যে রূপের আকারে পণ্যের সরল ও সরাসরি বিনিময় নিজেকে উপস্থিত করে সেই রূপের আকারেই সঞ্চলন প্রক্রিয়াটিকে আলোচনা করে দেখা যাক। যখন পণ্যদ্রব্যাদির দুজন মালিক পরস্পরের কাছ থেকে ক্রয় করে, এবং হিসেবে নিকেশের নির্দিষ্ট দিনে পরস্পরের কাছে দেনা-পাওনার পরিমাণ সমান হওয়ায় তা পরস্পরকে বাতিল করে দেয়, তখন সব সময়েই এমন ঘটনাই ঘটে থাকে। এই ক্ষেত্রে অর্থ হচ্ছে হিসেব রাখার অর্থ এবং তা কাজ করে পণ্যদ্রব্যাদির মূল্যকে দামসমূহের মাধ্যমে প্রকাশ করতে, অথচ নিজে কিন্তু সে নগদ টাকার আকারে না থেকেও পণ্যদ্রব্যাদির মুখোমুখি হয়। এটা সুস্পষ্ট যে ব্যবহার মূল্যের দিক থেকে দেখলে দুটি পক্ষই কিছু সুবিধা পেতে পারে ! দুজনেই নিজ নিজ পণ্য হাতছাড়া করে যে যে পণ্যের ব্যবহার মূল্য তাদের নিজের নিজের কাছে নেই এবং হাতে পায় এমন এমন পণ্য যার যার ব্যবহার মূল্য তার তার কাছে আছে। তা ছাড়া, আরো একটি সুবিধাও পাওয়া যেতে পারে। ক বিক্রয় করে মদ এবং ক্রয় করে শস্য; সে সম্ভবতঃ খ নামক কৃষকের তুলনায় একটি নির্দিষ্ট এম-সময়ে বেশী পরিমাণ মদ উৎপাদন করতে পারে, অন্য দিকে আবার ও সম্ভবতঃ ক নামক মদ প্রস্তুত কারকের তুলনায় পারে বেশী পরিমাণ শস্য উৎপাদন করতে। সুতরাং, নিজে নিজে নিজের জন্য শস্য ও মদ উৎপাদন করে তারা যে যে পরিমাণ পেত, তার তুলনায় একই বিনিময় মূল্যে ক পেতে পারে অধিকতর পরিমাণে শস্য এবং খ অধিকতর পরিমাণে মদ। সুতরাং ব্যবহার মূল্যের দিক থেকে এ কথা বলার পেছনে বেশ ভালো যুক্তি আছে যে, “বিনিময় হচ্ছে এমন একটি লেনদেন যার ফলে দু পক্ষই লাভবান হয়।[১] বিনিময়মূল্যের দিক থেকে কিন্তু ব্যাপারটি অন্য ধরনের। “প্রচুর মদ আছে কিন্তু কোনো শস্য নেই এমন একজন ব্যক্তি কারবার করে এমন একজন ব্যক্তির সঙ্গে যার প্রচুর শস্য আছে কিন্তু কোনো মদ নেই, তাদের মধ্যে বিনিময় ঘটে ৫০ মূল্যের শস্যের সঙ্গে ঐ একই মূল্যের মদের। এই লেনদেনের ফলে বিনিময়মূল্য কোনো বৃদ্ধিই ঘটেনানা কারো পক্ষেই না, কেননা লেনদেনের মাধ্যমে যে যা মূল্য পেল তার আগেও তার সেই মূল্যই ছিল।”[২] ফলে কোনো পরিবর্তন ঘটেনা বিভিন্ন পণ্যের মধ্যে সঞ্চলনের মাধ্যম হিসাবে অর্থকে চালু করলে এবং বিক্রয় ও ক্রয়কে স্বতন্ত্র ক্রিয়ার পরিণত করলে,[৩] সঞ্চলনে যাবার আগে পণ্যের মূল্য অভিব্যক্ত হয় দামের মাধ্যমে; সুতরাং এটা হল সঞ্চলনের একটি পূর্ব-শর্ত, তার ফল নয়।[৪]
