সরল সঞ্চলনের ক্ষেত্রে পণ্যদ্রব্যাদির মূল্য যে স্বতন্ত্র রূপ—অর্থরূপ—পরিগ্রহ করে, তা কেবল একটি উদ্দেশ্যেই কাজ করে; সে উদ্দেশ্যটি হচ্ছে তাদের বিনিময়; গতিক্রমের চুড়ান্ত পরিণতিতে তা অন্তর্হিত হয়ে যায়। পক্ষান্তরে অ—প-অ সঞ্চলনে, অর্থ এবং পণ্য দুই-ই খোদ মূল্যেরই অস্তিত্ব ধারণের বিভিন্ন পদ্ধতির, সাধারণ রূপে অর্থের এবং প্রচ্ছন্ন রূপে পণ্যের প্রতিনিধিত্ব করে।[১২] তা নিরন্তর একরূপ থেকে অন্যরূপে রূপান্তরিত হয় কিন্তু হারিয়ে যায় না, এবং এই ভাবে তা আপনা আপনিই সক্রিয় চরিত্র ধারণ করে। নিজের জীবনক্রমে স্বয়ংসম্প্রসারণশীল মূল্য পরস্পরাগত ভাবে যে দুটি বিভিন্ন রূপ ধারণ করে, সেগুলিকে যদি আমরা পালাক্রমে আলোচনা করি, তা হলে আমরা এই দুটি প্রবক্তব্যে উপনীত হই : মূলধন হচ্ছে অর্থ : মূলধন হচ্ছে পণ্য।[১৩] আসলে কিন্তু, মূল্য হচ্ছে এখানে এমন একটি প্রক্রিয়ার একটি সক্রিয় উপাদান, যে প্রক্রিয়াটিতে তা, পালাক্রমে ক্রমাগত অর্থ এবং পণ্যের রূপ পরিগ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে যুগপৎ আয়তনের দিক থেকে পরিবর্তিত হয়, নিজের মধ্য থেকে উদ্ধৃত মূল্যকে উৎক্ষিপ্ত করে নিজেকে পৃথগায়িত করে; ভাষান্তরে বলা যায়, মূল মূল্যটি স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে নিজেকে সম্প্রসারিত করে। কেননা যে গতিক্রমের পথে সে উদ্ধও মূল্য সংযুক্ত করে তা তার নিজেরই গতিক্রম। সুতরাং তার সম্প্রসারণ হচ্ছে স্বয়ংক্রিয় সম্প্রসারণ। যেহেতু সে হচ্ছে মূল্য, সেহেতু নিজের সঙ্গে মূল্য সংযুক্ত করার গূঢ় গুণটি সে আয়ত্ত করে নিয়েছে। সে জন্ম দেয় জীবন্ত সন্তান, কিংবা অন্ততঃ প্রসব করে সুবর্ণ ডিম্ব।
যেহেতু এই প্রক্রিয়ার সক্রিয় উপাদানটি হচ্ছে মূল্য এবং সে একসময়ে ধারণ করে অর্থের রূপ, অন্য সময়ে পণ্যের, কিন্তু সব সময়ে সংরক্ষিত ও সম্প্রসারিত করে নিজেকে, সেহেতু তার আবশ্যক হয় একটি স্বতন্ত্র রূপের—যার সাহায্যে যে কোনো সময়ে তার স্বপরিচয় প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। এবং এই যে রূপ, সেটি সে ধারণ করে কেবল অর্থের আকারেই। অর্থ রূপের অধীনেই মূল্যের প্রত্যেকটি স্বয়ংক্রিয় প্রজনন ক্রিয়ার শুরু এবং শেষ—এবং আবার শুরু। তার শুরু হয়েছিল £১০০ পাউণ্ড হিসেবে, এখন তা হয়েছে £১১০ পাউণ্ড ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু অর্থ নিজে হচ্ছে মূল্যের দুটি রূপের একটি মাত্র। যদি তা কোন পণ্যের রূপ ধারণ না করে, তা হলে তা মূলধন হয়ে ওঠে না। মওজুদের ক্ষেত্রে যেমন অর্থ এবং পণ্যের মধ্যে বিরোধ থাকে, এক্ষেত্রে অবশ্য তেমন কোন বিরোধ নেই। পুঁজিবাদী জানে যে সমস্ত পণ্যই—তা তাদের চেহারা যত কুৎসিৎই হোক না কেন কিংবা তাদের গন্ধ যতই উৎকটই হোক না কেন, তা হচ্ছে মনপ্রাণে অর্থ তথা ভিতরে ভিতরে সুন্নৎ করা ইহুদী এবং তার চেয়েও বেশী, একটা বিস্ময়কর উপায় যার সাহায্যে অর্থ থেকে আরো বেশী অৰ্থ তৈরী করা যায়।
