২৩. বাণিজ্যবাদী ব্যবস্থার বিবেচনায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের লক্ষ্য হচ্ছে সোনা ও রূপার সাহায্যে দেনা-পাওনার গরমিলের শোধবোধ, এই ব্যবস্থার প্রতিবাদীরা নিজেরা কিন্তু বিশ্বজনিক অর্থের কার্যাবলী সম্পর্কে সম্পূর্ণ ভুল ধারণা পোষণ করতেন। রিকার্ডোর দৃষ্টান্ত দিয়ে আমি দেখিয়েছি সঞ্চলনী মাধ্যমের পরিমাণ কি কি নিয়মের দ্বারা নিয়মিত হয় সেই সম্পর্কে তাদের ভ্রান্ত ধারণা মহার্ঘ ধাতুসমূহে আন্তর্জাতিক চলাচল সম্পর্কিত ধারণার মধ্যেও প্রতিফলিত হয়েছে। (.c. pp. 150 sq.) “বাড়তি মুদ্রা-সরবরাহ ছাড়া বাণিজ্যিক ভারসাম্য প্রতিকূল হয় না। মুদ্রার রপ্তানির কারণ তার মূল্য হ্রাস এবং এই রপ্তানি প্রতিকূল ভারসাম্যের ফল নয়, কারণ—তার এই ভ্রান্ত ধারণা বান-এর লেখায় আগেই দেখা যায়। বাণিজ্যিক ভারসাম্য বলে যদি কিছু থাকে, তা হলে তা দেশ থেকে অর্থ বাইরে পাঠিয়ে দেবার কারণ নয়; পরন্তু তা উদ্ভূত হয় প্রত্যেক দেশে ধাতু পিণ্ডের (সোনা বা রূপার মূল্যের পার্থক্য থেকে।” (N. Barbon, lc. pp. 59, 60 )। “The Literature of Political Economy, a classified catalogue, London, 1845-49 at 979 বানকে তার ভবিষ্যৎ দৃষ্টির জন্য প্রশংসা করেছেন, কিন্তু যেসব সাদামাটা আবরণে বার্বন তার মুদ্রানীতি’-র ভিত্তিস্থানীয় ধারণাটিকে আবৃত করেছেন, তাকে বিজ্ঞভাবে এড়িয়ে গিয়েছেন। ঐ ‘ক্যাটাগল’-এ সত্যকার সমালোচনার, এমনকি সততার কত অভাব, তার পরাকাষ্ঠা লক্ষ্য করা যায় অর্থের তত্ত্বের ইতিহাস-সংক্রান্ত পরিচ্ছেদগুলিতে। তার কারণ এই যে বইটির ঐ অংশে ম্যাককুলক লর্ড ওভারস্টোন-এর চাটুকারিতা করেছেন, যাকে তিনি অভিহিত করেছেন, ‘facile princeps argentariorum বলে।
২৪. দৃষ্টান্তস্বরূপ অনুদান, যুদ্ধ পরিচালনার জন্য ঋণ, নগদ টাকায় দাবি মেটানোর জন্য ব্যাংকের প্রয়োজন ইত্যাদির ক্ষেত্রে মূল্যের একমাত্র অর্থ-রূপেরই দরকার হয়, অন্য কোনো রূপেরই নয়।
২৫. ‘একটি বিধ্বংসী বৈদেশিক আক্রমণের আঘাতের পয়ে মাত্র সাতাশ মাসের মধ্যে যেমন অনায়াসে ফ্রান্স, তার অভ্যন্তরীণ মুদ্রাব্যবস্থায় লক্ষণীয় কোনো সংকোচন বা বিশৃংখল না ঘটিয়ে, এমনকি তার বিনিময়ে কোনো আশংকাজনক উত্থান-পতন না ঘটিয়ে, তার উপরে মিত্রশক্তির দ্বারা জোর করে চাপিয়ে দেওয়া প্রায় ২০ মিলিয়ন ক্ষতিপুরণ পরিশোধ করল, তাও আবার অনেকটাই ধাতু-মুদ্রায়, তার চেয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো সাহায্য ছাড়াই আন্তর্জাতিক লেনদেন মেটাবার প্রত্যেকটি প্রয়োজনীয় কার্য সম্পাদনে ধাতু-মুদ্রা-প্রদানকারী দেশগুলিতে মজুদ ব্যবস্থাটির সুদক্ষতার, অন্য কোনো জোরদার সাক্ষ্য আমি চাই না।” (Fullarton l.c p. 141. [ চতুর্থ জার্মান সংস্করণে সংঘোজিত : ১৮৭১-৭৩ সালে ফ্রান্স যেমন অনায় এই বাধ্যতামূলক ক্ষতিপূরণেরও ১০ গুণ বেশি ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করল, তাও আবার অনুরূপ ভাবে অনেকটাই ধাতু-মুদ্রায়, সেটাও একটা জাজ্জ্বল্যমান দৃষ্টান্ত হিসাবে উল্লেখ্য।
