যদি সমান বিনিময়-মূল্যের বিভিন্ন পণ্যদ্রব্য কিংবা পণ্যদ্রব্য ও অর্থ, এবং কাজে কাজেই সমার্থ সামগ্ৰীসমূহ বিনিমিত হয়, তা হলে এটা তো পরিষ্কার যে সঞ্চলনে যে-পরিমাণ মূল্য কেউ নিক্ষেপ করে থাকে, তা থেকে বেশী মূল্য সে তুলে নিতে পারে না। কোনো উদ্বৃত্ত মূল্যেরই সৃষ্টি এখানে হয় না এবং তার স্বাভাবিক রূপে পণ্য-সঞ্চলন যা দাবি করে, তা হচ্ছে সমার্ঘ সামগ্রীর বিনিময়। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটির স্বাভাবিক রূপ বজায় থাকে। সুতরাং অ-সমার্ঘ সামগ্রী-সমূহের বিনিময়ের প্রশ্নটি বিচার করা যাক।
যাই হোক না কেন পণ্যের বাজারে কেবল পণ্যের মালিকদেরই ঘন ঘন যাতায়াত থাকে এবং এই সব ব্যক্তিরা পরস্পরের উপর যে ক্ষমতা বিস্তার করে তা তাদের পণ্যাদির ক্ষমতা ছাড়া অন্য কিছুই নয়,। এই সব পণ্যসামগ্রীর বস্তুগত বিভিন্নতাই নানাবিধ বিনিময় ক্রিয়ার বৈষয়িক প্রেরণা হিসেবে কাজ করে এবং ক্রেতা ও বিক্রেতাদের পরস্পরের উপরে নির্ভরশীল করে, কেননা তাদের মধ্যে কেউই তার নিজের অভাব মেটাবার মতো সামগ্রীটির মালিক নয় এবং প্রত্যেকেরই মালিকানায় আছে অন্য কারো অভাব মেটানোর মতো সমাগ্রী। তাদের নিজ নিজ ব্যবহার-মূল্যের মধ্যে এই বস্তুগত বিভিন্নতা সত্ত্বেও, পণ্যে কেবল আর একটি মাত্র পার্থক্য আছে। সে পার্থক্যটি হল তাদের অবয়বগত রূপ এবং বিক্রয়ের মাধ্যমে তারা যে রূপটিতে রূপান্তরিত হবে সেই রূপ-পণ্য এবং অর্থের মধ্যেকার পার্থক্য। এবং কাজে কাজেই পণ্যের মালিকদের পার্থক্য করা যায় কেবল বিক্রেতা হিসেবে এবং ক্রেতা হিসেবে যথাক্রমে যারা পণ্যের মালিক এবং যারা অর্থের মালিক, সেই হিসেবে।
ধরা যাক, ব্যাখ্যার অতীত কোন বিশেষ অধিকার বলে বিক্রেতা তার পণ্য-সমূহকে তাদের মূল্যের তে বিক্রয় করতে সক্ষম হল, যেমন ১০০-র জায়গায় ১১০-এ যে একত্রে দাম নামীয় ভাবে বধিত হল শতকরা ১০ ভাগ। সুতরাং বিক্রেতার পকেটে এল ১০ সংখ্যক উদ্ধৃত্ত মূল্য। কিন্তু বিক্রয় করে দেবার পরে সে পরিণত হয় ক্রেতায়। তখন এক তৃতীয় পণ্য-মালিক তার কাছে আসে বিক্রেতা হিসেবে; সে-ও তার। ক্ষমতা বলে ভোগ করে তার পণ্যসামগ্রীকে শতকরা ১০ ভাগ বেশিতে বিক্রয় করবার অধিকার। আমাদের বন্ধুটি বিক্রেতা হিসেবে যে বাড়তি ১০ হাত করেছিল, ক্রেতা হিসেবেই সেটাই তার হাতছাড়া হয়ে গেল।