১৯. “বিনিময় উৎপন্ন দ্রব্যে আদৌ কোনো মূল্য সংযোজিত করে না”।
(F. Wayland : The Elements of Pol. Econ. Boston 1845, p. 169.)
২০. অপরিবর্তনী সমার্থসমূহের নিয়মের অধীনে বাণিজ্য হত অসম্ভব। (G. Wpdyke : “A Treatise on Polit. Bconomy,” New York, 1851, pp.66-69) “আসল মূল্য এবং বিনিময় মূল্যের পার্থক্য এই ঘটনাটির উপরে প্রতিষ্ঠিত যে কোন জিনিসের মূল্য বাণিজ্য মাধ্যমে প্রাপ্ত তথাকথিত সমাঘ থেকে আলাদা অর্থাৎ সমার্ঘ আদৌ কোনো সমাঘই নয়।” (F. Engels, l.c. p. 96.)
২১. Benjamin Franklin : Works, Vol. ii edit. Sparks in “Posi tions to be examined concerning National Wealth. p. 376.
২২. অ্যারিস্ততল, রিপব্লিক।
২৩. পূর্ববতী আলোচনা থেকে পাঠক বুঝতে পারবেন যে এই বিবৃতিটির অর্থ কেবল এই যে কোন পণ্যের দাম এবং মূল্য একই হলেও ধুলধনের গঠন সম্ভব, কেননা দাম বা মূল্য থেকে কোনো বিচ্যুতিকে মূলধন গঠনের কারণ হিসাবে নির্দেশ করা যায় না। দাম যদি সত্য সত্যই মূল্য থেকে আলাদা হয়, তা হলে সবার আগে আমাদের দামকে পর্যবসিত করতে হবে মূল্যে, অর্থাৎ পার্থক্যটিকে গণ্য করতে হবে আপতিক হিসাবে যাতে করে ব্যাপারগুলিকে দেখা যায় তাদের স্বরূপে এবং আমাদের অনুসন্ধান যেন ব্যাহত না হয় এমন সমস্ত বিকর ঘটনার দ্বারা যাদের কোনো সম্পর্ক নেই আলোচ্য প্রক্রিয়াটির সঙ্গে। তা ছাড়া, আমরা জানি যে এই ভাবে পর্যবসিত করণ কেবল বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়াই নয়, দামের ঘন-ঘন পরিবর্তন, তাদের বৃদ্ধি ও হ্রাস পরস্পরের ক্ষতিপূরণ করে এবং তাদেরকে একটি গড়পড়তা দামে পর্যবসিত করে, যে দামটি হচ্ছে তাদের প্রচ্ছন্ন নিয়ামক। যে সব উদ্যোগ সময়সাপেক্ষ, সে সবের ক্ষেত্রে বণিক ও শিল্প-মালিকেরা এই দামটিকেই পথ-প্রদর্শক নক্ষত্র হিসাবে গণ্য করে। সে জানে, যখন কোন পণ্যের দীর্ঘ সময়ের দরকার হয়, তখন তা তার গড়পড়তা দামেই বিক্রি হয়, বেশিতেও নয়, কমেও নয়। সুতরাং সে যদি সমস্যাটিতে একটুও মাথা ঘামাত, তা হলে সে মূলধনের গঠনকে এই ভাবে সুত্রায়িত করত: গড়পড়তা দামের দ্বারা শেষ পর্যন্ত পণ্যের মূল্যের দ্বারা দাম নির্ধারিত হয়-এটা ধরে নিলে মূলধনের উৎপত্তিকে আমরা কিভাবে ব্যাখ্যা করতে পারি? আমি বলছি “শেষ পর্যন্ত” কেননা গড়পড়তা দাম প্রত্যক্ষ ভাবে পণ্যের মূল্যের সঙ্গে সম-সংঘটিত হয় না যদিও অ্যাডাম স্মিথ প্রমুখ অর্থনীতিবিদের তাই বিশ্বাস করতেন।
০৬. শ্রমশক্তির ক্রয়-বিক্রয়
ষষ্ঠ অধ্যায় — শ্রমশক্তির ক্রয়–বিক্রয়
মূলধনে রূপান্তরণের জন্য উদ্দিষ্ট অর্থরে ক্ষেত্রে মূল্যের যে পরিবর্তন ঘটে, সেই পরিবর্তন অর্থের নিজের মধ্যে ঘটতে পারে না, কেননা, ক্রয় ও প্রদানের উপায় হিসেবে তার যে ভূমিকা, তা তার সাহায্যে ক্রীত পণ্যটির দামকে বাস্তবায়িত করার বেশি কিছু করে না; এবং নগদ টাকা হিসেবে তা হচ্ছে শিলীভূত মূল্য, যা কখনো পরিবর্তন শীল নয়।