শ্রমশক্তির মূল্যের নিম্নতম মাত্রা নির্ধারিত হয় সেই সব পণ্যদ্রব্যর মূল্যের দ্বারা, যে সবের প্রাত্যহিক সরবরাহ ছাড়া শ্রমিক তার প্রাণশক্তি নবীকৃত করতে পারে না; অন্য ভাবে বলা যায় যে শ্রমশক্তির মূল্যের নিম্নতম মাত্রা নির্ধারিত হয় সেই সব জীবনধারণী উপায়-উপকরনের দ্বারা, যেগুলি দৈহিক দিক থেকে অপরিহার্য। শ্ৰম-শক্তির দাম যদি এই নিম্নতম মাত্রায় পড়ে যায়, তা হলে পড়ে যায় তার মূল্যেরও নীচে, কেননা এই পরিস্থিতিতে শ্রমশক্তিকে ভরণপোষণ ও সংরক্ষণ করা যেতে পারে কেবল এক পঙ্গু অবস্থায়। কিন্তু প্রত্যেকটি পণ্যের মূল্যই নির্ধারিত হয় সেই পরিমাণ শ্রমসময়ের দ্বারা, যা তার স্বাভাবিক গুণমানে কর্মক্ষম রাখবার পক্ষে আবশ্যক।
এ কথা বলা যে, শ্রমশক্তির মূল্যের এই পদ্ধতিতে নির্ধারণ হচ্ছে একটা পাশবিক পদ্ধতি, একটা সস্তা ভাবাবেগের প্রাকাশমাত্র, কেননা এই পদ্ধতিটিই ঘটনার প্রকৃতি দ্বারাই ব্যবস্থিত; কিংবা রসি’র সঙ্গে সুর মিলিয়ে হাহাকার করে এ কথা বলাও একটা সস্তা ভাবাবেগের প্রকাশমাত্র যে, “উৎপাদনের প্রক্রিয়া চলাকালীন শ্রমিকদের জীবনধারণী উপায়-উপকরণ থেকে আমরা যে বিয়োজন করি, সেই একই সময়ে শ্রমের ক্ষমতাকে (Puissance de travail) উপলব্ধি করা হচ্ছে একটি মায়ামূর্তিকে ( etre de raison) উপলব্ধি করা। আমরা যখন শ্রম বা শ্রম ক্ষমতার কথা বলি, তখন সেই সঙ্গেই আমরা বলি শ্রমিকের এবং তার জীবনধারণী উপায়-উপকরণের কথা শ্রমিকের এবং তার মজুরির কথা।[৯] যখন আমরা শ্রম ক্ষমতার কথা বলি, আমরা তখন শ্রমের কথা বলি না, যেমন যখন আমরা পপরিপাকের কথা বলি তখন আমরা পরিপাকের ক্ষমতার কথা বলি না। পরিপাক প্রক্রিয়ায় একটি সুস্থ পাকস্থলী ছাড়াও আরো কিছু প্রয়োজন হয়। যখন আমরা শ্ৰম-ক্ষমতার কথা বলি তখন আমরা জীবনধারনের আবশ্যিক উপায়-উপকরণ থেকে বিয়োজন করি না। উটো, ঐ উপায়-উপকরণের মূল্যই প্রকাশিত হয় শ্রম-ক্ষমতার মূল্যের মধ্যে। যদি তার শ্রম-ক্ষমতা অবিক্রীত থাকে, তা হলে শ্রমিক তা থেকে কোনো সুবিধা পায় না; বরং সে অনুভব করবে যে এটা হচ্ছে প্রকৃতি-আরোপিত একট। নিষ্ঠ, আবশ্যিকতা যে, এই ক্ষমতার দরুন ব্যয় করতে হয়েছে জীবনধারণী উপায় উপকরণের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ এবং এই ক্ষমতার পুনরুৎপাদনের দরুন এই ব্যয় ক্রমাগত করেই যেতে হবে। তখন সে সিম দি’র সঙ্গে একমত হবে যে ‘শ্রমের ক্ষমতা কিছুই না যদি তা বিক্রয় না হয়।'[১০]
পণ্য হিসেবে শ্রমশক্তির বিশিষ্ট প্রকৃতির একটি ফলশ্রুতি এই যে ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে চুক্তি হয়ে যাবার পরে তার ব্যবহার-মূল্য সঙ্গে সঙ্গেই বিক্রেতার হাতে চলে যায় না। অন্যান্য প্রত্যেকটি পণ্যের মতই এরও মূল্য সঞ্চলনে যাবার আগেই স্থিরীকৃত হয়ে যায়, কেননা সামাজিক শ্রমের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ এর উপর ব্যায়িত হয়েছে। কিন্তু এর ব্যবহার-মূল্য বিধৃত হয় পরবর্তীকালে এর শক্তির অনুশীলনে। শ্রমশক্তির পরকীকরণ এবং ক্রেতা কর্তৃক বাস্তবে তার প্রয়োগীকরণ, ব্যবহার-মূল্য হিসেবে এর নিয়োজন-একটি সময়গত ব্যবধানের দ্বারা পৃথগীকৃত। কিন্তু যে-সমস্ত ক্ষেত্রে একটি পণ্যের ব্যবহার-মূল্যের বিক্রয়ের দ্বারা আনুষ্ঠানিক পরকী করণ তার ক্রেতার হাতে বাস্তবে হস্তান্তরণের সঙ্গে যুগপৎ সংঘটিত হয় না, সে ক্ষেত্রে ক্রেতাব অর্থ সচরাচর পরিপ্রদানের উপায় হিসেবে কাজ করে।