পণ্য-সঞ্চলনের বস্তু-সত্ত্ব থেকে তথা বহুবিধ ব্যবহার মূল্যের বিনিময় থেকে যদি আমরা নিষ্কর্ষিত করে নিই এবং কেবল সঙ্কলনের এই প্রক্রিয়া থেকে উৎপন্ন রূপগুলিকেই বিবেচনার মধ্যে ধরি, আমরা তার চূড়ান্ত ফলশ্রুতি হিসেবে যা পাই তা হচ্ছে ‘অথ’ : পণ্য-সঞ্চলের এই যে চুড়ান্ত রূপ, এই রূপেই ঘটে মূলধনের প্রথম আবির্ভাব।
ইতিহাসের বিচারে, ভূ-সম্পত্তির পাল্টা হিসেবে মূলধন অনিবার্য ভাবেই ধারণ করে অর্থের রূপ; বণিক এবং কুসীদজীবীর মূলধন হিসেবে তা দেখা দেয় অর্থরূপী ধন হিসেবে।[১] কিন্তু মূলধনের প্রথম আবির্ভাব যে অর্থ-রূপেই হয়েছিল তা প্রমাণ করবার জন্য মূলধনের উৎস পর্যন্ত যাবার দরকার পড়ে না। প্রত্যহই আমরা আমাদের চোখের উপরেই দেখি যে অর্থ-রূপেই মূলধনের প্রথম আবির্ভাব ঘটে। এমনকি আমাদের দিনেও সমস্ত নতুন মূলধন রঙ্গমঞ্চে, তথা বাজারে—তা সে পণ্যের বাজার, শ্রমের বাজার বা টাকার বাজার যা-ই হোক না কেন সব বাজারেই সর্বপ্রথমে আবির্ভূত হয় অর্থের আকারেই, যা ক্রমে একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় রূপায়িত হল মূলধনে।
নিছক অর্থ হিসেবেই যে অর্থ এবং মূলধন হিসেবে যে অর্থ এই দুয়ের মধ্যে প্রথমে যে পার্থক্যটি আমাদের চোখে পড়ে, তা তাদের সঞ্চলনের রূপে পার্থক্য ছাড়া আর কিছুই নন।
পণ্য সঞ্চলনের সরলতম রূপ হচ্ছে প অ প, পণ্যের অর্থে রূপান্তর, এবং পুনরায় অর্থের পণ্যে পরিবর্তন, অর্থাৎ ক্রয়ের জন্য বিক্রয়। কিন্তু এই রূপটির পাশাপাশিই আমরা প্রত্যক্ষ করি স্পষ্ট ভাবেই ভিন্নতর আরেকটি রূপ : অপ অ; অর্থের পণ্যে রূপান্তর, এবং পুনরায় পণ্যের অর্থে পরিবর্তন; তথা বিক্রয়ের জন্য ক্রয়। এই শেষোক্ত প্রণালী, যে-অর্থ সঞ্চলন করে তাই হচ্ছে সম্ভাব্য মূলধন এবং পরিণত হয় মূলধনে।।
এখন, অ প অ আবর্তটিকে আরো একটু ঘনিষ্ঠ ভাবে পরীক্ষা করে দেখা যাক। অন্য আবর্তটির মত এটিও দুটি বিপরীতমুখী পর্যায়ের সমষ্টি। প্রথম পর্যায়টিতে, অপ, তথা ক্রয়-এর পর্যায়টিতে, অর্থ পরিবর্তিত হয় পণ্যে। দ্বিতীয় পর্যায়টিতে, প—অ, তথা বিক্রয়-এর পর্যায়টিতে পণ্য পুনরায় পরিবর্তিত হয় অর্থে। এই দুটি পর্যায় সম্মিলিত হয়ে রচনা করে একটি এক গতিক্রম, যার প্রক্রিয়ায় অর্থের বিনিময় ঘটে পণ্যের সঙ্গে ঐ একই পণ্যের পুনরায় বিনিময় ঘটে অর্থের সঙ্গে; যার প্রক্রিয়ায় একটি পণ্যকে ক্রয় করা হয় আবার তাকে বিক্রয় করার জন্য কিংবা, ক্রয় ও বিক্রয়ের রূপটিকে যদি উপেক্ষা করি, তা হলে বলা যায় যে, একটি পণ্যকে ক্রয় করা হয় অর্থের সাহায্যে এবং তারপরে অর্থকে ক্রয় করা হয় পণ্যের সাহায্যে।[২] এই যে ফলশ্রুতি, যার মধ্য থেকে সংশ্লিষ্ট অখণ্ড প্রক্রিয়াটির খণ্ড খণ্ড পর্যায় দুটি অন্তর্হিত হয়ে যায়, তার-রূপ দাড়ায় অর্থের পরিবর্তে অর্থের বিনিময় : অ-অ। আমি যদি ৪১০০ পাউণ্ড দিয়ে ২০০০ পাউণ্ড তুলা ক্রয় করি এবং তার পরে ঐ ২০০০ পাউণ্ড তুলাকে আবার £১১ পাউণ্ড পেয়ে বিক্রয় করি, তা হলে আমি কাৰ্ষত যা করে থাকি, তা হল ১০০ পাউণ্ডের সঙ্গে £১১০ পাউণ্ডের বিনিময়, অর্থের সঙ্গে অর্থের বিনিময়।
