ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতার চরিত্র এখানে সরল সঞ্চলনের ফলশ্রুতি মাত্র। উক্ত সঞ্চলনের রূপ পরিবর্তনই এখানে বিক্রেতা ও ক্রেতাকে নতুন রঙে রঞ্জিত করে। সুং গোড়ার দিকে এই নতুন ভূমিকাদুটি বিক্রেতা এবং ক্রেতার দ্বারা অভিনীত ভূমিকাদুটির মতই ক্ষণস্থায়ী এবং পরস্পর-পরবর্তী এবং পালাক্রমে একই অভিনেতাদের দ্বাৱা অভিনীত নয়। কিন্তু এক্ষেত্রে দুটি চরিত্রের অবস্থানের বৈপরীত্য আদৌ প্রীতিকর নয় এবং ঢের বেশী সংহতি-সক্ষম।[১০] অবশ্য, পণ্য-সঞ্চলন থেকে নিরপেক্ষ ভাবেও এই দুটি চরিত্র অভিনীত হতে পারে। প্রাচীন জগতের শ্রেণীসংগ্রামগুলি প্রধানতঃ এই ঋণগ্রহীতা এবং ঋণদাতাদের মধ্যে সংঘাতের আকারই পরিগ্রহ করত রোমে যার পরিণতি ঘটল প্লীবীয় ঋণগ্রহীতাদের সর্বনাশে। তারা ক্রীতদাসের দ্বারা স্থানচ্যুত হল। মধ্যযুগে এই সংঘাত সমাপ্ত হল সামন্ততান্ত্রিক ঋণগ্রহীতাদের সর্বনাশে; তারা দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতাও হারালো এবং সেই ক্ষমতার অর্থ নৈতিক ক্ষমতা, তা-ও হারালো। যাই হোক না কেন, ঐ দুই যুগে ঋণগ্রহীতা ও ঋণদাতা—এই দুয়ের মধ্যে যে অর্থ-সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল, তা ছিল কেবল সংশ্লিষ্ট শ্রেণীদুটির অস্তিত্বের সাধারণ অর্থ নৈতিক অবস্থাবলীর মধ্যে গভীরতর বিরোধেরই প্রতিফলন।
আবার পণ্যসঞ্চলনের ব্যাপারটিতে ফিরে যাওয়া যাক। পণ্য এবং অর্থ—এই দুটি সমার্ঘ সামগ্রীর দুই মেরুতে আবির্ভাব এখন যুগপৎ ঘটা থেকে বিরত হয়েছে। অর্থ এখন কাজ করে প্রথমত, বিক্রীত পণ্যের দাম নির্ধারণে মূল্যের পরিমাপ হিসেবে, চুক্তির মাধ্যমে স্থিরীকৃত দাম পরিমাপ করে দেনাদারের বাধ্যবাধকতা তথা একটি নির্দিষ্ট তারিখে সে যে-পরিমাণ অর্থ দিতে বাধ্য থাকবে তার পরিমাণ। দ্বিতীয়ত, অর্থ কাজ করে ক্রয়ের হিসেবে ভাবগত উপায়ে। যদিও তার অস্তিত্ব থাকে কেবল ক্রেতা কতৃক প্রদানের অঙ্গীকারের মধ্যেই, তবু তারই বলে ঘটে পণ্যের হাতবদল। প্রদানের জন্য যে তারিখটি ধার্থ থাকে, তার আগে অর্থ কার্বতঃ সঞ্চলনে প্রবেশ করেনা, বিক্রেতার হাতে যাবার জন্য ক্রেতার হাত পরিত্যাগ করেন। সঞ্চলনশীল মাধ্যমটি পরিণত হয়েছিল মওজুদে, কেননা প্রথম পর্যায়ের পরেই প্রক্রিয়াটি মাঝ পথেই থেমে গিয়েছিল, কেননা পণ্যের রূপান্তরিত আকারটিকে অর্থাৎ অর্থকে সঞ্চলন থেকে তুলে নেওয়া হয়েছিল। প্রদানের উপায়টি সঞ্চলনে প্রবেশ করে, কিন্তু তা করে কেবল তখনি যখন পণ্যটি সেখান থেকে প্রস্থান করেছে। অর্থ নামক উপায়টির মাধ্যমে প্রক্রিয়াটি আর সংঘটিত হয় না। বিনিময় মূল্যের অস্তিত্বের