এই যে পরিধি আমরা পরিত্যাগ করে চলে যাচ্ছি, যে পরিধিটির মধ্যে শ্রমশক্তির বিক্রয় এবং ক্রয় সংঘটিত হয়, সেই পরিধিটির বাস্তবিক পক্ষে কিন্তু মানুষের সহজাত অধিকারসমূহের নন্দন কানন’। একমাত্র সেখানেই রাজত্ব করে স্বাধীনতা, সমতা, সম্পত্তি এবং বেন্থাম। স্বাধীনতা, কেননা কোন পণ্যের, ধরা যাক শ্রমশক্তির, ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়েই এখানে কেবল তাদের নিজ নিজ স্বাধীন ইচ্ছার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। স্বাধীন কর্তৃত্ববলে তারা চুক্তিবদ্ধ হয় এবং যে চুক্তিটিতে তারা আবদ্ধ হয়, সেটি তাদের দুজনের অভিন্ন ইচ্ছার আইনগত অভিব্যক্তিরই রূপ। সমতা, কেননা যেমন একজন পণ্যদ্রব্যাদির সরল স্বত্বাধিকারীর সঙ্গে ঠিক তেমনি এখানেও তারা পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কে প্রবেশ করে, এবং তারা সমার্ঘ সামগ্রীর সঙ্গে সমার্ঘ সামগ্রীর বিনিময় করে সম্পত্তি, কেননা প্রত্যেকেই লেনদেন করে যা তার নিজস্ব কেবল তা-ই। একমাত্র যে-শক্তিটি তাদের দুজনকে একত্রিত করে, পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত করে, তা হচ্ছে স্বার্থপরতা, দুজনেরই লাভ ও ব্যক্তিগত স্বার্থ। প্রত্যেকেই ভাবে নিজের কথা, অন্যেরটা নিয়ে কেউই মাথা ঘামায় না এবং যেহেতু তারা এরূপ করে, ঠিক সেহেতুই তারা সব কিছুই করে পূর্ব প্রতিষ্ঠিত এক বিশ্ববিধান অনুসারে কিংবা বিশ্ববুদ্ধিমান এক বিধাতার তত্ত্বাবধানে; তারা কাজ করে পরস্পরের সুবিধার জন্য, সাধারণ কল্যাণের জন্য, সকলের স্বার্থের জন্য।
সরল সঞ্চলনের তথা পণ্যবিনিময়ের এই যে পরিধি, যা থেকে স্বাধীন বাণিজ্যের ধ্বজাধারী” আহরণ করে তার ধ্যানধারণা ও মতামত, আহরণ করে মূলধন ও মজুরির উপরে প্রতিষ্ঠিত এক সমাজের বিচার-বিশ্লেষণে তার মানদণ্ড, এই পরিধিটি পরিত্যাগ করলে, আমাদের মনে হয়, আমরা আমাদের নাটকীয় চরিত্রটির শারীরবৃত্তে একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করতে পারি। আমাদের নাটকীয় চরিত্রটি আগে ছিল মহাজন, এখন সে সামনে এসে দাড়ায় একজন পুজিবাদী হিসেবে, তার পেছনে আসে শ্রমশক্তির স্বত্বাধিকারী তথা শ্রমিক। একজন রাশভারি চালে চাপা পড়ে হাসে, ব্যবসা করতে চনমন করে; অন্যজন আসে এস্ত পায়ে, দ্বিধাগ্রস্ত মনে কেউ যদি তার নিজের চামড়া নিয়ে আসে বাজারে কিন্তু বিনিময়ে প্রত্যাশা করে না কিছুই এক চাবুকের মার খাওয়া ছাড়া, ঠিক তার মতো–সংকুচিত ও দ্বিধাগ্রস্ত।
————
১. “অর্থের আকারে……মূলধন কোন মুনাফা উৎপাদন করে না” ( রিকার্ডো, … পলিটিক্যাল ইকোনমি পৃঃ ২৬৭)