বিশিষ্ট ভাবে বিবেচনা করলে অর্থাৎ সরল পণ্য-সঞ্চলনের নিয়মগুলি থেকে প্রত্যক্ষভাবে প্রবাহিত নয় এমন সব ঘটনাবলী থেকে বিচ্ছিন্ন ভাবে বিবেচনা করলে, যা দেখি তা একটি বিনিময় মাত্র, যা সংশ্লিষ্ট পণ্যটির রূপে একটি নিছক পরিবর্তন; একটি রূপান্তরণ ছাড়া আর কিছু নয় ( অবশ্য, যদি আমরা একটি ব্যবহার-মূল্যের বদলে আরেকটি ব্যবহার-মূল্যের স্থান-গ্রহণের ঘটনাটিকে বাদ দিয়ে ধরি )। পণ্যের মালিকটির হাতে আগা গোড়াই থেকে যায় একই বিনিময়মূল্য অর্থাৎ একই পরিমাণ বিধৃত সামাজিক শ্ৰম-প্রথমে তার নিজেরই পণ্যের আকারে এবং শেষে, ঐ অর্থের সাহায্যে সে যে পণ্য ক্রয় করে, তার আকারে। রূপগত পরিবর্তন মানে আয়তনগত পরিবর্তন নয়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়াটিতে পণ্যটির মূল্য যে পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে পার হয়, তা তার অর্থ রূপে পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। এই রূপটি বিদ্যমান হয় প্রথমে বিক্ৰয়াৰ্থ উপস্থাপিত পণ্যটির দাম হিসেবে; পরে সত্যকার অর্থের একটি পরিমাপ হিসেবে-যা অবশ্য আগেভাগেই অভিব্যক্তি পেয়েছিল দাম হিসেবে, এবং শেষে একটি সমার্ঘ পণ্যে দাম হিসেবে। &৫ পাউণ্ডের একটি নোটকে যদি ‘সভরিন’ ‘হাফ সভরিন ও শিলিং এ পরিবর্তন করা হয়, তা হলে যতটা পরিবর্তন সূচিত হয়, এক্ষেত্রেও রূপগত পরিবর্তন ঠিক ততটাই মূল্যগত পরিবর্তন সূচিত করে। সুতরাং পণ্য-সঞ্চলন যতটা পর্যন্ত কেবল পণ্যদ্রব্যাদির মূল্যসমূহেই একটি পরিবর্তন ঘটায় এবং ব্যাঘাত সৃষ্টিকারী প্রভাবাদি থাকে মুক্ত থেকে ততটা পর্যন্ত তা আবশ্যিক ভাবেই হবে সমানে সমানে বিনিময়। মূল্যের প্রকৃতি সম্পর্কে যেহেতু হাতুড়ে অর্থশাস্ত্র প্রায় কিছুই জানেন সেই হেতু যখনি তা সঞ্চলন ঘটনাবলীকে তাদের বিশুদ্ধ স্বরূপে বিবেচনা করতে চায়, তখনি তা ধরে নেয় যে যোগান আর চাহিদা পরস্পরের সমান—যার মানে দাড়ায় এই যে তাদের ফলশ্রুতি হচ্ছে শূন্য। সুতরাং যদি বিনিমিত ব্যবহার-মূল্যসমূহের ক্ষেত্রে, ক্রেতা এবং বিক্রেতা উভয়েরই সম্ভবতঃ কিছু লাভ হয়, তথাপি সেটা কিন্তু বিনিময় মূল্যের ক্ষেত্রে খাটেনা। এখানে বরং আমাদের বলতে হবে, যেখানে সমতা উপস্থিত সেখানে লাভালাভ অনুপস্থিত।”[৫] একথা সত্য যে, মূল্য থেকে বিচ্যুত হয়ে হয়ে ভিন্নতর দামে পণ্যদ্রব্যাদি বিক্রীত হতে পারে, কিন্তু এই ধরনের বিচ্যুতিগুলিকে গণ্য করতে হবে পণ্য-বিনিময়ের নিয়মাবলীর লঙ্ঘন হিসাবে,[৬] যা তার স্বাভাবিক অবস্থায় হচ্ছে সমার্ঘ ভ্রব্যাদির বিনিময় এবং কাজে কাজেই, তা কোন ক্রমেই মূল্যের বৃদ্ধি সাধনের পন্থা নয়।[৭]
অতএব, আমরা দেখতে পাচ্ছি যে পণ্য-দ্রব্যাদির সঞ্চলনকে উদ্ধৃত্ত মূল্যের একটি উৎস হিসেবে দেখানোর সমস্ত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও কিন্তু যা ফাকে ফাকে বেরিয়ে আসে তা হচ্ছে একটি আদান-প্রদানের, ব্যাপার ব্যবহার মূল্য এবং বিনিময়মূল্যের একটি সংমিশ্রণ। যেমন, কঁদিলাক বলেন, “একথা সত্য নয় যে বিনিময়ের বেলায় আমরা মূল্যের বদলে মূল্য দিয়ে থাকি উলটো, চুক্তিবদ্ধ দুটি পক্ষের প্রত্যেকটি পক্ষই প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই বৃহত্তর মূল্যের বদলে