প—অ—প সরল সঞ্চলনে পণ্যমূল্য বড় জোর উপনীত হয় পণ্যের ব্যবহার মূল্য থেকে নিরপেক্ষ একটি রূপে — তথা অর্থ রূপে, কিন্তু সেই একই মূল। এখন অ—প-অ সঞ্চলনে তথা মূলধন সঞ্চলনে, অকস্মাৎ নিজেকে উপস্থাপিত করে একটি স্বতন্ত্র সত্তা হিসেবে—এমন একটি স্বতন্ত্র সত্তা যার আছে নিজস্ব গতিবেগ, যা অতিক্রান্ত হয় নিজস্ব এমন একটি জীবন বৃত্তের মধ্য দিয়ে যাতে অর্থ এবং মুদ্রার ভূমিকা কেবল দুটি রূপ হিসেবে, যে-রূপ দুটি সে পালাক্রমে পরিগ্রহ করে এবং পরিত্যাগ করে। না, তার চেয়েও বেশি : কেবলমাত্র পণ্যদ্রব্যাদির সম্পর্ক সমূহর প্রতিনিধিত্ব করার পরিবর্তে, সে এখন প্রবেশ করে নিজের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক সমূহের মধ্যে উত্ত মূল্য হিসেবে। নিজের মধ্যেই সে পৃথগায়িত করে মূল মূল্য রূপে এবং উদ্ধৃত্ত মূল্য রূপে, যেমন জনক নিজেকে পৃথগায়িত করে তার জাতক থেকে—যদিও উভয়ই একবয়সী বা সমবয়সী; কেননা কেবলমাত্র £১০ পাউণ্ডের উদ্বৃত্ত মূল্যের দ্বারাই গোড়ায় আগাম দেওয়া £১ ০ ০ পাউণ্ড মূলধন হয়ে ওঠে এবং যে মুহূর্তে এটা ঘটে যায় সেই মুহূর্তেই জাতকের, এবং জাতকের মাধ্যমে জনকের, জন্ম ঘটে এবং তাদের পার্থক্যও হয় তিরোহিত এবং তারা পরিণত হয় £ ১০ পাউণ্ডে।
এইভাবে মূল্য এখন পরিণত হয় প্রক্রিয়াশীল মূল্যে, প্রক্রিয়াশীল অর্থে তথা মূলধনে। তা সঞ্চলন থেকে বেরিয়ে আসে। আবার ঢুকে যায় তারই মধ্যে, তার আবর্তের মধ্যে নিজেকে রক্ষা ও বৃদ্ধি করে, সম্প্রসারিত আয়তন নিয়ে তা থেকে বেরিয়ে ফিরে আসে, এবং আবার নতুন করে একই পরিক্রমণ শুরু করে।[১৪]
অ—অ অর্থ ই অর্থের জন্ম দেয়, এটাই হচ্ছে মূলধন’-এর বর্ণনা যা আমরা পেয়েছি তার প্রথম ভাষ্যকারদের কাছ থেকে, বাণিজ্যবাদীদের কাজ থেকে।
বিক্রয়ের জন্য ক্রয়, কিংবা ঠিক ভাবে বললে মহার্ঘতর বিনিময়ে বিক্রয়ের জন্য ক্রয়, অপ—অ’ নিশ্চিত ভাবে দেখা দেয় এমন একটি রূপে যা কেবল এক ধরনের মূলধনেরই বৈশিষ্ট্য—বাণিজ্য-মূলধনের। কিন্তু শিল্প-মূলধনও হচ্ছে অর্থ, যা পরিবর্তিত হয় পণ্যদ্রব্যাদিতে এবং সেই পণ্যদ্রব্যাদির বিক্রয়ের মাধ্যমে পুনঃরূপান্তরিত হয় অধিকতর পরিমাণ অর্থে। বিক্রয় এবং ক্রয়ের অন্তর্বতী অবকাশ, সঞ্চলনের বাইরে যেসব ঘটনা ঘটে, তা তার গতিক্রমকে ক্ষুন্ন করে না। সর্বশেষে, সুদ-প্ৰজনক মূলধনের ক্ষেত্রে, অপ-অসঞ্চলনটি সংক্ষেপিত বলে প্রতীয়মান হয়। মধ্যবর্তী স্তরটি ডিঙিয়েই তার ফলশ্রুতি আমরা পেয়ে যাই অ-অ-এর রূপে “en style lapidaire, অথ যা বেশী অর্থের সমান, মূল্য বা নিজের চেয়ে বেশী।
