যখন পণ্যোৎপাদন যথেষ্ট ভাবে বিস্তার লাভ করেছে, তখন পণ্য সঞ্চনের। পরিধির বাইরেও অর্থ প্রদানের উপায় হিসেবে কাজ করতে শুরু করে। অর্থ তখন হয়ে ওঠে, সমস্ত চুক্তির যে বিশ্বজনিক বিষয়বস্তু, সেই বিষয়বস্তুটিতে, সেই পণ্যটিতে।[১৭] খাজনা, কর এবং এই ধরনের অন্যান্য সব প্রদান, দ্রব্য-রূপে প্রদান থেকে, রূপান্তরিত হয় অর্থ-রূপে প্রদানে। এই রূপান্তর কী পরিমাণে উৎপাদনের সাধারণ অবস্থাবলীর উপরে নির্ভর করে, তা বোঝা যায় যখন আমরা এই ঘটনাটির কথা স্মরণ করি যে নোম সাম্রাজ্য তার সমস্ত খাজনা, কর ইত্যাদি অর্থের অঙ্কে আদায় করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছিল। চতুর্দশ লুইয়ের আমলে ফরাসী দেশের কৃষিজীবী জনগণ যে অবর্ণনীয় দুর্দশার কবলে পড়েছিল—যে দুর্দশাকে বয়িস গিলবার্ট; মার্শাল ভবা প্রমুখ এত সোস্টারে নিন্দা করেছিলেন—সে দুর্দশার কারণ কেবল করের গুরুভারই নয়, সেই সঙ্গে তার কারণ ছিল দ্রব্যের অঙ্কে কর দানের ব্যবস্থাকে অর্থের অঙ্কে দেবার ব্যবস্থায় রূপান্তরণও।[১৮] অন্যদিকে রাশিয়ায় রাষ্ট্রের কর ইত্যাদি দিতে হত দ্রব্যের আকারে খাজনার মাধ্যমে—এই যে ঘটনা তা নির্ভর করত উৎপাদনের এমন সমস্ত অবস্থার উপরে যা প্রাকৃতিক ঘটনাবলীর নিয়মিকতার সঙ্গে ওতপ্রতভাবে সংঘটিত হত। আর এই প্রদান পদ্ধতির দরুণই প্রাচীন উৎপাদন-পদ্ধতি সেখানে টিকে থেকে যায়। অটোম্যান সাম্রাজ্যের দীর্ঘস্থায়িত্বের গোপন কারণগুলির মধ্যে এটা একটি। ইউরোপীয়রা জাপানের উপরে যে বৈদেশিক বাণিজ্য চাপিয়ে দিয়েছিল, তা যদি দ্রব্যের আকারে দেয় খাজনার বদলে অর্থের আকারে দেয় খাজনার প্রবর্তন ঘটাত, তা হলে সেখানকার দৃষ্টান্ত স্থানীয় কৃষিকার্যের অন্তিম কাল ঘনিয়ে আনত। যে-সংকীর্ণ অর্থনৈতিক অবস্থাবলীর মধ্যে সেই কৃষিকর্ম পরিচালিত হয়, তা ভেসে যেত।
প্রত্যেক দেশেই, বছরের কয়েকটি নির্দিষ্ট দিন অভ্যাসৰশে বড় বড় এবং পৌনঃ পুনিক দেনাপাওনা শোধবোধের দিন হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে যায়। পুনরুৎপাদনের চক্রটিতে অন্যান্য যেসব আবর্তন ঘটে, সেই সব আবর্তন ছাড়াও, এই তারিখগুলি প্রধানতঃ ভাবে নির্ভর করে ঋতু পরিবর্তনের সময়গুলির উপরে। কর, খাজনা ইত্যাদির মতো যেসব প্রদানের পণ্য সঞ্চলনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ কোনো সম্বন্ধ নেই, সেই সব প্রদানও নিয়মিত হয় এইসব ঋতুপরিবর্তনের সময়গুলির দ্বারা। সারা দেশ জুড়ে ঐ দিনগুলিতে যাবতীয় লেনদেনের শোধবধ করতে যে-পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হয় তার ফলে প্রদানের মাধ্যমটির ব্যবহার-পরিমিতি ক্ষেত্রে ঋতুক্রমিক ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়, যদিও তা ভাসা-ভাসা।[১৯]
