যেমন অভ্যন্তরীণ সঞ্চলনের জন্য প্রত্যেক দেশেই অর্থের জমানো তহবিল ( ‘বিজার্ভ) থাকা আবশ্যক, ঠিক তেমনি দেশের বাইরেকার বাজারে সঞ্চলনের জন্যও তার থাকা আবশ্যক একটি ‘রিজার্ভ। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে অভ্যন্তরীণ সঞ্চলন ও দেনা-পাওনা নিরসনের মাধ্যম হিসেবে অর্থের যে ভূমিকা, অংশত সেই ভূমিকাটি থেকে, এবং বিশ্বের অর্থ হিসেবে অর্থের যে ভূমিকা, অংশত সেই ভূমিকাটি থেকেই মওজুদের ভূমিকার উদ্ভব।[২৫] দ্বিতীয়োক্ত ভূমিকাটির জন্য, সত্যকার অর্থ-পণ্য-সোনা ও রূপা-আবশ্যক। তাদের কি শুদ্ধ আঞ্চলিক রূপ থেকে তাদেরকে আলাদাভাবে বিশেষিত করার জন্য স্যার জেমস স্টুয়ার্ট সোনা ও রূপাকে নামকরণ; করেছেন বিশ্বের অর্থ” বলে।
সোনা ও রূপার স্রোতটি দ্বিমুখী। একদিকে, বিভিন্ন মাত্রায় সঞ্চলনের বিভিন্ন জাতীয় ক্ষেত্রগুলিতে আত্মভূত হবার উদ্দেশ্য, প্রচলনের নলগুলিকে ভরাট করবার উদ্দেশ্যে, ঘষা ও ক্ষয়ে-যাওয়া সোনা ও রূপার স্থান গ্রহণের উদ্দেশ্যে, বিলাস দ্রব্যটির উপাদান সরবরাহের উদ্দেশ্যে এবং মওজুদ হিসেবে শিলীভূত হবার উদ্দেশ্য তা তার উৎসমূহ থেকে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে।[২৬] এই প্রথম স্রোতটি শুরু হয় সেই দেশগুলি থেকে, যারা পণ্যসম্ভারে বাস্তবায়িত তাদের শ্রমকে বিনিময় করে সোনা ও রূপা উৎপাদনকারী দেশগুলির মাহার্ষ ধাতুসমূহে মূতিপ্রাপ্ত শ্রমের সঙ্গে। অন্যদিকে, সঞ্চলনের বিভিন্ন জাতীয় ক্ষেত্রফলগুলির মধ্যে, সামনের দিকে এবং পেছনের দিকে, নিরন্তর চলতে থাকে সোনা ও রূপার প্রবাহ-এমন একটা স্রোত যার গতি নিভর করে বিনিময়ের ঘটনাক্রমে অবিরাম ওঠা-নামার উপরে।[২৭]
যেসব দেশে বুর্জোয়া উৎপাদন-পদ্ধতি কিছু পরিমাণে বিকাশ লাভ করে, সে-সব দেশ, বিশেষ বিশেষ কাজের জন্য তাদের ব্যাংকগুলি ‘স্ট্রং-রুমে যে মওজুদ কেন্দ্রীভূত করে রাখে, তার পরিমাণ নূ্যনতম সীমায় বেঁধে রাখে।[২৮] যখনি এই মওজুদের পরিমাণ গড় মাত্রার বেশী উপরে উঠে যায়, তখনি অবশ্য, কয়েকটি বিরল ব্যতিক্রম বাদ দিয়ে, বোঝা যায় যে পণ্যের সঞ্চলনে অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে, তাদের রূপান্তরণের সাবলীল ধারায় বাধা সৃষ্টি হয়েছে।[২৯]
————
১. “Une richesse en argent n’est que……… richesse en produc tions, converties en argent” ( Mercier de la Riviere 1.c.) Une valeur en productions n’a fait que changer de former ( 1d., p. 486 )
২. “এই পদ্ধতির দ্বারাই তারা তাদের সমস্ত জিনিস ও শিল্পজাত দ্রব্যের এত নিচু হার বজায় রাখে।”–(Vanderlint lc. পৃঃ ৯৫, ৯৬)।
৩. অর্থ … একটি অঙ্গীকার” (John Bellers : *Essays about the poor, Manufactures, Trade, plantations, and Immorality- Lond:, 1699 পৃঃ ১৩)।
৪. “যথার্থ”-বিচারে ক্রয় মানে এই যে সোনা এবং রূপা ইতিমধ্যেই পণ্য দ্রব্যাদির পরিবর্তিত রূপ পরিগ্রহ করেছে, কিংবা তা পরিণত হয়েছে বিক্রয়ের ফলশ্রুতিতে।
৫. ফ্রান্সের খ্ৰীষ্টীয় রাজা তৃতীয় হেনরি গীর্জাগুলি থেকে প্রত্ন দ্রব্যাদি লুণ্ঠন করে সেগুলিকে অর্থে রূপান্তরিত করেন। ফোসিয়ানদের দ্বারা ডেলফিক টেম্পল লুণ্ঠন গ্রীসের ইতিহাসে কী ভূমিকা নিয়েছিল তা সুপরিজ্ঞাত। প্রাচীনদের কাছে মন্দিরগুলি ছিল পণ্য দেবতাদের বাসস্থান। সেগুলি ছিল পবিত্র ব্যাংক। ফিনীসীয়দের চোখে অর্থ ছিল সব কিছুর মুর্তায়িত রূপ। সুতরাং এতে অস্বাভাবিক কিছুই ছিল না যে প্রেমের দেবী’র মহোৎসবে কুমারী মেয়েরা যখন আগন্তুকদের কাছে দেহ সমর্পণ করত তখন তার বিনিময়ে প্রাপ্ত অর্থ তারা দেবীকে দক্ষিণ দিত।
৬. “সোনা, হলুদ চকচকে মহামূল্য সোনা!
