টাকাওয়ালা ব্যক্তিটি যাতে বাজারে শ্রমশক্তির সাক্ষাৎ পায় তার জন্য দ্বিতীয় অপরিহার্য শর্তটি হচ্ছে এই : যে পণ্যসামগ্রীতে তার শ্রম বিধৃত সেই পণ্যসামগ্রী সে নিজেই বিক্রয় করবে, এমন অবস্থানে না থেকে শ্রমিককে থাকতে হবে এমন এক অবস্থানে যে সে তার শ্রমশক্তিকেই পণ্য হিসেবে বিক্রয় করে দিতে বাধ্য হয়—যে শ্রম শক্তির অস্তিত্ব তার জীবন্ত সত্তায়।।
যাতে করে কোন লোক শ্রমশক্তি ছাড়া অন্যান্য পণ্য বিক্রয় করতে পারে তার জন্য তার অবশ্যই থাকা চাই কাচামাল, যন্ত্রপাতি ইত্যাদি উৎপাদনের উপায় ও উপকরণ। চামড়া ছাড়া জুতো তৈরী করা যায় না। তা ছাড়া, তার থাকা চাই প্রাণধারণের উপায়-উপকরণ। কোনো লোকই—এমনকি ‘ভাবত্যের গীতিকারও বেঁচে থাকতে পারে না ভবিষ্যতের উৎপন্ন দ্রব্যাদি পরিভোগ করে অর্থাৎ অম্পূর্ণায়িত অবস্থার ব্যবহার-মূল্যাদি পরিভোগ করে; এবং বিশ্বের রঙ্গমঞ্চে তার সেই প্রথম আবির্ভাব থেকে মানুষ সব সমযেই হয়ে এসেছে এবং সব সময়েই থাকবে পরভোগকারী-উৎপাদনে ব্রতী হবার আগেও এবং উৎপাদন যখন চলতে থাকে তখনও। এমন এক সমাজে যেখানে সমস্ত উৎপন্ন দ্রব্যই ধারণ করে পণ্যরূপ, সেখানে উৎপাদিত হবার পরে পণ্যগুলিকে বিক্রয় করতেই হবে। বিয়ের পরেই কেবল তারা। পারে তাদের উৎপাদনকারীর প্রয়োজন মিটাতে। তাদের উৎপাদনের জন্য যে সময়ের প্রয়োজন হয় তার সঙ্গে উপরি-যুক্ত হয় তাদের বিক্রয়ের জন্য প্রয়োজনীয় সময়।
অতএব, তার অর্থকে মূলধনে রূপান্তরিত করার জন্য অর্থের মালিককে সাক্ষাৎ করতে হবে বাজারস্থিত মুক্ত শ্রমিকের সঙ্গে, মুক্ত দুটি অর্থে -মুক্ত এই হিসেবে যে সে তার শ্রমশক্তিকে বিক্রয় করতে পারে তার পণ্য হিসেবে, এবং পক্ষান্তরে মুক্ত এই হিসেবে যে বিক্রয় করার মতো আর কোনো পণ্যই তার নেই; সংক্ষেপে, তার শ্রমশক্তিকে বাস্তবায়িত করার জন্য যা কিছু আবশ্যক সেই সব কিছুর মালিকানা থেকেই সে মুক্ত।
এই স্বাধীন শ্রমিকটি কেন বাজারে তার মুখোমুখি হয়—সে প্রশ্নে অর্থ-মালিকের কোনো আগ্রহ নেই; তার কাছে শ্রমের বাজার সাধারণ পণ্য বাজারেরই অংশবিশেষ। আর এই মুহূর্তে এই প্রশ্নটিতে আমাদের কোনো আগ্রহ নেই। আমরা ঘটনাটির সঙ্গে লেগে থাকি তত্ত্বগতভাবে, যেমন সে লেগে থাকে কার্যগত ভাবে। যাই হোক, একটা জিনিস পরিষ্কার-প্রকৃতি এক পাশে অর্থ কিংবা পণ্য সামগ্রী এবং আরেক পাশে, নিজেদের শ্রমশক্তি ছাড়া যাদের আর কিছুই নেই, এমন মানুষদের উৎপাদন করে না। এই সম্পর্কটির কোনো প্রাকৃতিক ভিত্তি নেই। এমনকি সমস্ত ঐতিহাসিক যুগেই অভিন্ন এমন কোনো সামাজিক ভিত্তিও তার নেই। স্পষ্টতই এটা হচ্ছে অতীতকালের ঐতিহাসিক বিকাশের ফলশ্রুতি, অনেক অর্থনৈতিক বিপ্লবের তথা সামাজিক উৎপাদনের প্রাচীনতর রূপান্তরের একটি সমগ্ৰ ধারাক্রমের অবলুপ্তির পরিণতি।।
