ধনিক শ্রমশক্তি ক্রয় করে তা ব্যবহার করার জন্য; এবং ব্যবহারে নিযুক্ত শ্রম শক্তিই হচ্ছে স্বয়ং শ্রম। শ্রমশক্তির বিক্রেতাকে কাজে নিযুক্ত করেই শ্রমশক্তির ক্রেতা তা পরিভোগ করে। আগে সে ছিল সম্ভাব্য শ্রমিক কিন্তু কাজ করার মাধ্যমে সে হয়ে ওঠে বস্তুতঃই সক্রিয় শ্রমশক্তি অর্থাৎ শ্রমিক। যাতে করে তার শ্রম একটি পণ্যে পুনরাবির্ভূত হতে পারে, সেই জন্য তাকে সবার আগে তার শ্রমশক্তিকে ব্যয় করতে হবে এমন কিছুর উপরে যার আছে উপযযাগিতা, যা কোন এক রকমের অভাব পূরণে সক্ষম। অতএব, ধনিক শ্রমিককে যা করবার জন্য প্রবৃত্ত করে, তা হল একটি বিশেষ ব্যবহার-মূল্য, একটি নির্দিষ্ট জিনিস। ব্যবহার-মূল্য তথা দ্রব্যসামগ্রীর উৎপাদন সম্পাদিত হয় কোন ধনিকের নিয়ন্ত্রণে বা তার পক্ষে-এই যে ঘটনা, তা উৎপাদনের সাধারণ চরিত্রকে পরিবর্তিত করে না। সুতরাং, বিশেষ বিশেষ সামাজিক অবস্থাবলীতে শ্রম-প্রক্রিয়া যে বিশেষ বিশেষ রূপ ধারণ করে, তা থেকে স্বতন্ত্রভাবে আমরা শ্ৰম-প্রক্রিয়া সম্পর্কে আলোচনা করব।
প্রথমত, শ্রম হচ্ছে এমন একটি প্রক্রিয়া যাতে মানুষ এবং প্রকৃতি উভয়েই অংশ গ্রহণ করে, এবং যেখানে মানুষ স্বেচ্ছায় তার নিজের এবং প্রকৃতির মধ্যেকার বাস্তব প্রতিক্রিয়াগুলি সূচনা করে নির্ধারণ করে, নিয়ন্ত্রণ করে। প্রকৃতির উৎপাদন-সমূহকে তার বিবিধ অভাবের সঙ্গে উপযোজিত আকারে আত্মীকৃত করার উদ্দেশ্যে সে নিজেকে প্রকৃতির বিপরীতে স্থাপন করে প্রকৃতিরই অন্যতম শক্তি হিসাবে। এই ভাবে বাহ্ন জগতের উপরে কাজ করে এবং তাকে পরিবর্তিত করে, সে সেই সঙ্গে তার নিজের প্রকৃতিরও পরিবর্ন ঘটায়। সে তার সুপ্ত শক্তিগুলিকে বিকশিত করে এবং সেগুলিকে বাধ্য করে তার নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করতে। শ্রমের যেসব আদিম প্রবৃত্তিজাত রূপ আমাদের কেবল পশুর কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়, এখন আমরা সেগুলি নিয়ে আলোচনা করছি না। মনুষ্য-শ্ৰম যখন ছিল তার প্রবৃত্তিগত পর্যায়ে সেই অবস্থা যে-অবস্থায় মানুষ তার শ্রমশক্তিকে বাজারে নিয়ে আসে তা পণ্য হিসাবে বিক্রি করার জন্য—এই দুই অবস্থার মধ্যে রয়েছে অপরিমেয় কালের ব্যবধান। শমকে আমরা ধরে নিচ্ছি এমন একটি রূপে, যার উপরে একান্ত ভাবেই মনুষ্য-প্রমের অভিধা মুদ্রিত। একটা মাকড়সা এমন অনেক ক্রিয়া সম্পাদন করে, যেগুলি একজন তন্তুবায়ের দ্বারা সম্পাদিত বিবিধ ক্রিয়ার অনুরূপ, এবং মৌচাক নির্মাণের কাজে একটা মৌমাছি একজন স্থপতিকেও লজ্জা দেয়। কিন্তু সবচেয়ে খারাপ স্থপতি এবং সবচেয়ে ভাল মৌমাছির মধ্যে পার্থক্য এই যে, স্থপতি তার ইমারতটি বাস্তবে গড়ে তোলার আগে সেটাকে গড়ে তোলে তার কল্পনায়। প্রত্যেকটি শ্ৰম-প্রক্রিয়ার শেষে আমরা পাই এমন একটি ফল, যেটি ঐ প্রক্রিয়াটির শুরুতেই ছিল শ্রমিকটির কল্পনার। যে-সামগ্রীটির উপরে সে কাজ করে, সে কেবল তার রূপেরই