অনেকগুলি বিক্রয় একই সময়ে এবং পাশাপাশি সংঘটিত হয়-এই যে ঘটনা, তা মুদ্রা কি মাত্রায় প্রচলন-বেগের দ্বারা প্রতিস্থাপিত হবে, সেটা নির্ধারণ করে দেয়। পক্ষান্তরে, এই ঘটনা প্রদানের উপায়টির ব্যবহার-সংকোচনের পক্ষে একটি সক্রিয় হেত, হিসেবে কাজ করে। যে অনুপাতে প্রদানের সংখ্যা একই স্থানে সংকেন্দ্রীভূত হয়, সেই অনুপাতে তাদের শোধবোধ ঘটাবার জন্য বিশেষ বিশেষ প্রতিষ্ঠানের উদ্ভব ঘটে। মধ্যযুগে ‘লায়ন্স-এ ‘vivenients’-গুলি এই রকমের প্রতিষ্ঠানই ছিল। ‘ক’-এর কাছে ‘খ’-এর যা দেনা, ‘খ’-এর কাছে ‘গ’-এর যা দেনা, ‘গ’-এর কাছে ‘ক’-এর যা দেনা ইত্যাদি ইত্যাদি এই রকমের আরো সব দেনাকে পরস্পরের মুখোমুখি হতে হবে যাতে করে ইতিবাচক রাশি এবং নেতিবাচক রাশি যেমন পরস্পরকে কাটাকাটি করে তেমনি এই দেনা-পাওনাগুলি পরস্পরের সোধবোধ করে দেয়। এইভাবে শেষ পর্যন্ত থেকে যায় প্রদানের মতো একটি মাত্র অঙ্ক। যত বেশী সংখ্যায় এই প্রদানের সংকেন্দ্রীভবন ঘটে আপেক্ষিক হিসেবে এই প্রদেয় অঙ্ক তত কম পরিমাণ হয় এবং সঞ্চলনে প্রদানের উপায়টির অঙ্কও তত কম পরিমাণ হয়।
প্রদানের উপায় হিসেবে অর্থের যে ভূমিকা তার মধ্যে নিহিত থাকে একটি নিরবশেষ দ্বন্দ্ব। যেখানে দেনা-পাওনার লেনদেন। পরস্পরের সমান হওয়া যায়, সেখানে অর্থ কাজ করে কেবল ভাবগত ভাবে হিসেব রাখার অর্থ হিসেবে, মূল্যের পরিমাপ হিসেবে। যেখানে কার্যতই অর্থ প্রদান করতে হবে, সেখানে কিন্তু অর্থ সখলনী মাধ্যম হিসেবে দ্রব্যাদির লেনদেনে ক্ষণকালীন প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করনা, যেখানে সে কাজ করে সামাজিক শ্রমের মূর্তরূপ হিসেবে, বিনিময়মূল্যের অস্তিত্বের স্বতন্ত্র রূপ হিসেবে, সর্বজনিক পণ্য হিসেবে। শিল্পগত ও বাণিজ্যগত সংকটসমূহের যেসব পর্যায়কে অর্থগত সংকট বলা হয়, সেইসব পর্যায়ে এই দ্বন্দ্ব চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে।[১২] এই ধরনের সংকট কেবল তখনি ঘটে যখন প্রদানের ক্রমদীর্ঘতর শেকলটি এবং তাদের শোধবোধের একটি কৃত্রিম ব্যবস্থা পরিপূর্ণ ভাবে বিকাশপ্রাপ্ত হয়েছে। যখনি এই প্রণালীটিতে কোনো সাধারণ ও ব্যাপক ব্যাঘাত ঘটেতা সে ব্যাঘাতের কারণ যাই হোক না কেন, তখনি অর্থ অকস্মাৎ ও অচিরাৎ তার নিছক হিসেবী অর্থের ভাবগত আকার থেকে রূপান্তরিত হয় নগদ টাকায়। অপবিত্র পণ্যসমূহ আর তার স্থলাভিষিক্ত হতে পারে না। পণ্যদ্রব্যাদির ব্যবহার মূল্য হয়ে পড়ে মূল্যহীন এবং তাদের নিজেদেরই স্বতন্ত্র রূপের সামনে তাদের মূল্য অন্তর্হিত হয়ে যায়। সংকটের প্রাক্কালে বুর্জোয়া, তার উন্মাদনাকর ঐশ্বর্য থেকে স্বয়ং সম্পূর্ণতার বলে ঘোষণা করে যে, অর্থ হচ্ছে একটি অলীক কল্পনা মাত্র। কেবল পণ্যই হচ্ছে অর্থ। কিন্তু আজ একই আওয়াজ শোনা যায় সর্বত্র : একমাত্র অর্থই হচ্ছে পণ্য। যেমন হরিণ ছুটে বেড়ায় জলের সন্ধানে, ঠিক তেমনি তার আত্মাও ছুটে বেড়ায় একমাত্র ধন যে-অর্থ সেই অর্থের সন্ধানে।