অবশ্য, এটাও সম্ভব যে প—অ—প আবর্তে দুটি চরম বিন্দু প—প, ধরা যাক শস্য এবং কাপড়, ভিন্ন ভিন্ন অঙ্কের মূল্যেরও প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। কৃষক তার শস্য মূল্যের চেয়ে বেশিতে বিক্রয় করতে পারে কিংবা কাপড় ক্রয় করতে পারে মূল্যের চেয়ে কমে। আবার কাপড় ব্যবসায়ীর হাতে সে “চোট”-ও খেতে পারে। কিন্তু উপস্থিত আমরা সঞ্চলনের যে-রূপটি নিয়ে আলোচনা করছি, মূল্য এই ধরনের পার্থক্য একেবারেই আপতিক। শস্য এবং কাপড় যে সমার্থ, তাতে এই প্রক্রিয়াটি নিরর্থক হয়ে যায় না, যেমন হয়ে যায় অপঅ আবর্তটির ক্ষেত্রে। বরং তাদের মূল্যের সমার্ঘতাই হচ্ছে তার স্বাভাবিক গতিক্রমের একটি আবশ্যিক শর্ত।
ক্রয়ের উদ্দেশ্য বিক্রয়ের পুনর্ঘটন বা পুনরাবৃত্তি স্বরূপ যে ক্রিয়া তা তার যে উদ্দেশ্যে তার দ্বারাই সীমাবদ্ধ থাকে; সে উদ্দেশ্যটি হচ্ছে পরিভোগ যা নির্দিষ্ট অভাবের পরিতৃপ্তি সাধন-এননি একটি উদ্দেশ্য যা পুরোপুরিই সঞ্চলনের পরিধির বহিভূত। কিন্তু, পক্ষান্তরে, আমরা যখন বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে ক্রয় করি, আমরা যে-জিনিস দিয়ে শুরু করি সেই জিনিসেই শেষ করি সেটি হচ্ছে অর্থ বা বিনিময় মূল্য; আর তার ফলে গতিক্রমটি হয় সীমাহীন। সন্দেহ নেই যে, অ হয়ে ওঠে অ+ অ, £১০০ হয়ে ওঠে £১১০ পাউণ্ড। কিন্তু যখন একমাত্র গুণগত দিক থেকেই তাদের দেখা হয় তখন £১০০ পাউণ্ড আর £১১০ পাউণ্ড তা একই অর্থাৎ অর্থ; আর যদি পরিমাণগত ভাবে দেখা হয়, তা হলে £১০০ পাউণ্ড ৪১ ০ ০ পাউণ্ডের মতোই একটি নির্দিষ্ট ও সীমাবদ্ধ অঙ্কের মূল্য। এখন যদি £১১০ পাউণ্ডকে অর্থ হিসাবে ব্যয় করা হয়, তা হলে তা আর তার ভূমিকা পালন করতে পারে না। তা আর মূলধন নয়। সঞ্চলন থেকে প্রত্যাহৃত হয়, তা শিলীভূত হয় মওজুদের আকার আর যদি শেষ বিচারের দিন পর্যন্তও তা সেখানে থাকে, তা হলেও একটি ফার্দিংও তার সঙ্গে যুক্ত হবে না। তা হলে, মূল্যের সম্প্রসারণই যদি উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে £১ ০ ০ পাউণ্ডের মূল্য বিবর্ধনে ও যা প্রেরণা হিসাবে কাজ করে, £১১০ পাউণ্ডের বেলায়ও তা-ই, কেননা উভয়ই হচ্ছে বিনিময়মূল্যের সীমাবদ্ধ অভিব্যক্তি মাত্র; সুতরাং উভয়েই সংবর্ধনার পথ একই—পরিমাণগত বুদ্ধির মাধ্যমে পরমতম ধনবৃদ্ধির নিকটতম হওয়া। গোড়ায় আগাম দেওয়া মূল্যটি থেকে ১০০ পাউণ্ড থেকে সঞ্চলন-প্রক্রিয়ায় তার সঙ্গে যে উদ্ধৃত্ত মূল্য ৪১ ০ পাউণ্ড সংবৃত্ত হল, সেই উদ্বৃত্ত মূল্যটিকে কেবল স্বল্পকালে জন্যই পার্থক্য করা যায়; অতি অল্প কালের মধ্যেই এই পার্থক্য অন্তর্হিত হয়ে যায়। প্রক্রিয়াটির