২৬. L’argent se partage entre les nations relativement au besoin qu’elles en ont…etant toujours attire par les prodactions. (Le Trosne L.c.p. 916) “যে খনিগুলি নিরন্তর সোনা ও রূপার যোগান দিচ্ছে, সেগুলি প্রত্যেকটি জাতিকেই তার এই প্রয়োজনীয় উদ্বত ধাতুপিণ্ড পর্যাপ্ত পরিমাণে সরবরাহ করে থাকে। (জে, ভ্যাণ্ডারলিন্ট, পৃঃ ৪০)।
২৭. প্রত্যেক সপ্তাহেই বিনিয়োগের বৃদ্ধি ও হ্রাস ঘটে এবং বিশেষ বছরের কিছু সময় একটি জাতির বিরুদ্ধে উৰ্দ্ধগতি ধারণ করে, আবার অন্য সময় বিপরীতগামীও হয়। ( এন, বারবন l.c, পৃঃ ৩৯)
২৮. যখনি সোনা ও রূপাকে ব্যাংক-নোট রূপান্তরনের তহবিল হিসাবে কাজ করতে হয়, তখনি এই নানাবিধ কাজগুলি পরস্পরের সঙ্গে বিপজ্জনক সংঘাতে আসে।
২৯. ‘অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের জন্য অবশ্য প্রয়োজন ছাড়া অর্থ ‘অকেজো তহবিল … যে দেশে তা থাকে, তাকে তা কোনো মুনাফা দেয়না। (John Bellers, ‘Essays, p. 13) যদি আমাদের অতিরিক্ত মুদ্রা থাকে, কি হয়? আমরা তাকে গলিয়ে তা দিয়ে সোনা বা রূপার পাত্র, বাসন ইত্যাদি বানাতে পারি অথবা যে দেশে তার দরকার পড়ে, সেখানে পণ্য হিসাবে পাঠাতে পারি কিংবা যেখানে সুদের হার বেশি, সেখানে খাটাতে পারি। (W. Petty : Quantulumcunque’, p. 39) অর্থ রাষ্ট্রদেহের চর্বি ছাড়া কিছু নয়, যার বাড়তি হলে তৎপরতা হ্রাস পায়, কমতি হলে অস্থতা দেখা যায়।……..চর্বি যেমন পেশীর গতিকে তৈলাক্ত করে, পুষ্টির ঘাটতি পুষিয়ে দেয়, অসমান কোষগুলিকে ভরাট করে রাখে এবং শরীরকে শ্ৰমণ্ডিত করে, ঠিক তেমনি অর্থ রাষ্ট্রের তৎপরতা বৃদ্ধি করে, স্বদেশে টান পড়লে বিদেশ থেকে রসদ নিয়ে এসে পুষ্টির সংস্থান করে, হিসেব-নিকেশ মিটিয়ে দেয় এবং সমগ্র ব্যবস্থাটিকে সুষমামণ্ডিত করে।” উইলিয়ম পেটি : Political Anatomy of Ireland P. 14.
০৪. মূলধনের জন্য সাধারণ সূত্র
দ্বিতীয় বিভাগ — অর্থের মূলধনে রূপান্তর
চতুর্থ অধ্যায় — মূলধনের জন্য সাধারণ সূত্র
মূলধনের যাত্রা শুরু হয় পণ্যদ্রব্যাদির সঞ্চলন থেকে। পণ্যের উৎপাদন, তাদের সঞ্চলন এবং বাণিজ্য নামে অভিহিত তাদের সঙ্কলনের অধিকতর বিকশিত রূপ এই ঘটনাগুলিই মূলধন উদ্ভবের ঐতিহাসিক ভিত্তিভূমি রচনা করে দেয়। যোড়শ শতকে যে বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য ও বিশ্বব্যাপী বাজারের সৃষ্টি হয়, তখন থেকেই মূলধনের আধুনিক ইতিহাসের সূচনা।