ক্ষুদ্রতর মূল্য দিয়ে থাকে। আমরা যদি সত্য সত্যই সমান সমান মূল্যের বিনিময় করতাম তা হলে কোনো পক্ষেই কোনো মুনাফা করতে পারত না। কিন্তু তবু তো তারা দু পক্ষই লাভ করে কিংবা তাদের দু পক্ষেরই লাভ করা উচিত। কেন? কোন জিনিসের মূল্যের অস্তিত্ব একমাত্র আমাদের অভাববোধেরই পরিপ্রেক্ষিতে। একজনের কাছে যা অধিকতর, অন্যজনের কাছে তা-ই অল্পতর এবং এর উলটোটাও সত্য। : এটা ধরে নেওয়া ঠিক নয় যে আমাদের পরিভোগের জন্য যে দ্রব্যসামগ্রী দরকার সেগুলিকে আমরা বিক্রয়ের জন্য উপস্থিত করি … একটি উপযযাগিতা-বিহীন দ্রব্যই আমরা হস্তান্তরিত করতে চাই যাতে করে যে দ্রব্যটি আমাদের কাছে উপযযাগিতা-সম্পন্ন সেটি আমরা পেতে পারি; আমরা বেশির জন্য কম দিতে চাই। যখন বিনিমিত প্রত্যেকটি দ্রব্যই ছিল একই পরিমাণ সোনার সঙ্গে সমমূল্য, তখন এটা ভাবা স্বাভাবিক ছিল যে একটি বিনিময় মূল্যের বদলে মূল্যই দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু আমাদের হিসেবে আরো একটি বিষয় ধরা উচিত। তা এই যে আমরা দুজনেই প্রয়োজনীয় কোনো কিছুর অন্য অপ্রয়োজনীয় কোন কিছু দিয়ে দিচ্ছি কিনা।”[৮] এই অনুচ্ছেদটিতে আমরা দেখতে পাচ্ছি কিভাবে কঁদিলাক কেবল ব্যবহার মূল্যের সঙ্গে বিনিময় মূল্যকে গুলিয়ে ফেলেছেন, কেবল তাই নয় আমরা আরো দেখতে পাচ্ছি, কেমন করে একেবারে বালখিল্যের মতো তিনি ধরে নিয়েছেন যে, যে-সমাজের পণ্য-উৎপাদন বেশ সুপরিণত তেমন একটি সমাজে প্রত্যেক উৎপাদনকারীই উৎপাদন করছে তার নিজের জীবন ধারণের উপকরণাদি আর সঞ্চলনে ছুড়ে দিচ্ছে যা তার প্রয়োজনের অতিরিক্ত কেবল তা-ই।[৯] তবু কিন্তু কঁদিলাকের এই যুক্তিই হামেশা কাজে লাগান আধুনিক অর্থনীতি বিদরা—বিশেষ করে তখন, যখন তারা প্রমাণ করতে চান যে, পণ্যদ্রব্যাদির বিনিময় তার পরিণত পর্যায়ে তথা বাণিজ্যের পর্যায়ে উদ্বৃত্ত মূল্যের জন্ম দেয়। দৃষ্টান্ত হিসেবে উদ্ধৃত করা যায় : বাণিজ্য ……উৎপাদিত দ্রব্যসমূহে মূল্য সংযোজিত করে, কেননা ঐ একই দ্রব্যাদি যখন থাকে উৎপাদকদের হাতে তখন তাদের যা মূল্য থাকে, তার চেয়ে তাদের মূল্য বেশী হয় যখন তারা আসে পরিভোক্তাদের হাতে এবং এই ব্যাপারটিকে যথাযথ ভাবে দেখলে উৎপাদনের ক্রিয়া হিসাবেই গণ্য করা উচিত।[১০] কিন্তু পণ্যদ্রব্যাদির জন্য তো দু-দুবার দাম দেওয়া হয়না একবার তাদের ব্যবহার-মূল্যের জন্য এবং দ্বিতীয় বার তাদের মূল্যের জন্য। এবং যদিও একটি পণ্যের ব্যবহার-মূল্য তার বিক্রেতার তুলনায় তার ক্রেতার কাছে বেশী কাজে লাগে, তার অর্থরূপ কিন্তু তার বিক্রেতার কাছেই বেশী কাজের জিনিস। তা না হলে কি সে তা বিক্রয় করত? সুতরাং আমরা ঐ একই যুক্তিতে বলতে পারি যে ক্রেতার কাজটিকেও যথাযথ ভাবে দেখলে উৎপাদনের ক্রিয়া হিসাবেই গণ্য করা উচিত, কেনন! সে ধরা যাক, মোজাগুলিকে রূপান্তরিত করে অর্থে।
