দামের নামীয় বৃদ্ধিপ্রাপ্তিতে কিংবা মূল্যের বেশিতে বিক্রয় করার যে বিশেষ অধিকার বিক্রেতার রয়েছে সেই অধিকারভোগের বলে উদ্বৃত্ত মূল্যের উৎপত্তি-এই প্রতারণাটির যারা ধ্বজাধারী, তারা যদি সুসঙ্গতভাবে তাঁদে বক্তব্য রাখতে চান, না হলে ধরে নিতে হবে যে এমন একটি শ্রেণী আছে, যে শ্রেণী কেবল পরিভোগই করে, কিন্তু কিছু উপাদন করে না। এই পর্যন্ত আমরা যে অবস্থানে-যে সরল সঞ্চলনের অবস্থানে—এসে পৌছেছি, তাতে এই ধরনের একটি শ্রেণীর অস্তিত্ব আমাদের ব্যাখ্যার অতীত। কিন্তু এমন একটি শ্রেণীর অস্তিত্ব আগে থেকেই ধরে নেওয়া যাক। এই ধরনের একটি শ্রেণী যে অর্থের সাহায্যে নিরন্তর কারবারের ক্রয়গুলি চালিয়ে যাচ্ছে, সেই অর্থ পণ্য-মালিকদের পকেট থেকে বিনিময় ব্যাতিরেকে, প্রতিদান ছাড়াই, পরাক্রম বা অধিকারের জোরে—নিশ্চয়ই নিরন্তর তার পকেটে অনবরত বয়ে আসছে। এমন একটি শ্রেণীর কাছে মূল্যের বেশিতে পণ্যদ্রব্যাদি বিক্রয় করার মানে হচ্ছে এই যে, সেই শ্রেণীটিকে আগেভাগেই যে অর্থ দিয়ে দেওয়া হয়েছে তারই একটা অংশ ফেরৎ হাতিয়ে নেওয়া।[১৬] এশিয়া মাইনর-এর শহরগুলি এইভাবে প্রাচীন রোম সাম্রাজ্যের কাছে একটি বার্ষিক কর দিত। এই অর্থের সাহায্যে রোম তাদের কাছ থেকে পণ্যদ্রব্যাদি ক্রয় করত এবং ক্রয় করতে মূল্যের তুলনায় ঢের বেশিতে। সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত রাজ্যগুলির অধিবাসীরা এইভাবে রোমানদের প্রতারণা করতে এবং এইভাবে তাদের বিজেতাদের কাছ থেকে ব্যবসা বাণিজ্যের মাধ্যমে তাদেরই দেওয়া করের একটা অংশ ফেরৎ নিয়ে আসত। কিন্তু সব সত্ত্বেও আসলে বিজিতরাই হত প্রতারিত। তাদের দ্রব্যসামগ্রীর দাম দেওয়া হত তাদেরই কাছ থেকে নেওয়া অর্থে ই। এ পথে ধনবানও হওয়া যায় না, উত্ত মূল্যও সৃষ্টি করা যায় না।
. অতএব আমরা আমাদের নিজেদেরকে বিনিময়ের সীমানার মধ্যেই নিবদ্ধ রাখব যেখানে বিক্রেতারা আবার ক্রেতাও এবং ক্রেতারা বিক্রেতাও। সম্ভবতঃ অভিনেতাদের ব্যক্তি হিসেবে না দেখে আমরা তাদের বিগ্রহ হিসেবে দেখেছি বলেই আমাদের এই সমস্যা দেখা দিয়েছে।
খ কিংবা গ-কে প্রতিশোধ নেবার সুযোগ না দিয়েই হয়তো ক তাদের কাছে থেকে কিছু সুবিধা আদায় করে নিতে পারে। ক বিক্রয় করল খ এর কাছে ৪৪ ৩ পাউণ্ডের মদ এবং বিনিময় তার কাছ থেকে পেল ৪৫০ পাউণ্ডের শস্য। ক তার £4 . পাউণ্ডকে রূপান্তরিত করে নিলে £৫০ পাউণ্ডে, কম অর্থ থেকে করে নিল বেশী অর্থ এবং তার পণ্যসম্ভারকে রূপান্তরিত করে ফেলল মূলধনে। আরো একটু গভীর ভাবে ব্যাপারটা পরীক্ষা করে দেখা যাক। বিনিময়টি ঘটবার আগে ক-এর হাতে ছিল ৪৪০ পাউণ্ড মূল্যের মদ এবং খ-এর হাতে ছিল £৫০ পাউণ্ড মূল্যের