প—অ-প সঞ্চলনে, অর্থ শেষ পর্যন্ত রূপান্তরিত হয় পণ্যে, যা কাজ করে ব্যবহার মূল্য হিসেবে। পক্ষান্তরে অপ-অ—এই বিপরীত রূপটিতে ক্রেতা অর্থ বিনিয়োগ করে যাতে করে বিক্রেতা হিসেবে সে আবার অর্থ ফেরৎ পায়। তার পণ্য ক্রয়ের দ্বারা সে অর্থ ছুড়ে দেয় সঞ্চলনে, যাতে করে আবার ঐ একই পণ্যের বিক্রয়ের দ্বারা সে সেই অর্থ তুলে নিতে পারে। সে অর্থকে হাতছাড়া করে কেবল এই ধূর্ত অভিসন্ধি নিয়েই যে ঐ অর্থ আবার তারই হাতে ঘুরে আসবে। সুতরাং যথার্থ ভাবে বললে, এ ক্ষেত্রে অর্থ ব্যয় করা হয়না, কেবল মাত্র আগাম দেওয়া হয়।[৩]
প—অপ—এই আবর্তে একই অর্থখণ্ড দুবার তার স্থান পরিবর্তন করে। বিক্রেতা অর্থখশুটি পায় ক্রেতার কাছ থেকে এবং দিয়ে দেয় আরেকজন বিক্রেতার কাছে। সম্পূর্ণ সঞ্চলনটি যার শুরু হয় পণ্যের জন্য অর্থের আদানে আর শেষ হয় তার প্রদানে অ—প-অ আবর্তটিতে কিন্তু যা ঘটে তা ঠিক এর বিপরীত। এখানে অর্থখণ্ডটি দুবার স্থান পরিবর্তন করে না, এখানে দুবার স্থান পরিবর্তন করে পণ্যটি। ক্রেতা পণাটিকে নেয় বিক্রেতার হাত থেকে এবং চালিয়ে দেয় আরেকজন ক্রেতার হাতে। ঠিক যেমন পণ্যের সরল সঞ্চলন একই অর্থখণ্ডের দুবার স্থান পরিবর্তনের ফলে সংঘটিত হয় তার এক হাতে অন্য হাতে স্থানান্তরণ ঠিক তেমনি এখানে। একই পণ্যের দুবার স্থান পরিবর্তনের ফলে সংঘটিত হয় অর্থের যাত্রা বিন্দতে। প্রত্যাবর্তন।
যে পরিমাণ অর্থ দিয়ে পণ্যটি ক্রয় করা হয়েছিল, তা থেকে বেশী পরিমাণ অর্থে তার বিক্রয়ের উপরে এই প্রত্যাবর্তন নিভরশীল নয়। এই ঘটনা কেবল যে-পরিমাণ অর্থ ফিরে আসে, সেটাকেই প্রভাবিত করে। যে মুহূর্তে ক্রীত পণ্যটি পুনরায় বিক্রিত হয়, অর্থাৎ, যে-মুহূর্তে অ—প-অ আবর্তটি সম্পূৰ্ণায়িত হয়, সেই মুহূর্তেই প্রত্যাবর্তন ঘটে যায়। অতএব, এখানেই আমরা মূলধন হিসেবে অর্থের সঞ্চলন এবং নিছক অর্থ হিসেবে অর্থের সঞ্চলন—এই দুয়ের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট পার্থক্য লক্ষ্য করি।
যে-মুহূর্তে একটি পণ্যের বিক্রয়লব্ধ অর্থকে আবার আরেকটি পণ্যের বিক্রয়ের দ্বারা নির্শিত করা হয়, সেই মুহূর্তেই প-অপ আবর্তটির সমাপ্তি ঘটে।
যা-ই হোক, যদি তার যাত্রা বিন্দুতেই অর্থের প্রত্যাবর্তন ঘটে থাকে, তা হলে সেটা ঘটে থাকতে পারে কেবল প্রক্রিয়াটির পুনর্ঘটন বা পুনরাবৃত্তির ফলেই। যদি আমি এক কোয়ার্টার শস্য ৫৩ পাউণ্ডের বিনিময় বিক্রয় করি এবং এই £ পাউণ্ডের সাহায্যে কাপড়-চোপড় ক্রয় করি, তা হলে, আমার সঙ্গে যতটা সম্পর্ক, অর্থটা ব্যয় হয়ে গেল, কাজ চুকে গেল। অর্থ টির মালিক হল কাপড় ব্যবসায়ী। এখন যদি আমি দ্বিতীয় আর এক কোয়ার্টার শস্য বিক্রয় করি, তা হলে বাস্তবিকই অর্থ আমার কাছে ফিরে আসে, কিন্তু তা যে আসে সেটা প্রথম লেন-দেনের জের হিসেবে নয়, আসে তার পুনর্ঘটনের দরুন। যে-মুহূর্তে আমি একটি নতুন ক্রয়ের দ্বারা দ্বিতীয় লেনদেন-প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণায়িত করি, অর্থ আবার তখনি আমাকে ছেড়ে চলে যায়। সুতরাং প-অ—প আবর্তটিতে, অর্থের ব্যয়ের সঙ্গে তার প্রত্যাবর্তনের কোনো সম্পর্ক নেই। পক্ষান্তরে অপ-অ আবর্তটিতে, অর্থের প্রত্যাবর্তন তার ব্যয়ের পদ্ধতিটির দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হয়। এই প্রত্যাবর্তন ছাড়া, প্রক্রিয়াটি তার পরিপূরক পর্যায়টিকে তথা বিক্রয়ের ঘটনাটিকে ঘটাতে না পেরে ব্যর্থ হয়ে যায় কিংবা তা ব্যাহত হয়, অসম্পূর্ণ থাকে।