পরিবর্তন ঘটায় না, সে তার মধ্যে রূপায়িত করে তার নিজেরই একটি উদ্দেশ্য, যা তার কর্ম-প্রণালীটিকে করে একটি নিয়মের অনুসারী, যে-নিয়মটির কাছে তার নিজের অভিপ্রায়ও বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য। এবং এই বশ্যতা কোন ক্ষণস্থায়ী ব্যাপার নয়। দৈহিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অনুশীলন ছাড়াও, সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়াটি দাবি করে যে, সমগ্র কর্মকাণ্ডটি জুড়ে কর্মী-মানুষটির অভিপ্রায় তার উদ্দেশ্যের সঙ্গে অবিচল ভাবে সঙ্গতি রক্ষা করে চলবে। এর মানে হল ঘনিষ্ঠ মনঃসংযোগ। কাজের প্রকৃতি এবং যে-পদ্ধতিতে তা সম্পাদিত হয় সেই পদ্ধতি যত কম আকর্ষণীয় হয়, এবং, সেই কারণে, তার দৈহিক ও মানসিক শক্তিগুলির স্মৃতির পক্ষে তা যত কম উপভোগ্য হয়, ততই সে আরো বেশি ঘনিষ্ঠ মনঃসংযোগ করতে বাধ্য হয়।
এম-প্রক্রিয়ার প্রাথমিক উপাদানগুলি হচ্ছে : (১) মানুষের ব্যক্তিগত সক্রিয়তা, অর্থাৎ খোদ কাজ, (২) ঐ কাজটির বিষয় এবং (৩) তার উপকরণ।
ভূমি (এবং অর্থনীতিতে জলও তার অন্তভুক্ত), কুমারী অবস্থায় যা মানুষকে যোগায়[১] প্রাণ-ধারণের আবশ্যিক দ্রব্যসামগ্রী বা উপায়সমূহ—সেই ভূমির অস্তিত্ব মানুষের অস্তিত্ব-নিরপেক্ষ এবং তা মনুষ্য-শ্ৰম-প্ৰয়োগের সর্বজনীন বিষয়। সেই যাবতীয় সামগ্রী, যেগুলিকে এম কেবল পরিবেশের সঙ্গে তাদের প্রত্যক্ষ সংঘোগ থেকে বিচ্ছিন্ন করে-সেই যাবতীয় সামগ্রীই হচ্ছে প্রকৃতির দ্বারা স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে প্রদত্ত শ্রম-প্ৰয়োগের বিষয়। যেমন মাছ, যা আমরা ধরি এবং জল থেকে তুলে নিই; কাঠ, যা আমরা বন থেকে কেটে আনি এবং আকর, যা আমরা খনি থেকে তুলে আনি। অপর পক্ষে, প্রমের বিষয়টি যদি হয়, বলা যায়, পূর্ব-কৃত শ্রমের মাধ্যমে পরিত, তা হলে তাকে আমরা বলি কঁচামাল; যেমন, ইতিপুর্বে তুলে আনা আকর, যাকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে ধৌত করার জন্য। সমস্ত কাচামালই শ্রম-প্রয়োগের বিষয় কিন্তু প্রত্যেকটি শ্রম-প্রয়োগের বিষয়ই কাচামাল নয়; তা কাচামালে পরিণত হয় শ্রমের মাধ্যমে কিছুটা পরিবর্তিত হবার পরে।
শ্রমের উপকরণ হচ্ছে এমন একটি জিনিস বা একা ধক জিনিসের সংখ্যাবিন্যাস ( ‘কমপ্লেক্স’ ), যাকে শ্রমিক স্থাপন করে তার নিজের এবং তার শ্রম-প্রয়োগের বিষয়ের মধ্যস্থলে এবং যা কাজ করে তার সক্রিয়তার পরিবাহী হিসাবে। অন্যান্য বস্তুকে তার উদ্দেশ্যের বশবতী করার জন্য সে ব্যবহার করে কিছু বস্তুর যান্ত্রিক, দৈহিক ও রাসায়নিক গুণাবলীকে।