শস্য—দুজনের মিলিয়ে মোট ৪৯০ পাউণ্ড। সঞ্চলনের মূল্য বিন্দুমাত্র বৃদ্ধি পায়নি তা কেবল বন্টিত হয়েছে ভিন্নতর ভাবে ক এবং খ-এর মধ্যে। খ-এর কাছে যতটা মূল্য হ্রাস ক-এর কাছে ততটা মূল্য উদ্ধও; একজনের কাছে থেকে যা হল “বিয়োগ’, অন্যজনের কাছে তা-ই হল “যোগ”। এই একই পরিবর্তন সংঘটিত হত যদি, বিনিময়ের অনুষ্ঠানের মধ্যে না গিয়ে ক সরাসরি খ-এর কাছ থেকে ১০ পউণ্ড চুরি করে নিত। জনৈক ইহুদী যদি রানী অ্যানের ফার্দি এক গিনিতে বিক্রয় করে দেয়, তাহলে যেমন সেই দেশের মোট মহার্ঘ ধাতু সম্ভারের বৃদ্ধি ঘটে না, ঠিক তেমনি মূল্যসমূহের পুনর্বণ্টনের ফলেও কোন দেশের সঞ্চলনশীল মোট মূল্য সম্ভারের বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় না। সমগ্রভাবে কোনো দেশের পুজিবাদী শ্রেণীই নিজেকে ছাড়িয়ে যেতে পারে না।[১৭]
যতই বাঁকানো মোচড়ানো যাক না কেন, ঘটনা যেমন ছিল তেমনি থেকে যায়। সমান সমান মূল্যের বিনিময় থেকে কোনো উত্ত মূল্যের উদ্ভব ঘটে না।[১৮] সঞ্চলন, কিংবা পণ্য-বিনিমর কোনো মূল্যের জন্ম দেয় না।[১৯]
সুতরাং এখন কারণটা পরিষ্কার যে কেন মূলধনের প্রমাণ-রূপটি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে, যে রূপে তা আধুনিক সমাজের অর্থনৈতিক সংগঠটিকে নির্ধারিত করে সেই রূপটি
বিশ্লেষণ করতে গিয়ে, আমরা আমাদের বিবেচনা থেকে তার সবচেয়ে জনপরিচিত তথা তার মান্ধাতার আমলের রূপগুলিকে-বণিক-পুজি এবং মহাজন-পু জিকে—পুরোপুরি বাদ দিয়ে রেখেছিলাম।
অ-প-অ আবর্তটি, বেশিতে বিক্রয়ের জন্য ক্রয়ের ব্যাপারটি, সবচেয়ে স্পষ্ট ভাবে দেখা যায় বণিক-পু জির ক্ষেত্রে, কিন্তু গতিক্রমটি সংঘটিত হয় পুরোপুরি সঞ্চলন পরিধির অভ্যন্তবে। যাই হোক, যেহেতু কেবল সঞ্চলন দ্বারাই অর্থের মূলধনে রূপান্তরণকে, উদ্ব-মূল্যের গঠন-প্রক্রিয়াকে ব্যখ্যা করা যায় না, সেই হেতু প্রতীয়মান হবে যে, যত দিন পর্যন্ত সমার্ঘ সামগ্ৰীসমুহের বিনিময় হবে, ততদিন পর্যন্ত বণিক পুজির উদ্ভব অসম্ভব,[২০] প্রতীয়মান হবে বণিক নিজেকে পরগাছার মতে বিক্রয়কারী এবং ক্রয়কারী উৎপাদকে মাঝখানে ঢুকিয়ে দিয়ে তাদের দুজনেরই মাথায় হাত বুলিয়ে যে দ্বিবিধ লাভ হাতিয়ে নেয়, তা থেকেই তার উদ্ভব। এই অর্থেই ফ্রাঙ্কলিন বলেন “যুদ্ধ হচ্ছে লুণ্ঠনবৃত্তি, সাধারণ ভাবে বাণিজ্য হচ্ছে প্রতারণা।”[২১] উৎপাদকের নিছক প্রতারণা করে হাতিয়ে নেওয়া ছাড়া বণিকের অর্থের মূলধনে রূপান্তরণকে যদি অন্য কোনো ভাবে ব্যাখ্যা করতে হয়, তা হলে মধ্যবর্তী পর্যায়াদির এক সুদীর্ঘ ধারাক্রমের প্রয়োজন হবে, যা বর্তমানে যখন সরল পণ্য সঞ্চলনের বিষয়টিই আমাদের একমাত্র আলোচ্য বিষয়, তখন পুরোপুরি অনুপস্থিত।