প-অ—প আবর্তটি শুরু হয় একটি পণ্য দিয়ে এবং শেষ হয় আরেকটি পণ্য দিয়ে –যা সঞ্চলন থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে পরিভোগর কাজে লাগে। পরিভোগই অভাবের পরিতৃপ্তি, এক কথায়, ব্যবহার-মূল্যই তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। পক্ষান্তরে অপ-অ আবর্তটি শুরু হয় অর্থ দিয়ে, শেষও হয় অর্থ দিয়ে। এর প্রধান উদ্দেশ্য—এবং যে লক্ষ্যটি একে আকৃষ্ট করে, তা হচ্ছে কেবল বিনিময় মূল্য।
সরল পণ্য সঞ্চলনে, আবর্তটির দুটি চরম বিন্দুরই থাকে অর্থনৈতিক রূপ তারা উভয়ই হচ্ছে পণ্য-এবং একই মূল্যের পণ্য। কিন্তু তারা আবার ব্যবহার মূল্যও বটে—তবে ভিন্ন ভিন্ন গুণসম্পন্ন, যেমন শস্য এবং কাপড়চোপড়। সমাজের শ্রম যে-যে সামগ্রীতে মূর্ত তাদের মধ্যে বিনিময় তথা উৎপন্ন দ্রব্যাদির বিনিময়ই এখানে রচনা করে গতিক্রমটির ভিত্তি। কিন্তু অপ—অ আবর্তটিতে ব্যাপারটি ভিন্ন ধরনের; আপাত দৃষ্টিতে অপ—অ মনে হয় যেন নিরর্থক, কেননা দ্বিরুক্তিবাচক। দুটি চরম বিন্দুরই থাকে একই অর্থনৈতিক রূপ। দুটিই হচ্ছে অর্থ; সুতরাং তার গুণগত ভাবে ভিন্ন ভিন্ন ব্যবহার মূল্য নয়। কেননা অর্থ হচ্ছে পণ্যসমূহেরই রূপান্তরিত রূপ, যে-রূপে তাদের বিশেষ বিশেষ ব্যবহার মূল্যগুলি অন্তর্হিত হয়ে যায়। তুলোর জন্য £১০০ পাউণ্ড বিনিময় করা এবং তারপর আবার £১ . ৫ পাউণ্ডের জন্য সেই তুলোকে বিনিময় করা হচ্ছে কেবল অর্থের জন্য অর্থকে একই দ্রব্যের জন্য একই দ্রব্যকে বিনিময়ের ঘোরানো পদ্ধতি মাত্র; মনে হয় যেন গোটা ব্যাপারটাই যেমন নিরর্থক, তেমনি আজগুবি।[৪] একটা টাকার অঙ্কের সঙ্গে আরেকটা টাকার অঙ্কের পার্থক্য কেবল পরিমাণে। সুতরাং‘অপ—অ প্রক্রিয়াটির প্রকৃতি ও প্রবণতা তার চরম বিন্দুটির মধ্যে কোনো গুণগত পার্থক্য থেকে উদ্ভূত নয়, কারণ দুই-ই হচ্ছে অর্থ; পার্থক্যটা পুরোপুরি তাদের পরিমাণগত ভিন্নতা থেকে উদ্ভূত। শুরুতে যে-পরিমাণ অর্থ সঞ্চলনে ছোড়া হয়েছিল, শেষে তার চেয়ে বেশী পরিমাণ অর্থ তুলে নেওয়া হয়। যে-তুলো কেনা হয়েছিল £১ ০ ০ পাউণ্ডের বিনিময়ে, সেটা আবার বেচে দেওয়া হল হয়তো £১০০+৪১ ০ = £১১০ পাউণ্ডের বিনিময়ে। এই প্রক্রিয়াটির যথাযথ রূপ দাড়ায় অ—প—অ’, যেখানে অ অ+ / অ=গোড়ায় আগাম দেওয়া অঙ্ক+বর্ধিত অংশ। এই বর্ধিত অংশ অর্থাৎ গোড়ায় আগাম দেওয়া মূল্যটির সঙ্গে যে বাড়তিটুকু যোগ হল, তাকে আমি বলছি*উদ্বত মূল্য”। অতএব, সঞ্চলনের প্রক্রিয়ার গোড়ায় আগাম দেওয়া মূল্যটি যে কেবল অটুটই থাকে, তাই নয়, তা নিজেকে বর্ধিত করে তথা নিজের সঙ্গে উদ্ধৃত্ত মূল্য যুক্ত করে। এই গতিক্রমই তাকে মূলধনে রূপান্তরিত করে।