তার এতটা কালোকে সাদা করে; মন্দকে ভালো;
অন্যায়কে ন্যায়; হীনকে মহান; বৃদ্ধকে তরুণ; ভীরুকে বীর।
… দেবতার, এটা কি, এটা কেন
যা পুরোহিত ও দাসদের তোমাদের পাশ থেকে টেনে নেয়;
শক্ত মানুষের বালিশ তার মাথার তলা থেকে কেড়ে নেয়।
এই হলদে গোলাম
ধর্মকে গড়ে এবং ভাঙে; ঘৃণাকে করে বরেণ্য
পলিত কুষ্ঠকে করে তোলে ইষ্ট; তস্করকে দেয় আসন।
দেয় উপাধি অবলম্বন ও মান্যতা,
দেয় প্রতীক্ষমান পরিষদবর্গ; এই সোনা
উদভ্রান্ত বিধবাকে করে বিবাহে উদ্বুদ্ধ :
…এসো হে অভিশপ্ত বসুধা,
যদিও নিখিল মানুষের বারবনিতা।
( শেকশিয়র, টাইমন অব এথেন্স)
৭. ‘শেষ ভোজ’-এ যীশু খ্ৰীষ্ট কর্তৃক ব্যবহৃত এবং পরবর্তীকালে ক্রুশবিদ্ধ যীশুর রক্ত ধারণের জন্য ব্যবহৃত পাত্র বাংলা অনুবাদক।
৮. “Accrescere quanto piu si puo il numero de’ venditori d’ogni: merce, diminuere quanto piu si puo il numero dei compratori questi sono i cardini sui quali is raggiran, tutte le operazioni di economia politica.–(Verri 1.c. p. 52)
৯. “কোন দেশের বাণিজ্য পরিচালনার জন্য একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হয়; ঘটনাবলীর দাবি অনুসারে তা কখনো বৃদ্ধি পায়, কখনো হ্রাস পায়। ……….অর্থের এই জোয়ার-ভাটা রাষ্ট্রনীতিকদের সাহায্য ছাড়াই নিজেকে ব্যবস্থিত করে নেয়। অর্থ যখন কম পড়ে, তখন ধাতুপিণ্ড মুদ্রায়িত হয় আর যখন তা বেশি হয়ে পড়ে, তখন মুদ্রা বিগলিত হয়ে ধাতুপিণ্ড হয়। ( ডি. নর্থ, ‘পোস্টস্ক্রিপ্ট’, পৃ: ৩)। জন স্টুয়ার্ট মিল, যিনি দীর্ঘকাল ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারী ছিলেন, জানান যে ভারতবর্ষে রূপার অলংকারাদি এখনো মওজুদ হিসাবে কাজ করে। যখন সুদের হার বেশি হয়, তখন রূপার অলংকারাদি বের করে আনা হয় এবং মুদ্রায়িত করা হয়; আবার যখন সুদের হার কমে যায়, তখন তা আবার যথাস্থানে ফিরে যায়। (জে এস মিল-এর সাক্ষ্য, ‘রিপোর্টস অন ব্যাংক অ্যাক্টস, ১৮৫৭, ২০৮৪)। ভারতের সোনা ও রূপার আমদানি-রপ্তানি সম্পর্কে ১৮৬৪ সালের একটি পার্লামেন্ট বিপোর্ট অনুসারে ১৮৬৩ সালে সোনা ও রূপার আমদানি রপ্তানির তুলনায় ১,৯৩,৭৬৪ বেশি ছিল। ১৮৬৪ সালের ঠিক আগেকার আট বছরে মূল্যবান ধাতুগুলির রপ্তানির তুলনায় আমদানির পরিমাণ বাড়িয়ে ছিল ৫১,৯৬,৫২,৯১৭ বেশি। এই শতাব্দীতে ২০,০০,০০,০০ পাউণ্ডের বেশি ভারতে মুদ্রায়িত হয়েছে।