এখন এটা সুস্পষ্ট যে অ-প-অ আবর্তটি হয়ে পড়ত অসম্ভব এবং অর্থহীন, যদি এই আবর্তটির সাহায্যে কেবল দুটি সমান অঙ্কের অর্থকেই £১০০ পাউণ্ডের সঙ্গে ১০০ পাউণ্ডেরই, বিনিময় ঘটানোর উদ্দেশ্য থাকত। কৃপণের পরিকল্পনা হত ঢের বেশী সরল ও সুনিশ্চিত; সঞ্চলনের ঝুঁকির মধ্যে না গিয়ে সে তার £১০০ পাউণ্ডকেই আঁকড়ে থাকত। এবং তথাপি যে-ব্যবসায়ী তার তুলোর জন্য £১০০ পাউণ্ড দিয়েছে, সে তার সেই তুলোকে £১১০ পাউণ্ডের জন্য বিক্রয় করে দেয়, এমন কি £১… কিংবা £৫ . পাউণ্ডের জন্যও বিক্রয় করে দেয়, তা হলেও সমস্ত ক্ষেত্রেই তার অর্থ এমন একটি বিশিষ্ট ও মৌলিক গতিক্রমের মধ্য দিয়ে পার হয়, যা, যে কৃষক ফসল বিক্রয় করে এবং এইভাবে হস্তগত অর্থের সাহায্যে কাপড়-চোপড় ক্রয় করে তার হাত দিয়ে অর্থ যে-গতিক্রমের মধ্য দিয়ে পার হয়, তা থেকে চরিত্রগত ভাবেই ভিন্নতর। সুতরাং আমাদের শুরুতেই পরীক্ষা করে দেখতে হবে অপ-অ এবং প—অ প—এই দুটি আবর্তের পার্থক্য সূচক বৈশিষ্ট্যগুলিকে এবং তা করলেই নিছক রূপগত পার্থক্যের অন্তরালে যে আসল পার্থক্যটি আছে সেটি প্রকাশ হয়ে পড়বে।
প্রথমে দেখা যাক, দুটি রূপের মধ্যে অভিন্ন কি কি আছে।
দুই আবর্তকেই দুটি অভিন্ন বিপরীতমুখী পর্যায়ে পর্যবসিত করা যায় : প—অ এবং অ-প, যথাক্রমে বিক্রয় এবং ক্রয়। এই দুটি পর্যায়ের প্রত্যেকটি পর্যায়েই একই বস্তুগত উপাদানসমূহ যেমন পণ্য এবং অর্থ এবং একই নাটকীয় চরিত্রসমূহ, যেমন ক্রেতা এবং বিক্রেতা, পরস্পরের মুখোমুখি হয়। প্রত্যেকটি আবর্তই দুটি একই বিপরীত মুখী পর্যায়ের ঐক্য, এবং প্রত্যেকটি পর্যায়েই এই ঐক্য সংঘটিত হয় তিনটি চুক্তিবদ্ধ পক্ষের হস্তক্ষেপের ফলে, যাদের মধ্যে একটি পক্ষ কেবল বিক্রয় করে, আরেকটি কেবল ক্রয় করে, আর বাকি পক্ষটি বিক্রয় এবং ক্রয় দুই-ই করে।
কিন্তু প-অ—প এবং অপ-অ এই দুটি আবর্তের মধ্যে প্রথম ও প্রধান যে বৈশিষ্ট্যটি লক্ষ্যণীয়, তা হচ্ছে দুটি পর্যায়ের বিপরীত পরম্পরা। সরল পণ্য সঞ্চলন শুরু হয় বিক্রয় দিয়ে, শেষ হয় ক্রয়ে আর, অন্য দিকে, মূলধন হিসেবে অর্থের সঞ্চলন শুরু হয় ক্রয় দিয়ে, শেষ হয় বিক্রয়ে। একটি ক্ষেত্রে যাত্রাবিন্দু এবং গন্তব্য বিন্দু দুই-ই হচ্ছে পণ্য, অন্য ক্ষেত্রটিতে, অর্থ। প্রথম রূপটিতে গতিক্রম সংঘটিত হয় অর্থের হস্তক্ষেপে, দ্বিতীয়টিতে পণ্যের।