[১৩] সংকটের কালে পণ্য এবং তার প্রতিপক্ষ মূল্যরূপ, তথা অর্থ, একটি চূড়ান্ত দ্বন্দ্বে উন্নীত হয়। এই জন্যই, এই ধরনের ঘটনাবলীতে, যে-রূপের অধীনে অর্থের আবির্ভাব ঘটে, তার কোনো গুরুত্ব নেই। দেনা-পাওনা সোনা দিয়েই মেটাতে হোক বা ব্যাংক নোটের মতো ক্রেডিট-অর্থে ই মেটাতে হোক, অর্থের দুর্ভিক্ষ চলতেই থাকে।[১৪]
এখন যদি আমরা একটি নির্দিষ্ট সময়কালে চালু অর্থের মোট যোগফল বিবেচনা করে দেখি আমরা দেখতে পাব যে, সঞ্চলনী মাধ্যমটির এবং প্রদানের উপায়টির প্রচলন বেগ যদি নির্দিষ্ট থাকে, তা হলে এই মোট যোগফল হবে : বাস্তবায়িতব্য দামসমূহের মোট যোগ দেয় প্রদানসমূহের মোট বিমোগ, পরস্পরের সঙ্গে সমান হয়ে যাওয়া দেনা পান্ন সমূহ, বিয়োগ সঞ্চলন ও প্রদানের উপায় হিসেবে পালাক্রমে একই মুদ্রাখণ্ড যতটা আবর্তকার্য সমাধা করে। অতএব, এমনকি যখন দাম, অর্থের প্রচলনবেগ এবং প্রদানের ক্ষেত্রে নিত্যব্যবহারের মাত্রা নিদিষ্টও থাকে, তখনো একটি নির্দিষ্ট সময়ে, যেমন একটি নির্দিষ্ট দিনে, চালু অর্থের পরিমাণ এবং পণ্যের পরিমাণ-এই দুয়ের মধ্যে আর কোনো সঙ্গতি থাকে না। যে-সমস্ত পণ্যকে অনেক আগেই বাজার থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে, সেই সব পণ্যের প্রতিনিধিত্ব করে যে-অর্থ, সেই অর্থ কিন্তু চালু থেকে যায়। এমন সব পণ্যও আবার চালু থেকে যায়, যাদের সমার্থরূপ যে অর্থ, একটি ভবিষ্যৎ দিবসের আগে তার দেখা পাওয়া যাবে না। অধিকন্তু, প্রতিদিন যে সমস্ত দেনা-পাওনার চুক্তি হচ্ছে, এবং একই দিনে যে-সমস্ত দেনা-পাওনার শোধবোধের তারিখ পড়েছে—এই দুটি রাশি সম্পূর্ণ অমেয়।[১৫]
প্রদানের উপায় হিসেবে অর্থের যে, ভূমিকা, তা থেকেই ক্রেডিট-অর্থের উদ্ভব ঘটে। ক্রীত পণ্যের জন্য পরিশোধ্য ঋণের ‘সার্টিফিকেট’গুলি অন্যান্যের কঁাধে স্থানান্তরিত হবার জন্য চালু থাকে। পক্ষান্তরে, যে-মাত্রায় ক্রেডিট-প্রথার বিস্তার ঘটে, সেই মাত্রাতেই প্রদানের উপায় হিসেবে অর্থের ভূমিকারও বিস্তার ঘটে। এই চরিত্র অভিনয় কালে অর্থ নানা স্ব-বিশিষ্ট রূপ পরিগ্রহ করে, যে সব রূপে বিরাট বিরাট বাণিত্ত্বিক লেনদেন তা অনায়াসে ভূমিকা নেয়। অন্যদিকে, সোনা ও রূপার মুদ্রাকে প্রধানতঃ ঠেলে দেওয়া হয় খুচরো ব্যবসার গণ্ডীতে।[১৬]
