আমরা এখন আরো ঘনিষ্টভাবে শ্রমশক্তি, নামধেয় এই পণ্যটিকে পরীক্ষা করে দেখব। বাকি সকল পণ্যের মতো শ্রমশক্তিরও আছে মূল্য।[৫] এই মূল্য কিভাবে নির্ধারিত হয়।
অন্যান্য প্রত্যেকটি পণ্যের মূল্যের মতো শ্রমশক্তির মূল্য নির্ধারিত হয় এই বিশেষ সামগ্রীটির উৎপাদনের জন্য এবং স্বভাবতই পুনঃউৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় শ্রম-সময়ের দ্বারা। শ্রমশক্তির যখন মূল্য আছে, তখন সমাজের গড় শ্রমের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ যা সেই পরিমাণের মধ্যে অন্তভূক্ত আছে, তার বেশি হতে পারে না। শ্রমশক্তির অস্তিত্ব কেবল জীবিত ব্যক্তির ক্ষমতা বা শক্তি হিসেবেই শ্রমশক্তির উৎপাদনের আবশ্যিক পূর্বশর্ত হচ্ছে জীবিত শ্রমিকের অস্তিত্ব। ব্যক্তিটি যদি থাকে, তা হলে শ্রমশক্তির উৎপাদন মানে দাঁড়ায় তার নিজস্ব অস্তিতের পুনরুৎপাদন বা তার নিজের ভরণপোষণ। তার ভরণপোষণের জন্য তার চাই জীবনধারণের উপকরণসম্ভারের একটি নির্দিষ্ট পরিমান। সুতরাং শ্রমশক্তির পুনরুৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় শ্রম-সময় পর্যবসিত হয় ঐ পরিমাণ জীবনধারণের উপকরণাদি উৎপাদনে যে শ্রম-সময়ের প্রয়োজন হয়, তা-ই। অন্যভাবে বলা যায় যে শ্রমশক্তির মূল্য হচ্ছে শ্রমিকের ভরণশোষণের জন্য প্রয়োজনীয় জীবনধারণের উপায়-উপকরণের মূল্য। শ্রমশক্তি অবশ্য বাস্তব হয়ে ওঠে কেবল তার সক্রিয়তার দ্বারা, কেবল কাজের মাধ্যমেই তা নিজেকে গতিশীল করে। তোলে। কিন্তু তার ফলে মানুষের পেশী, স্নায়ু, মস্তিষ্ক ইত্যাদির একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, সুতরাং এই ক্ষয়ের পরিপূরণ করতে হবে। এই বর্ধিত ব্যয়ের জন্য চাই বর্ধিত আয়।[৬] শ্রমশক্তির মালিক যদি আজকে কাজ করে, তা হলে স্বাস্থ্য ও বলের একই অবস্থায় থেকে কালকে আবার তাকে সেই একই প্রক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি করতে হবে। সুতরাং তার জীবনধারণের উপায়-উপকরণকে এমন যথেষ্ট হতে হবে যাতে করে শ্রমকারী ব্যক্তি হিসাবে সে তার স্বাভাবিক স্বাস্থ্যে ও বলে অটুট থাকে। খাদ্য, বস্ত্ৰ ইন্ধন ও বাসস্থানের মতো স্বাভাবিক অভাবগুলি তার দেশের আবহাওয়া ও অন্যান্য প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য অনুসারে বিভিন্ন হয়। পক্ষান্তরে, তথাকথিত আবশ্যিক অভাবসমূহের এবং সেই সঙ্গে সেগুলি পরিতৃপ্ত করার ধরণধারণগুলির সংখ্যা ও মাত্রা নিজেরাই হচ্ছে ঐতিহাসিক বিকাশধারার ফলশ্রুতি এবং সেই কারণেই দেশের সভ্যতার মাত্রার উপরে অনেকটা নির্ভরশীল, বিশেষ করে নিভরশীল সেই অবস্থাবলীর উপরে যার মধ্যে স্বাধীন শ্রমিকদের শ্রেণীটি গড়ে উঠেছে এবং সেই কারণেই যেসকল অভ্যাস ও আরামে অভ্যস্ত হয়েছে।[৭] সুতরাং অন্যান্য পণ্যসাগ্রীর শ্রেণী থেকে শ্রমশক্তি নামধেয় পণ্যটির যেটা পার্থক্য, তা এই যে শ্রমশক্তির মূল্য নির্ধারণের মধ্যে প্রবেশলাভ করে একটি ঐতিহাসিক ও নৈতিক উপাদান। যাই হোক, একটি নির্দিষ্ট দেশে, একটি নির্দিষ্ট সময়ে শ্রমিকের জন্য প্রয়োজনীয় জীবনধারণের উপায় উপকরণের গড় পরিমাণ কার্যত সুপরিজ্ঞাত।