যে সমস্ত অর্থনৈতিক বর্গগুলি সম্বন্ধে আমরা ইতিপূর্বে আলোচনা করেছি। সেগুলিও বহন করে ইতিহাসের ছাপ। একটি উৎপন্ন দ্রব্য যাতে পণ্য হয়ে উঠতে পারে, সেজন্য চাই বিশেষ বিশেষ ঐতিহাসিক অবস্থার উপস্থিতি। উৎপাদনকারীর প্রত্যক্ষ ভোগের জন্য কোন দ্রব্য উৎপাদিত হবে; তা পণ্য হবে না। আমরা যদি আরো কিছুটা এগিয়ে যেতাম এবং জানতে চাইতাম কোন কোন অবস্থায় যাবতীয় উৎপন্ন দ্রব্য কিংবা এমনকি তাদের মধ্যে বেশির ভাগ দ্রব্য পণ্যের রূপ ধারণ করে, তা হলে আমরা দেখতে পারি যে কেবল একটা নির্দিষ্ট ধরনের উৎপাদনের অবস্থাতেই অথচ পুজিবাদী উৎপাদনের অবস্থাতেই তা ঘটতে পারে।
পণ্যের বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে অবশ্য এমন অনুসন্ধিৎসা হত এক অনভ্যন্ত ব্যাপার। যদিও তাদের উৎপাদনকারীদের প্রত্যক্ষ প্রয়োজন পরিপূরণের জন্যই সুবিপুল সামগ্ৰীসম্ভার উৎপাদিত ও উদ্দিষ্ট হয় বলে সেগুলি পণ্যে পরিবর্তিত হয় না এবং সেই কারণে সামাজিক উৎপাদন তখনো পর্যন্ত কালগত দৈর্ঘ ও বিস্তারগত ব্যপকতার বিচারে বিনিময়-মূল্যের দ্বারা খুব বেশী অধিপ্রভাবিত নয়, তবু কিন্তু পণ্য-দ্রব্যাদির উৎপাদন এবং সঞ্চলন স’ঘটিত হতে পারে। উৎপন্ন দ্রব্যসামগ্রীর পণ্যরূপে আবির্ভাবের পূর্বশত হল শ্রমের সামাজিক বিভাগের এমন মাত্রায় বিকাশলাভ, যাতে ব্যবহারমূল্য আর বিনিময়মূল্যের মধ্যে বিচ্ছেদ—দ্রব্য বিনিময় ব্যবস্থাতেই ঘটেছিল যার সূচনা, সেই বিচ্ছেদ—ইতিমধ্যেই সুসম্পূর্ণ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু বিকাশের এমন একটি মাত্রা এমন অনেক সামাজিক রূপের মধ্যেই অভিন্ন চেহারায় লক্ষ্য করা যায়, এগুলি অন্যান্য দিক থেকে সবচেয়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট সমৃদ্ধ। পক্ষান্তরে, আমরা যদি অর্থের বিষয় বিবেচনা করি, তা হলে দেখতে পাই যে পণ্যবিময়ের একটি সুনির্দিষ্ট পর্যায়েই তার অস্তিত্ব সম্ভব। পণ্যের সমার্থ সামগ্রী হিসেবেই হোক, কিংবা সঞ্চলনের উপায় হিসেবেই হোক, কিংবা মজুদ হিসেবেই হোক কিংবা বিশ্বজনিক অর্থ হিসেবেই হোক, অর্থ যে সমস্ত বিশেষ বিশেষ কাজ করে থাকে, সে সমস্ত কাজের এক একটি প্রাধান্য সামাজিক উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়কে সৃচিত করে। অথচ আমরা অভিজ্ঞতা থেকে জানি যে আপেক্ষিকভাবে আদিম এক পা-সঞ্চলন ব্যবস্থাই এই বহুবিধ রূপের উদ্ভব ঘটানোর পক্ষে যথেষ্ট। মূলধনের বেলায় ব্যাপারটি ভিন্নতর। মূলধনের অস্তিত্বের জন্য যে সব ঐতিহাসিক অবস্থার প্রয়োজন, সেগুলি কিন্তু কেবল অর্থ এবং পণ্য সামগ্রীর সঞ্চলনের সঙ্গে কোনক্রমেই সহগামী নয়। যখন উৎপাদন-উপায়ের এবং জীবনধারণের উপকরণের মালিক বাজারে নিজস্ব শ্রমশক্তির বিক্রয়কারী স্বাধীন শ্রমিকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে, কেবল তখনি তার প্রাণ সঞ্চার ঘটে। আর এই একটিমাত্র ঐতিহাসিক শর্ত একটা গোটা দুনিয়ার ইতিহাসকে জুড়ে আছে। অতএব, নিজের প্রথম আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গেই মূলধন ঘোষণা করে সামাজিক উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় নৃতন এক যুগের সূচনা।[৪]