২. চিরায়ত পুরাতথ্যের বিশ্বকোষগুলিতে আমরা এই ধরনের উদ্ভট উক্তি লক্ষ্য করি : “স্বাধীন শ্রমিক এবং ক্রেডিট প্রথা না থাকলেও প্রাচীন জগতে মূলধন কিন্তু পরিপূর্ণভাবে বিকশিত ছিল। মমসেন-ও তার ‘রোমের ইতিহাস’-এ এ ধরনের ভুলের পরে ভুল করেছেন।
৩. এই কারণেই বিভিন্ন দেশের আইনই শ্রম-চুক্তির ক্ষেত্রে একটি সর্বোচ্চ সীম। বেঁধে দেয়। যেখানে স্বাধীন শ্রমই রেওয়াজ, সেখানেই আইন চুক্তি ছেদ করার বিবিধ পদ্ধতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। কতকগুলি রাষ্ট্রে, বিশেষ করে মেক্সিকোতে ( আমেরিকার গৃহযুদ্ধের পূর্বে, যে-ভূখণ্ডগুলি মেক্সিকো থেকে নেওয়া হয়েছিল, সেইগুলিতেও এবং কুসা কর্তৃক সংঘটিত বিপ্লব অবধি ড্যানুবিয়ার প্রদেশগুলিতেও) ‘পিওনেজ’-এর আকারে ক্রীতদাস-প্রথা প্রচ্ছন্ন ছিল। শ্রমের সাহায্যে পরিশোধ্য এই শর্তে অগ্রিম দিয়ে কেবল ব্যক্তি-শ্রমিককে নয়, তার পরিবারকেও বংশানুক্রমিক ভাবে কার্যতঃ অগ্রিম-দাতার ও তার পরিবারের সম্পত্তিতে পরিণত করা হত। জুয়াবেজ এই ‘পিওনেজ’-প্রথার অবসাদ ঘটান। তথাকথিত সম্রাট ম্যাক্সিমিলিয়ান আবার এক অধ্যাদেশ জারি করে এই প্রথাকে প্রতিষ্ঠিত করেন, যে-অধ্যাদেশটিতে ওয়াশিংটনের প্রতিনিধি-সভা’-য় মেক্সিকোতে ক্রীতদাস-প্রথার পুনঃপ্রতিষ্ঠা বলে সঠিক ভাবেই নিন্দা করা হয়। আমার বিশেষ বিশেষ্ণ দৈহিক ও মানসিক শক্তি ও সক্ষমতাগুলির ব্যবহারকে আমি সীমিত সময়ের জন্য অন্যের হাতে তুলে দিতে পারি; কেননা এই নিয়ন্ত্রণের ফলে সেগুলির উপরে সমগ্র ভাবে আমি থেকে পরকীকৃত একটি চরিত্রের ছাপ পড়ে যায়। কিন্তু আমার সমস্ত শ্রম-সময় এবং আমার সমগ্র কাজের পরকীকরণের আমি স্বয়ং সত্তাটিকেই, অর্থাৎ, আমার সার্বিক সক্রিয়তা ও বাস্তবতাকেই, আমার ব্যক্তি সত্তাকেই রূপান্তরিত করি অপরের post feco y (Hegel, “Philosophie des Rechts.” Berlin, 1840, p. 104 ($)
৪. সুতরাং পুজিতন্ত্রের যুগের বৈশিষ্ট্য এই যে শ্রমিকের নিজের চোখেও শ্রম শক্তি পণ্যের রূপ ধারণ করে; এই শ্রমশক্তিই তার পণ্য এবং স্বভাবতই তা হয় মজুরি প্রম। পক্ষান্তরে, কেবল সেই মুহূর্ত থেকেই শ্রমের ফল সার্বজনীনভাবে পরিণত হয় পণ্যে।
৫. “কোন মানুষের মূল্য বা অর্থ হচ্ছে তার দাম—অর্থাৎ যা তার শক্তি ব্যবহারের জন্য দেওয়া হবে।” (টমাস হবস, লেভিয়াথান, পৃঃ ৭৬)
৫. ভূমি-দানের তদারককারী হিসেবে রোমের ‘ভিলিকাস’ “কর্মবিযুক্ত দাসদের থেকে স্বল্পতর পারিশ্রমিক পেত, কারণ তার কাজ ছিল লঘুতর।” (Jh. Mommesen, Rom Geschichte, 1856, p. 810)
৬. দ্রষ্টব্য: ধনটন, ওভার পপুলেশন অ্যাণ্ড ইটস রেমিডি’, লণ্ডন ১৮ ৪৬।