প্রান্তে উপনীত হয়ে এমনটি ঘটতে যে আমরা একহাতে পেলাম মূল £১০০ পাউণ্ড আর আরেক হাতে উদ্বৃত্ত £১০ পাউণ্ড। আমরা পাই কেবল £১১০ পাউণ্ডের একটি মূল্য, অবস্থার দিক থেকে এবং যোগ্যতার দিক থেকে সম্প্রসারণের প্রক্রিয়া শুরু করার ব্যাপারে মূল্য ১০০ পাউণ্ডেরও যে অবস্থা ও ঘোগ্যতা ছিল, এই £১১০ পাউণ্ডেরও তা আছে। অর্থ গতিক্রমের সুচনা করে কেবল তাকে আবার সমাপ্ত করার জন্যই।[৫] অতএব প্রত্যেকটি স্বতন্ত্র আবর্তের এমন একটি আবর্ত যাতে একটি ক্রয় ও তদনুসারী একটি বিক্রয় সম্পূর্ণায়িত হয়েছে তেমন একটি আবতনের চূড়ান্ত ফল তার নিজের মধ্যে থেকেই গড়ে দেয় নতুন আরেকটি আবর্তের বীজ। বিক্রয়ের জন্য ক্রয়-এই যে সরল পণ্য-সঞ্চলন, এটা হচ্ছে এমন একটি উদ্দেশ্য সাধনের উপায়, সঞ্চলনের সঙ্গে যার সংযোগ নেই, যথা ব্যবহার মূল্যের পরিভোগ, অভাবের পরিতৃপ্তি। পক্ষান্তরে, মুলধন হিসেবে অর্থের যে সঞ্চলন তা ইচ্ছে নিজেই নিজের উদ্দেশ্য, কেননা কেবল নিরন্তর পুনর্ঘটিত গতিক্রমের মধ্যেই ঘটতে পারে মূল্যের সম্প্রসারণ। সুতরাং মূলধনের সঞ্চলনের কোন সীমা নেই।[৬]
এই গতিক্রমের সচেতন প্রতিনিধি হিসেবে অর্থের মালিক পরিণত হয় মূলধনিকে (পুজিবাদীর-অনুঃ) তাঁর দেহ, বরং বলা উচিত তার পকেট, পরিণত হয় সেই বিন্দুতে যেখান থেকে শুরু হয় অর্থের যাত্রা এবং যেখানে সারা হয় অর্থের প্রত্যাবর্তন। অপ-অ সঞ্চলনের বিষয়গত ভিত্তি তথা উৎসমুখ হচ্ছে মূল্যের সম্প্রসারণ; আর এই মূল্যের সম্প্রসারণই হয়ে ওঠে পুজিপতির বিষয়ীগত লক্ষ্য; এবং যে-মাত্রায় তার কাজ কারবারের একমাত্র লক্ষ্য থাকে নিষ্কর্ষিত আকার আরো এবং আরো ধনের আয়ত্তীকরণ, সেই মাত্রায় তার ভূমিকা হচ্ছে পুঁজিবাদীর ভূমিকা তথা, চেতনা ও ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিরূপে রূপায়িত মূলধনের ভূমিকা। সুতরাং ব্যবহার মূল্যকে কখনো পুজিবাদীর আসল লক্ষ্য বলে গণ্য করলে চলবেনা।[৭] কোন একটি মাত্র লেনদেন থেকে পাওয়া মুনাফাকেও না। যা তার লক্ষ্য তা হচ্ছে মুনাফা সংগ্রহের এক বিরামহীন বিরতিহীন প্রক্রিয়া।[৮] ঐশ্বর্যের প্রতি এই সীমাহীন লোলুপতা, বিনিময়মূল্যের আসক্তিতে এই উন্মাদনাপূর্ণ পশ্চাদ্ধাবন[৯]—এটা পুজিবাদী এবং কৃপণ উভয়ের মধ্যেই লক্ষণীয় কিন্তু যেখানে কৃপণ ব্যক্তি হচ্ছে পাগল হয়ে যাওয়া পুজিবাদী সেখানে পুজিবাদী ব্যক্তিটি হচ্ছে বুদ্ধি-বিবেচনা-সম্পন্ন কৃপণ। সঞ্চলন থেকে নিজের অর্থকে তুলে নিয়ে বিনিময়মূল্যের সীমাহীন সংবর্ধনই হচ্ছে কৃপণের একমাত্র উদ্দেশ্য কিন্তু পুঁজিবাদী[১০] সেই একই উদ্দেশ্য সাধন করে বারংবার তার অর্থকে সঞ্চলনের মধ্যে ছুড়ে দিয়ে।[১১]
