাপ্ত হবার পরে তা পরিণত হয় একটি সর্বাব্দ সম্পূর্ণ উৎপন্ন দ্রব্যে ব্যক্তিগত পরিভোগর জন্যও প্রস্তুত, শ্রমের উপকরণ হিসাবে ব্যবহারের জঃ ও প্রস্তুত।