[১] সঞ্চলনের দ্বিতীয় ক্রিয়াটিতেও, উক্ত পণ্যটির পুনঃবিক্রয়ের ক্রিয়াটিতেও, তা কিছুর উদ্ভব ঘটাতে পারে না, কেননা এক্ষেত্রেও তা পণ্যটির দেহগত রূপটিকে পুনরায় তার অর্থরূপে রূপায়িত করা ছাড়া আর কিছু করে না। সুতরাং পরিবর্তন যা ঘটে, তা অবশ্যই ঘটে পণ্যটির মধ্যে এবং তা ঘটে প্রথম ক্রিয়াটিতে, অ-প পর্যায়টিতে; কিন্তু তার মূল্যে কোনো পরিবর্তন ঘটে না, কেননা বিনিময় ঘটে সমান সমানের মধ্যে এবং পণ্যটির পূর্ণ মূল্যই তার জন্য যা দেয় তা দেওয়া হয়। অতএব, আমরা এই সিদ্ধান্ত করতে বাধ্য হই যে পরিবর্তনের সূচনা হয় পণ্যটির ব্যবহার মূল্যের মধ্যে অর্থাৎ তার পরিভোগর মধ্যে। কোন পণ্যের পরিভোগ থেকে মূল্য নিষ্কর্ষিত করতে হলে, আমাদের বন্ধু শীটাকাভর থলিওয়ালা’কে এমন ভাগ্য করতে হবে যে, সঞ্চলনের পরিধির মধ্যেই তথা, বাজারেই, তাকে খুঁজে পেতে হবে একটি পণ্য, যার ব্যবহার-মূল্যের রয়েছে এই স্ববিশিষ্ট ক্ষমতা যে তা হবে মূল্যের একটি উৎসম্বরূপ, যে পণ্যটির পরিভোগ-ক্রিয়াটি নিজেই হচ্ছে শ্রমের একটি ঘূর্তরূপ এবং, সেই কারণেই মূল্যের সৃষ্টি। অর্থের অধিকারী ব্যক্তিটি অবশ্য বাজারে শ্রমক্ষমতা বা শ্রম শক্তির মধ্যে এমন একটি বিশিষ্ট পণ্যের সাক্ষাৎ পায়।
শ্রমশক্তি বা এমক্ষমতা বলতে বুঝতে হবে কোন মানুষের মধ্যে যে সব মানসিক ও শারীরিক ক্ষমতা থাকে, যে ক্ষমতাসমূহকে সে যে-কোন ধরনের ব্যবহার-মূল্য উৎপাদন করতে গেলেই প্রয়োগ করে—সেই সব ক্ষমতার মোট সমষ্টিকে।
কিন্তু যাতে করে আমাদের টাকাওয়ালা ব্যক্তিটি পণ্য হিসাবে বিক্রয়ের জন্য উপস্থাপিত শ্রমের সাক্ষাৎ পায়, সেজন্য চাই নানাবিধ শর্তের পরিপূরণ। পণ্য বিনিময়ের নিজের প্রকৃতি থেকে যে-সব পরাপেক্ষিতার সম্পর্কের উদ্ভব ঘটে, সেই সম্পর্কসমূহ ব্যতীত অন্য কোনো সম্পর্কই স্বয়ং পণ্য-বিনিময় আভাসিত করে না।
যদি এটা ধরে নেওয়া হয় তা হলে বাজারের শ্রমশক্তি পণ্য হিসেবে কেবল তখনি এবং ততটা পরিমাণেই আবিভূত হতে পারে, যখন এবং যতটা পরিমাণে তার অধিকারী অর্থাৎ সেই ব্যক্তিটি যে সেই শ্রমশক্তির ধারক তার সেই শক্তিকে বিক্রয়ের জন্য তথা পণ্য হিসেবে উপস্থাপিত করে। যাতে করে সে তা করতে পারে সেইজন্য তাকে হতে হবে তার নিজের শ্রমক্ষমতার তথা নিজের ব্যক্তিসত্তার নিঃশত মালিক।[২] সে এবং টাকাওয়ালা ব্যক্তিটি পরস্পরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বাজারে এবং পরস্পরের সঙ্গে সমান অধিকারের ভিত্তিতে; পার্থক্য থাকে কেবল এই যে একজন হচ্ছে ক্রেতা এবং অন্যজন বিক্রেতা; আইনের চোখে দুজনেই সমান। এই যে সম্পর্ক, তার ধারাবাহিক . দাবি করে যে শ্রমশক্তির মালিক তার শ্রমশক্তি বিক্রয় করবে কেবল একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্যই, কারণ সে যদি তা বিক্রয় করে দেয় সব কিছু সমেত সর্বকালের জন্য, তা হলে সে তো নিজেকেই বিক্রয় করে দেবে এবং স্বাধীন মানুষ থেকে পর্যবসিত হবে ক্রীতদাসে, পণ্যের মালিক থেকে নিছক একটা পণ্যে। তাকে নিরন্তর তার শ্রমশক্তিকে গণ্য করতে হবে তার সম্পত্তি হিসেবে, পণ্য হিসেবে এবং তা সে কেবল তখনি পারবে যখনি সে তার শ্রমশক্তিকে ক্রেতার অধীনে রাখে। কেবল সাময়িক ভাবেই, একটা নির্দিষ্ট সময়কালের শর্তেই। কেবল এই ভাবেই সে পারে তার শ্রমশক্তির উপরে তার যে অধিকার, সেই অধিকার। পরিত্যাগের ঘটনাকে পরিহার করতে।[৩]
