বণিক পুজির বেলায় আমরা যা বলেছি তা আরো বেশী করে খাটে মহাজনী পুজির বেলায়। বণিক পুজির বেলায় দুটি চরম বিন্দু, বাজার যে অর্থ ছুড়ে দেওয়া হয় এবং বদ্ধিত যে অর্থ বাজার থেকে তুলে নেওয়া হয়, এই দুটি অন্ততঃ ক্রয় ও বিক্রয়ের দ্বারা পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত, অন্যভাবে বলা যায় যে সঞ্চলনর গতিক্রম দ্বারা সংযুক্ত। মহাজনী পুজির বেলায় অপ—অ এই রূপটি পর্যবসিত হয় অঅ রূপে তথা মধ্যবর্তী পর্যায়টি ছাড়া দুটি চরম বিন্দুতে, অর্থ বিনিমিত হয় অধিকতর অর্থের জন্য। এটা এমনি একটা রূপ, অর্থের প্রকৃতির সঙ্গে যা সঙ্গতিবিহীন এবং সেই কারণেই থেকে যায় পণ্য-সঞ্চলনের প্রকৃতির দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যার বাইরে। এই জন্যই অ্যারিস্ততল বলেছেন, “যেহেতু ক্রেমাটিষ্টিক একটি দ্বৈত বিজ্ঞান যার এক অংশ বাণিজ্যের অঙ্গীভূত এবং অপরাংশ অর্থতত্ত্বের, আর যেহেতু বাণিজ্য হচ্ছে সঞ্চলনের উপরে ভিত্তিশীল এবং ন্যায্যতই অনুমোদিত, কেননা তা প্রকৃতির উপরে ভিত্তিশীল নয় এবং অর্থতত্ত্ব হচ্ছে প্রয়োজনীয় ও প্রশংসনীয় সেই হেতু কুসীদজীবীকে খুব সঠিক ভাবেই ঘৃণা করা হয়, কেননা স্বয়ং অর্থ ই হচ্ছে তার লাভের উৎস—যে উদ্দেশ্যে অর্থের উদ্ভাবন ঘটেছিল, সেই উদ্দেশ্যে সে তা ব্যবহার করে না। কেননা এর উদ্ভব হয়েছিল পণ্যের বিনিময়ের জন্য, কিন্তু সুদ অর্থ থেকেই অধিকতর অর্থের প্রসব ঘটায়। এই জন্য তার গ্রীক নামের অর্থ সুদ এবং সন্তান। কেননা সন্তান তাদেরই মতো, যারা তাকে জন্ম দিয়েছিল। কিন্তু সুদ হচ্ছে অর্থজাত অর্থ সুতরাং জীবন ধারণের সকল প্রকার বৃত্তির মধ্যে এটাই হচ্ছে সবচেয়ে প্রকৃতি-বিরুদ্ধ।[২২]
আমাদের অনুসন্ধান-ক্ৰমে আমরা দেখতে পাব যে বণিক-পুজি আর সুদ দায়িনী পুজি দুই-ই হচ্ছে পরোৎপন্ন রূপ এবং সেইসঙ্গে এটাও স্পষ্ট হয়ে যাবে কেন ইতিহাসে মূলধনের আধুনিক প্রমাণ-রূপের আগেই এই দুটি রূপের আবির্ভাব ঘটেছিল।
আমরা দেখিয়েছি যে সঞ্চলনের দ্বারা উদ্ব-মুল্যের সৃষ্টি হতে পারে না এবং সেই কারণেই তার গঠন-প্রক্রিয়ার পটভূমিকায় কিছু ঘটতেই হবে, যা প্রকাশ্য সঞ্চলনে প্রকাশমান নয়। কিন্তু সঞ্চলন ছাড়া অন্য কোথাও কি উদ্ধত্ত মূল্যের উৎপত্তির কোনো সম্ভাবনা আছে যে সঞ্চলন হচ্ছে পণ্য-মালিকদের পারস্পরিক সম্পর্কসমূহের মোট যোগফল, যতদূর পর্যন্ত সেই সম্পর্কসমূহ পণ্যদ্রব্যাদির দ্বারা নির্ধারিত ততদূর পর্যন্ত? সঞ্চলন ব্যতিরেকে, পণ্যমালিক কেবল তার পণ্যের সঙ্গেই সম্পর্কযুক্ত। মূল্যের ক্ষেত্রে, এই সম্পর্ক এখানেই সীমাবদ্ধ যে, পণ্যটি তার নিজের শ্রমের