প্রদানের উপায়টির প্রচলন-বেগের নিয়মটি থেকে আমরা পাই যে, নির্দিষ্ট সময় কাল অন্তর অন্তর যে-সব প্রদান সম্পন্ন করতে হয় তা তার কারণ যা-ই হোক না কেন-(বিপরীতে)[২০] তার জন্য যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন পড়ে, সেই পরিমাণটি সংশ্লিষ্ট সময়কালে দৈর্ঘ্যের সঙ্গে অনুপাতে সম্পর্কিত।[২১]
প্রদানের উপায় হিসেবে অর্থের পরিণতি লাভের ফলে প্রয়োজন হয় প্রদানের দিনগুলির জন্য অর্থ সঞ্চয় করে বৃখিবার। সভ্য সমাজের অগ্রগতি সঙ্গে সঙ্গে যখন বিত্ত অর্জনের স্বতন্ত্র পদ্ধতি হিসেবে মওজুদীকরণের তিরোধান ঘটে, তখন কিন্তু জমানো অর্থের তহবিল (রিজার্ভ) গড়ে তোেল’র প্রবণতা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়।
গ. বিশ্বজনিক অর্থ
অর্থ যখন সঞ্চলনের স্বদেশগত সীমানা অতিক্রম করে, সে তখন তার পরিহিত দাম-মান, মুদ্রা প্রতীক, মূল্য-প্রতিভূ ইত্যাদির স্বদেশী পোশাক-আশাক পরিত্যাগ করে এবং তার আদিরূপে-ধাতুপিণ্ডরূপে-প্রত্যাবর্তন করে। বিশ্বের বিভিন্ন বাজারের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যের, পণ্যদ্রব্যাদির মূল্য এমন ভাবে অভিব্যক্ত হয়, যাতে করে তা বিশ্বজনীন স্বীকৃতি পায়। সুতরাং, এই সব ক্ষেত্রে তাদের স্বতন্ত্র মূল্যরূপও বিশ্বজনীন অর্থের আকারে তাদের মুখোমুখি হয়। কেবল বিশ্বের বাজারগুলিতেই অর্থ পূর্ণ মাত্রায় সেই পণ্যটির রূপধারণ করে, যার দেহগত রূপ অমূর্ত মনুষ্যশ্রমের প্রত্যক্ষভাবে সামাজিক প্রমূর্তরূপ হিসেবে দেখা দেয়। এই আকারে তার বস্তুগত অস্তিত্ব ধারণের পদ্ধতিটি উপযুক্তভাবে তার ভাগবত ধারণাটির সঙ্গে সঙ্গতি লাভ করে।
স্বদেশের সঞ্চলন পরিধির মধ্যে, এমন একটি মাত্র পণ্যই থাকতে পারে, যা মূল্যের পরিমাপ হিসেবে কাজ করে, অর্থ হয়ে ওঠে। বিশ্বের বাজারে কিন্তু মূল্যের দ্বৈত মান গোচরে আসে—স্বর্ণ ও রৌপ্য।[২২]
বিশ্বের অর্থ কাজ করে প্রদানের বিশ্বজনীন মাধ্যম হিসেবে, ক্রয়ের বিশ্বজনীন উপায় হিসেবে এবং সমস্ত ধন-সম্পদের বিশ্বস্বীকৃত মূর্ত বিগ্রহ হিসাবে। এই জন্যই বাণিজ্য-বাদীদের মন্ত্র হয়ে ওঠে বাণিজ্যের ভারসাম্য (Balance of Trade)[২৩] যে-সব সময়ে বিভিন্ন জাতির উৎপন্ন দ্রব্যাদি আদান-প্রদানে প্রথাগত ভারসাম্য হঠাৎ ব্যাহত হয়, প্রধানতঃ ও আবশ্যিক ভাবে সে-সব সময়ে সোনা ও রূপা কাজ করে ক্রয়ের আন্তর্জাতিক উপায় হিসেবে। এবং সর্বশেষে, যখনি প্রশ্নটি দেখা দেয় ক্রয়ের ও বিক্রয়ের প্রশ্ন হিসেবে নয়, দেখা দেয় এক দেশ থেকে অন্য দেশে স্থানান্তরণের প্রশ্ন হিসেবে এবং যখনি ঘটনাচক্রে অথবা উদ্দিষ্ট লক্ষ্যের প্রয়োজনবশে পণ্যের আকারে স্থানান্তরণ হয়ে পড়ে অসম্ভব, তখনি বিশ্বের অর্থ কাজ করে সামাজিক ধনের বিশ্বস্বীকৃত বিগ্রহ হিসেবে।[২৪]