[১১] নীট ফল এই দাড়ায় যে সমস্ত পণ্য-মালিকেরাই তাদের দ্রব্যসামগ্রী পরস্পরের কাছে বিক্রয় করে মূল্যের উপরে শতকরা ১০ ভাগ বেশিতে, যার মানে দাঁড়ায় ঠিক এই জিনিসটিই যে তারা যেন তাদের দ্রব্যসামগ্রীকে তাদের যথার্থ মূল্যেই বিক্রয় করেছে। দামের এমন সাধারণ ও নামীয় বৃদ্ধিপ্রাপ্তির ফল যা ঘটে তা হচ্ছে যেন সোনার ওজনে প্রকাশিত না হয়ে রূপার ওজনে মূল্য প্রকাশিত হবার মতো। পণ্যদ্রব্যদির দাম নামীয় ভাবে বৃদ্ধি পাবে, কিন্তু তাদের মূল্যসমূহের মধ্যকার আসল সম্পর্ক অপরিবর্তিতই থেকে যাবে।
এবারে একটি উলটো ব্যাপার ধরে নেওয়া যাক। ধরা যাক যে ক্রেতা একটি বিশেষ অধিকারবলে পণ্যদ্রব্যাদিকে তাদের মূল্যে কমে ক্রয় করার সুযোেগ পেল। এ ক্ষেত্রে এটা মনে রাখার দরকার নেই যে সে আবার পালাক্রমে বিক্রেতায় পরিণত হবে, ক্রেতা হবার আগে সে বিক্রেতাই ছিল; ক্রেতা হিসাবে শতকরা ১০ ভাগ লাভ করার আগেই সে বিক্রেতা হিসেবে ১০% ভাগ লোকসান দিয়েছে।[১২] সব কিছুই যেমন ছিল, তেমনি আছে।
অতএব পণ্যদ্রব্যাদি তাদের মূল্যের বেশিতে বিক্রী হয় কিংবা কমে ক্রীত হয়—এ দুটির কোনটা ধরে নিয়েই উদ্ধৃত্ত মূল্যের সৃষ্টিকে ব্যাখ্যা করা যায় না।[১৩]
কর্নেল টরেন্স যেমন করেছেন তেমন ভাবে অবান্তর ব্যাপারগুলি টেনে এনেও সমস্যাটাকে সরল করে ফেলা সম্ভব হয় না। টরেন্স লিখেছেন, “পণ্যদ্রব্যদির উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় তাদের জন্য, সরাসরি বা ঘোরলো দ্রব্য-বিনিময়ের মাধ্যম মূলধনের বৃহত্তম অংশ প্রদানের ব্যাপারে পরিভোগকারীদের যে সক্ষমতা ও প্রবণতা (!), তা থেকেই ফলপ্রসূ চাহিদার উদ্ভব ঘটে।”[১৪] সঞ্চলনের পরিপ্রেক্ষিতে উৎপাদনকারী এবং পরিভোগকারীদের সাক্ষাৎকার ঘটে কেবল ক্রেতা এবং বিক্রিতা হিসেবেই। উৎপাদনকারীর দ্বারা অর্জিত উত্তমূল্য উদ্ভূত হয় এই ঘটনা থেকে যে পরিভোগকারীরা পণ্যদ্রব্যাদির জন্য তাদের মূল্যের অতিরিক্ত কিছু দিয়ে থাকে একথা বলার যা মানে দাঁড়ায় তা এই : বিক্রেতা হিসেবে পণ্য-মালিক মূল্যের বেশিতে বিক্রয় করবার বিশেষ অধিকার ভোগ করে। বিক্রেতা নিজেই তার পণ্যদ্রব্যাদি উৎপাদন করেছে কিংবা উক্ত পণ্যদ্রব্যাদির উৎপাদনকারীর প্রতিনিধিত্ব করছে, কিন্তু ক্রেতাও তো তার সমভাবেই অর্থের আকারে পণ্যদ্রব্যাদির উৎপাদন করেছে কিংম্বা তার উৎপাদনকারীর প্রতিনিধিত্ব করছে। তাদের মধ্যে পার্থক্য এই যে একজন ক্রয় করে, অন্যজন বিক্রয় করে। উৎপাদকের অভিধায় অভিহিত হয়ে পণ্যের মালিক তার পণ্য বির করে তার মূল্যের অতিরিক্ত কিছুতে এবং পরিভোক্তার অভিধায় অভিহিত হয়ে সে-ই আবার দিয়ে থাকে পণ্যের মূল্যের অতিরিক্ত কিছু—এই ঘটনা আমাদের এক পা-ও এগিয়ে নিয়ে যায় না।[১৫]