একটি পরিমাণ ধারণ করে আছে, যে পরিমাণটি একটি নির্দিষ্ট সমাজিক মনের সাহায্যে পরিমেয়। এই পরিমাণটি অভিব্যক্ত হয় উক্ত পণ্যের মূল্যের দ্বারা এবং যেহেতু মূল্যের হিসেব হয় হিসেব রাখার অর্থে, সেইহেতু এই পরিমাণটিও অভিব্যক্ত হয় দামের দ্বারা, যা আমরা ধরে নিচ্ছি £1 বলে। কিন্তু উক্ত পণ্যটির মূল্য এবং সেই মূল্যের অতিরিক্ত উত্ত মূল্য-এই উভয়েই তার শ্রমের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না; ১০-এর দাম, যা এখানে আবার ১১-এরও দাম, সেই দাম কিংবা এমন একটি মূল্য, যা আবার নিজের মূল্য, থেকেও বৃহত্তর সেই মূল্য তার শ্রমের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না। পণ্যের মালিক মূল্য সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু স্বয়ংসম্প্রসারণশীল মূল্য সৃষ্টি করতে পারে না। নতুন এম যুক্ত করে, তথা হাতে যে মূল্য আছে তার সঙ্গে নতুন মূল্য যুক্ত করে, সে তার পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করতে পারে, যেমন চামড়া থেকে জুতো তৈরি করে। সেই একই বস্তুর এখন হল অধিকতর মূল্য, কেননা এখন তা ধারণ করছে অধিকতর পরিমাণ শ্রম। সুতরাং চামড়া থেকে জুতো এখন অধিকতর মূল্যবান তবে চামড়ার মূল্য কিন্তু আগের মত সমানই রয়ে গিয়েছে; তা নিজেকে সম্প্রসারিত করে না, জুতো তৈরির প্রণালীতে উদ্ধৃত্ত মূল্য আত্মসাৎ করে না। অতএব, এটা অসম্ভব যে সঞ্চলন পবিধির, একজন পণ্য উৎপাদনকারী, অন্যান্য পণ্য মালিকদের সংস্পর্শে না এসে, মূল্য সম্প্রসারিত করতে পারে এবং কাজে কাজেই অর্থ বা পণ্যকে মূলধনে রূপান্তরিত করতে পারে;
সুতরাং সঞ্চলনের দ্বারা মূলধনের সৃষ্টি অসম্ভব, আবার সঞ্চলন থেকে বিচ্ছিন্নভাবে মূলধনের উৎপত্তিও সমান অসম্ভব। সঞ্চলনের মধ্যে এবং সঞ্চলনের বাইরে উভয়তই তার উদ্ভব হতে হবে।
অতএব আমরা পাচ্ছি একটি দ্বৈত ফলশ্রুতি।
অর্থের মূলধনে রূপান্তরণকে ব্যাখ্যা করতে হবে পণ্য-বিনিময়ে নিয়ামক নিয়মাবলীর সাহায্যে- ব্যাখা করতে হবে এমনভাবে যে সমার্থ-সামগ্ৰীসমূহের বিনিময়ই হবে যাত্রাবিন্দু।[২৩] আমাদের বন্ধু শ্ৰীটাকার থলিওয়ালা যে এখনো একজন ভ্রূণাবস্থায় পুজিবাদী, সেই টাকার থলিয়ালা’কে তার পণ্যদ্রব্যাদি ক্রয় করতে হবে তাদের মুল্যেই, বিক্রয় করতে হবে তাদের মূল্যেই, কিন্তু তবু তাকে সঞ্চলন থেকে তুলে নিতে হবে সূচনায় সে যতটা মূল্য সঞ্চলনে নিক্ষেপ করেছিল, তার তুলনায় অধিকতর মূল্য। পূর্ণ-পরিণত পুঁজিবাদী হিসেবে তার বিকাশ অবশ্যই ঘটবে সঞ্চলনের অভ্যন্তরে এবং বাইরে উভয়তঃই। এই হচ্ছে সমস্যাটির পরিস্থিতি। Hic Rhodus, hic salta।