শ্রমশক্তির মালিক মরণশীল। সুতরাং বাজারে তার আবিভাবকে যদি অবিচ্ছিন্ন খেতে হয়—এবং অর্থের মূলধনে অবিচ্ছিন্ন রূপান্তরণের পূর্বশর্তও তাই—তা হলে শ্রমশক্তির বিক্রেতাকে অবশ্যই নিজেকে করতে হবে চিরন্তন, “যেভাবে প্রত্যেকটি জীবন্ত ব্যক্তি নিজেকে চিরন্তন, করে, তেমনিভাব অর্থাৎ বংশ বৃদ্ধির মাধ্যমে।[৮] ক্ষয়ে যাওয়া, জীর্ণ হয়ে যাওয়া, মরে যাওয়া ইত্যাদির ফলে যে শ্রমশক্তি বাজার থেকে অপসারিত হয়, তার শূন্য স্থান পূর্ণ করার জন্য অন্তত পক্ষে সেই পরিমাণ শ্রমশক্তি ক্রমাগত বাজারে হাজির করতে হবে। সুতরাং যারা শ্রমিকের স্থান গ্রহণ করবে তাদের অর্থাৎ তার সন্তানদের ভরণপোষণের উপায় উপকরণও শ্রমশক্তির উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জীবনধারণের উপায় উপকরণের অন্তর্ভুক্ত হয়; যাতে করে পণ্য-মালিকদের এই বিশিষ্ট বংশটি বাজারে তার আবির্ভাবকে অবিচ্ছিন্ন রাখতে সক্ষম হয়।
যাতে করে সে শিল্পের একটি বিশেষ শাখায় দক্ষতা ও নৈপুণ্য অর্জন করতে পারে এবং বিশেষ ধরনের শ্রমশক্তি হয়ে উঠতে পারে তার জন্য মানুষের দেহযন্ত্রটিকে অভিযোজিত করে নিতে হয় আর তার জন্য আবশ্যক হয় বিশেষ ধরনের শিক্ষার বা প্রশিক্ষনের; তাতে অম্লাধিক পরিমাণ পণ্যাদির অঙ্কে তার সমমূল্য-পরিমাণ ব্যয়ের প্রয়োজন হয়। এই শিক্ষাজনিত ব্যয় (মামুলি শ্রমশক্তির ক্ষেত্রে যা অতি সামান্য ) শ্রমশক্তি-উৎপাদনের মোট ব্যয়ে পুরোপুরি অন্তভুক্ত হয়।
শ্রমশক্তির মূল্য পর্যবসিত হয় জীবনসাধণের উপায়-উপকরণের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে। সুতরাং এই উপায়-উপকরণের মূল্য পরিবর্তন কিংবা সেগুলির উৎপাদনে ব্যয়তিব্য শ্রমের পরিমাণ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শ্রমশক্তির মূল্যও পরিবর্তীত হয়।
খাদ্য ও ইন্ধনের মতো কতকগুলি জীবনধারণের উপকরণ প্রত্যহই পরিভুক্ত হয়। সুতরাং প্রত্যহই এগুলির সরবরাহের সংস্থান নিশ্চিত করতে হবে। কাপড়-চোপড়, আসবাবপত্র ইত্যাদির মতো উপকরণগুলি অবশ্য দীর্ঘতর কাল টেকে; সুতরাং নির্দিষ্ট সময়কাল অন্তর অন্তর সেগুলির বদলি-সংস্থানের ব্যবস্থা করলেই চলে। কোন জিনিস কিনতে হয় তথা দামের বদলে নিতে হয় রোজই, কোন জিনিস সপ্তাহে সপ্তাহে, কোনটা তিন মাসে একবার ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু যেভাবেই এই ব্যয়গুলি সারা বছর জুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া হোক না কেন, সেগুলির একটি দিনের সঙ্গে আরেকটি দিনকে হিসেবে ধরে গড় আয়ের দ্বারা পরিশোধ্য হওয়া চাই। শ্রমশক্তি উৎপাদনের জন্য প্রত্যহ প্রয়োজনীয় পণ্যসম্ভারের মোট যদি হয় ক, সপ্তাহে প্রয়োজনীয় পণ্যসম্ভারের মোট যদি হয় খ, এবং ত্রৈমাসিক প্রয়োজনীয় পণ্যসম্ভারের মোট যদি হয় গ ইত্যাদি ইত্যাদি, তা হলে এই পণ্যদ্রব্যাদির ভয়=৩৬৫ক+৫১খ+ ৪গ ইত্যাদি।। ধরা যাক, গড় দিবসের ৩৬৫। জন্য প্রয়োজনীয় এই পণ্যসম্ভারে বিধৃত আছে ৬ ঘণ্টা সমাজিক শ্রম; তা হলে শ্রমশক্তিতে প্রতিদিন অন্তর্ভুক্ত হয় অর্ধদিনের গড় সামাজিক শ্রম; অন্য ভাবে বলা যায় যে শ্রমশক্তির প্রাত্যহিক উৎপাদনের জন্য চাই অর্ধদিনের শ্রম। এই পরিমাণ শ্রমই হচ্ছে এক দিনের শ্রমশক্তির মূল্য বা প্রত্যহ পুনরুৎপাদিত শ্রমশক্তির মূল্য। যদি অর্ধদিনের গড় সমাজিক শ্রম বিধৃত হয় তিনটি শিলিং-এ, তা হলে এক দিনের শ্রমশক্তির মূল্য অনুরূপ দাম-এ। সুতরাং যদি এই শ্রমশক্তির মালিক রোজ তিন শিলিং হারে তার শ্রমশক্তিকে বিক্রয় করার জন্য হাজির করে তা হলে তার বিক্রয় মূল্য হয় তার দামের সমান; এবং আমরা যা ধরে নিয়েছি তদনুসারে, আমদের বন্ধু ‘শ্ৰীটাকাভার থলিয়ালা’, যে তার তিন শিলিংকে মূলধনের রূপান্তরিত করতে উন্মুখ, সে এই মূল্য প্রদান করে।