[২] গাছের ফলের মত প্রাণ-ধারণের এমন তৈরি জিনিস ইত্যাদিকে, যেগুলি সংগ্রহ করতে মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গই কাজ করে শ্রমের উপকরণ হিসাবে, সেগুলিকে আলোচনার বাইরে রাখলে, যে জিনিসটিকে মানুষ সর্বপ্রথম করায়ত্ত করে, সেটি তার শ্রমের বিষয় নয়, প্রমের উপকরণ। এই ভাবে প্রকৃতি পরিণত হয় তার একটি কর্মেন্দ্রিয়ে, যাকে সে তার দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলির সঙ্গে যুক্ত করে নেয় এবং এই ভাবে, বাইবেল-এর বাণী সত্ত্বেও, নিজের উচ্চতাকে বৃদ্ধি করে নেয়। যেমন পৃথিবীই হচ্ছে মানুষের প্রথম ভাড়ার ঘর, তেমনি পৃথিবীই হচ্ছে তার প্রথম হাতিয়ারখানা। দৃষ্টান্ত হিসাবে বলা যায়, পৃথিবী তাকে যোগায় পাথর, যা সে ব্যবহার করে ছোড়ার জন্য, পেষার জন্য, চাপ দেবার জন্য, কাটবার জন্য। পৃথিবী নিজেই শ্রমের একটি উপকরণ, কিন্তু যখন সে কৃষিকর্মে এই ভাবে ব্যবহৃত হয়, তখন প্রয়োজন হয় গোটা এক প্ৰস্ত উপকরণের এবং শ্রমের অপেক্ষাকৃত উচ্চ-বিকশিত মানের।[৩] শ্রমের ন্যূনতম বিকাশ ঘটলেই তার আবশ্যক হয় বিশেষ ভাবে তৈরি-করা উপকরণসমূহের। এই কারণেই প্রাচীনতম গুহাগুলির মধ্যে আমরা পাই পাথরের উপকরণ ও অস্ত্রশস্ত্র। মানুষের ইতিহাসের আদিতম যুগে গৃহপালিত জন্তুগুলি অর্থাৎ সেই উদ্দেশ্যেই যেগুলি প্রতিপালিত এবং শ্রমের মাধ্যমে পরিবর্তিত হয়েছে, সেই জন্তুগুলি এবং তাদের সঙ্গে বিশেষ তৈরি-করা পাথর, কাঠ, হাড় ও খোলকগুলি শ্রমের উপকরণ হিসাবে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করে।[৪] শ্রমের উপকরণের ব্যবহার ও নির্মাণ, যদিও কোন কোন প্রজাতির জন্তুর মধ্যে বীজাকারে বর্তমান ছিল, তা হলেও সেগুলিই হচ্ছে মানুষের শ্রম প্রক্রিয়ার নির্দিষ্ট চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য, এবং সেই কারণেই ফ্র্যাংকলিন মানুষের সংজ্ঞা দিযেছেন হাতিয়ার নির্মাণকারী জন্তু হিসাবে। জন্তু-জানোয়ারের লুপ্ত প্রজাতিসমূহের নির্ধারণে জীবাশ্মের যে-গুরুত্ব সমাজের লুপ্ত অর্থনৈতিক রূপগুলির সন্ধানকার্যে অতীত কালের শ্রম-উপকরণগুলিরও সেই একই গুরুত্ব। কি কি জিনিস তৈরি হল, তা নয়, কিভাবে সেগুলি তৈরি হল, কোন্ কোন্ হাতিয়ার দিয়ে সেগুলি তৈরি হল, সেগুলিই আমাদের সক্ষম করে বিভিন্ন অর্থনৈতিক যুগকে নির্ণয় করতে।[৫] মনুষ্য-শ্রম বিকাশের কোন্ মাত্রায় পৌছেছে, তা বুঝাবার জন্য শ্রমের উপকরণসমূহ আমাদের কেবল একটা মানদণ্ডই যোগায় না, সেই সঙ্গে সেই শ্ৰম যে-সামাজিক অবস্থায় সম্পাদিত হয়েছিল, তার একটা নির্দেশক হিসাবেও কাজ করে। পাইপ, টব, ঝুড়ি, কলসী ইত্যাদি যেগুলি লাগে কেবল শ্রমের মাল-মশলা ধারণ করতে এবং যেগুলিকে আমরা সাধারণ ভাবে বলতে পারি উৎপাদনের সংবহন-প্রণালী’, সেগুলির তুলনায় শ্রমের উপকরণসমূহের মধ্যে যেগুলি যান্ত্রিক প্রকৃতির, যেগুলিকে আমরা বলতে পারি উৎপাদনের অস্থি ও পেশী সেগুলি আমাদের যোগায় উৎপাদনের একটি বিশেষ যুগের চরিত্র-নির্ণয়ের চের বেশি নিশ্চয়ত্মক বৈশিষ্ট্যসমূহ। পাইপ, টব ইত্যাদিগুলি প্রথমে গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা নিতে শুরু করে রাসায়নিক শিল্পসমূহে।