অনপেক্ষ রূপ হিসেবে কিংবা বিশ্বজনিক পণ্য হিসেবে পদক্ষেপ করে অর্থ কেবল উক্ত প্রক্রিয়াটির পরিসমাপ্তি ঘটায়। কোন-না-কোন অভাব পরিতৃপ্ত করবার জন্য বিক্রেতা তার পণ্যকে অর্থে পরিণত করেছিল; পণ্যকে অর্থের আকারে রক্ষা করবার জন্য মওজুদদারও ঐ একই কাজ করেছিল। এবং দেনাদারও তার দেনাপরিশোধের জন্য করেছিল সেই একই কাজ, কেননা সে যদি পরিশোধ না করে তা হলে শেরিফ তার দ্রব্যসামগ্রী বিক্রয় করে দেবে। এখন বিক্রয়ের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য কেবল পণ্যের মূল্যরূপ অর্থাৎ অর্থ; স্বয়ং সঞ্চলন-প্রক্রিয়া থেকে উদ্ভূত একটি সামাজিক প্রয়োজনের তাগিদেই এই পরিণতি।
পণ্যকে অর্থে পরিবর্তিত করার আগে ক্রেতা অর্থকে পুনরায় পণ্যে পরিবর্তিত করে, অন্যভাবে বলা যায়, প্রথম রূপান্তরণটির আগেই সে দ্বিতীয় রূপান্তরণটি ঘটিয়ে ফেলে। বিক্রেতার পণ্য সঙ্কলিত হয় এবং তার দামকে বাস্তবায়িত করে কিন্তু তা করে কেবল অর্থের উপরে একটি আইনগত দাবির আকারেই। অর্থে রূপান্তরিত হবার আগে তা রূপান্তরিত হয় ব্যবহার মূল্যে। তার প্রথম রূপান্তরণের সম্পূৰ্ণায়ন ঘটে কেবল পরবর্তী কোনো সময়ে।[১১]
একটি নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে যে সমস্ত বাধ্যবাধকতা পরিপূরণীয় হয়ে ওঠে, সেগুলি পণ্যদ্রব্যাদির দামসমূহের যোগফলের প্রতিনিধিত্ব করে; এই পণ্যদ্রব্যাদির বিক্রয় থেকেই ঐসব বাধ্যবাধকতার উদ্ভব ঘটেছিল। এই মোট দামকে বাস্তবায়িত করতে যে-পরিমাণ সোনার প্রয়োজন তা নির্ভর করে, প্রথমত, প্রদানের উপায়টির সঞ্চলন-বেগের উপরে। এই পরিমাণ দুটি ঘটনার দ্বারা শায়িত : প্রথমত, দেনাদার আর পাওনাদারদের মধ্যকার সম্পর্কসমূহ এমন একটি শেকল রচনা করে যে যখন ‘ক’ তার দেনাদার ‘খ’-এর কাছে থেকে অর্থ পায়, তখন সে তা সোজাসুজি তুলে দেয় তার পাওনাদার ‘গ’-এর হাতে, ইত্যাদি ইত্যাদি। দ্বিতীয়, ঘটনাটি হল বাধ্যবাধকতাসমূহ পরিপুরণের বিভিন্ন দিনের মধ্যে কালগত ব্যবধান। প্রদানের নিরবচ্ছিন্ন ধারা কিংবা ব্যাহত গতি প্রথম রূপান্তরণসমূহের নিরবচ্ছিন্ন ধারা মূলতঃ রূপান্তরণ ক্রমসমূহের পারস্পরিক গ্রস্থিবন্ধন থেকে—যে পারস্পরিক গ্রন্থিবন্ধন সম্পর্কে আমরা এর আগে আলোচনা করেছি—তা থেকে বিভিন্ন। সঞ্চলনশীল মাধ্যমের দ্বারা ক্রেতাদের এবং বিক্রেতাদের মধ্যে যে সম্পর্ক তা কেবল অভিব্যক্তই . সলতের দ্বারাই এই সম্পর্কের উদ্ভব সংঘটিত হয় এবং সঞ্চলনের মধ্যেই এই সম্পর্ক অস্তিত্ব ধারণ করে। প্রতিতুলনাগত ভাবে, প্রদানের উপায়টির গতিশীলতা অভিব্যক্ত করে একটি সামাজিক সম্পর্ক—দীর্ঘকাল আগেই যার অস্তিত্ব ছিল।