[১১] যেসব দেশে পুজিবাদী উৎপাদন-পদ্ধতির রাজত্ব, তাদের প্রত্যেকটিতেই প্রচলিত প্রথা, এই যে চুক্তি অনুসারে নির্ধারিত সময়কাল জুড়ে শ্রমশক্তি প্রযুক্ত না হওয়া পর্যন্ত, যেমন সপ্তাহ অতিক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত, শ্রমশক্তির জন্য কিছু না ব্যয় করা। সুতরাং সকল ক্ষেত্রেই শ্রমশক্তির ব্যবহার-মূল্যে পুজিবাদীকে আগাম দেওয়া হয় : দাম। পাবার আগেই শ্রমিক তা মালিককে ভোগ করতে দেয়, সর্বত্রই সে পুজিবাদীকে ঋণ দেয়। এই ঋণদান যে কোন অলীক কল্পনা মাত্র নয় তা দেখা যায় যখন কখনো কখনো পুজিবাদী মালিকটি দেউলিয়া হয়ে যায় এবং শ্রমিকদের মজুরি মারা যায়।[১২] কেবল তাই নয়, আরো দীর্ঘস্থায়ী ফলাফলের মধ্যেও তা দেখা যায়।[১৩] যাই হোক, অর্থ ক্রয়ের উপায় হিসাবেই কাজ করুক আর প্রদানের উপায় হিসেবেই কাজ করুক, তার দরুণ পণ্যদ্রব্যাদির বিনিময়ের প্রকৃতিতে কোন অদলবদল হয় না। এম শক্তির দাম চুক্তির দ্বারা স্থিরীকৃত, যদিও বাড়ির ভাড়ার মতো পরবর্তী সময়ের আগে তা আদায় করা যায় না। শ্রমশক্তি বিক্রয় করে দেওয়া হয়, যদিও তার বাবদে যা পাওনা তা পাওয়া যায় পরে। সুতরাং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির সম্পর্ক সঠিক ভাবে বুঝতে হলে, সাময়িক ভাবে ধরে নেওয়া সুবিধাজনক যে, প্রত্যেকটি বিক্রয় উপলক্ষেই শ্রমশক্তির মালিক সঙ্গে সঙ্গেই চুক্তিগত হারে তার প্রাপ্য দাম পেয়ে যাচ্ছে।
আমরা এখন জানি যে শ্রমশক্তি নামধেয় স্ববিশিষ্ট পণ্যটির মালিককে ঐ পণ্যের ক্রেতাব্যক্তিটি যে মূল্য দেয় তা কিভাবে নির্ধারিত হয়। বিনিময়ে ক্রেতা যে ব্যবহার মূল্য পায়, তা আত্মপ্রকাশ করে কেবল বাস্তব ব্যবহারে শ্রমশক্তির পরিভোগ-কালে এই উদ্দেশ্যে যা কিছু প্রয়োজন সেই সবই, যেমন কাচামাল, মালিক বাজার থেকে ক্রয় করে, এবং সেসব কিছুর জন্য পূর্ণ মূল্য দিয়ে থাকে। শ্রমশক্তির পরিভোগ একই সময়ে পণ্যদ্রব্য এবং উদ্ব-মূল্যের উৎপাদন। যেমন অন্য প্রত্যেকটি পণ্যের ক্ষেত্রে তেমন শ্রমশক্তির ক্ষেত্রেও পরিভোগ সম্পূর্ণায়িত হয় বাজারে সীমানার বাইরে তথা সঞ্চলনের পরিধির বাইরে। অত:পর ঐ টাকাভর থলিওয়ালা এবং শ্রমশক্তির অধিকারীকে সঙ্গে নিয়ে আমরা কিছু কালের জন্য গোলমেলে পরিধির বাইরে চলে যাই, যে পরিধিতে সব কিছুই ঘটে প্রকাশ্যে সকল লোকের চোখের সামনে। এদের দুজনেরই সঙ্গে আমরা চলে যাই উৎপাদনের প্রচ্ছন্ন আবাসে, যার চৌকাঠের উপরে কড়া সুরে নির্দেশ রয়েছে, ‘বিনা কাজে প্রবেশ নিষেধ। সেখানে আমরা দেখতে পাব কিভাবে মূলধন উৎপাদন করে এবং কেবল তা-ই নয়, আরো দেখতে পাব কিভাবে মূলধন উৎপাদিত হয়। সর্বশেষে আমরা সকলে জেনে নেব মুনাফা সংগ্রহের গোপন রহস্যটি।
