আমরা এখানে কেবল অরূপান্তরণীয় কাগুজে নোটের কথাই উল্লেখ করছি—যা রাষ্ট্রের দ্বারা ছাড়া হয় এবং বাধ্যতামূলক ভাবে চালু থাকে। ধাতব মুদ্রা থেকেই তার প্রত্যক্ষ উৎপত্তি। পক্ষান্তরে ক্রেডিট-এর উপরে প্রতিষ্ঠিত যে অর্থ তা এমন সমস্ত অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত, যা পণ্যদ্রব্যাদির সরল সঞ্চলনের দৃষ্টিকোণ থেকে এখনো আমাদের কাছে পুরোপুরি অপরিজ্ঞাত। কিন্তু এখানে আমরা এ পর্যন্ত বলতে পারি যে, যেমন সঞ্চলনের মাধ্যম হিসেবে অর্থের ভূমিকায় সত্যকার কাগুজে নোটের উদ্ভব ঘটে ঠিক তেমনি ক্রেডিট এর উপরে প্রতিষ্ঠিত অর্থেরও স্বতঃস্ফুত ভাবে উদ্ভব ঘটে পরিপ্রদানের উপায় হিসেবে অর্থের ভূমিকায়।[১৮]
রাষ্ট্র টুকরো টুকরো কাপজ চালু করে; সেই সব টুকরো কাগজগুলিতে ছাপিয়ে দেওয়া হয় বিভিন্ন মুদ্রাংক যেমন £১, ৫৫, ইত্যাদি ইত্যাদি। যতদূর পর্যন্ত এই টুকরো বা কাগজগুলি কার্যক্ষেত্রে একই পরিমাণের সোনার স্থান গ্রহণ কবে, তত দূর পর্যন্ত তাদের চলাচল, স্বয়ং অর্থের প্রচলন যে সব নিয়মের দ্বারা নিয়মিত হয়, সেই সব নিয়মেরই অধীন থাক। ঐ কাগুকে অর্থ যে অনুপাতে সোনার প্রতিনিধিত্ব করে, কেবল সেই অনুপাত থেকেই কাগুজে অর্থের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রযোজ্য কোন নিমের উদ্ভব ঘটতে পারে। এমন একটি নিয়ম রয়েছে, সহজ ভাবে বললে সেই নিয়মটি এই প্রতীকের দ্বারা স্থানচ্যুত না হলে যে-পরিমাণ সোনা বা রূপ) বস্তুতই সঞ্চলনে থাকে, কাগুজে অর্থের ‘ইসু্য অবশ্যই সেই পরিমাণের বেশি হবে না। এখন, সঞ্চলন যে-পরিমাণ সোনাকে আত্মভূত করে, তা নিরন্তর একটি বিশেষ মাত্রার। কাছাকাছি ওঠা-নামা করে। তবু কোন দেশে সঞ্চলন-মাধ্যমটির মোট পরিমাণ বখনো একটি নূ্যনতম মাত্রার নীচে নেমে যায় না-যে নূ্যনতম মাত্রাটি অভিজ্ঞতার সাহায্যে সহজেই নির্ণয় করা যায়। এই ন্যূনতম পরিমাণটির অন্তর্গত এককগুলিতে যে নিরন্তর পরিবর্তন ঘটে কিংবা সোনার টুকরোগুলি যে নতুন নতুন টুকরো দিয়ে। স্থানচ্যুত হয়—এই ঘটনা কিন্তু সঞ্চলনের পরিমাণে বা নিরবচ্ছিন্নতায় কোন পরিবর্তন ঘটায় না। সুতরাং তার বদলে কাগুজে প্রতীক চালু করা যায়। পক্ষান্তরে, সঞ্চলনের সমস্ত কয়টি নলই যদি তাদের আত্মভূত করার পূর্ণ ক্ষমতার শেষ সীমা পর্যন্ত কাগুজে অর্থে ভরাট করে দেওয়া হত, তা হলে আগামীকাল পণ্য-সঞ্চলনে পরিবর্তনের ফলে সেগুলি উপচে পড়তে পারত। সেক্ষেত্রে আর কোনো মানেরই অস্তিত্ব থাকত না। কাগুজে অর্থের যথােচিত সীমা হচ্ছে একই মুদ্রাংকের স্বর্ণ মুদ্রার সেই পরিমাণ যা সঞ্চলনে চালু হতে পারে; কাগুজে অর্থ যদি তার যথােচিত সীমা ছাড়িয়ে যায় তা হলে যে কেবল সর্বসাধারণের আস্থা হারাবার বিপদে পড়বে তা-ই নয়, তা হলে তা প্রতিনিধিত্ব করবে কেবল সেই পরিমাণ সোনার পণ্য সঞ্চলনের নিয়মাবলী অনুযায়ী যে-পরিমাণটুকুর প্রয়োজন হবে এবং কেবল যে-পরিমাণটুকুই কাগজের প্রতিনিধিত্বের আওতায় আসতে পারে। যদি যতটা ছাড়া উচিত তার দ্বিগুণ কাগুজে অর্থ ছাড়া হয়, তা হলে বাস্তব ক্ষেত্রে ৫১ পাউণ্ড আর ৪ ভাগ আউন্স পরিমাণ সোনার অর্থ নাম থাকবে না, তা পরিণত হবে ৮ ভাগ আউন্স পরিমাণ সোনার অর্থনামে। দামের মান। হিসেবে সোনার ভূমিকার অদলবদল হলে যে ফল হত, এক্ষেত্রেও সেই ফলই হবে। অতীতে যে মূল্য অভিব্যক্ত হত ৪১ পাউণ্ড দামের দ্বারা, এখন তা অভিব্যক্ত হবে ৫২ পাউণ্ড দামের দ্বারা।
কাগুজে অর্থ হচ্ছে সোনা বা অর্থের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতীক মাত্র। এর সঙ্গে পণ্যমূল্যের সম্পর্ক এই পণ্যমূল্য ভাবগত ভাবে অভিব্যক্ত হয় একই পরিমাণ সোনার অঙ্কে যা প্রতীকগত ভাবে অভিব্যক্ত হয় কাগজের অঙ্কে। যে পর্যন্ত কাজে অর্থ সোনার প্রতিনিধিত্ব করে, যার অন্যান্য সব পণ্যেব মতই আছে মূল্য, সেই পর্ষন্তই কাগুজে মুদ্রা হচ্ছে মূল্যের প্রতীক।[১৯]
সর্বশেষে কেউ কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, যেসব প্রতীকের নিজেদের কোনো মূল্য নেই, সেই সব প্রতীক কিভাবে সোনার স্থান গ্রহণ করে? কিন্তু যে কথা আমরা আগেই বলেছি, এই সব প্রতীক কেবল ততটা পর্যন্তই সোনার স্থান গ্রহণ করতে পারে, যতটা পর্যন্ত তা একান্ত ভাবেই মুদ্রা হিসেবে কিংবা সঞ্চলনী মাধ্যম হিসেবে কাজ করে, অন্য কোনো হিসেবে নয়। এখন, এ কাজটি ছাড়াও অর্থের আবে। অনেক কাজ আছে এবং নিছক সঞ্চলনী মাধ্যম হিসেবে কাজ করার বিচ্ছিন্ন ভূমিকাটিই স্বর্ণমুদ্রার সঙ্গে আবশ্যিক ভাবেই সংলগ্ন একমাত্র ভূমিকা নয় -যদিও ঘষায় ঘষয ক্ষয়ে যাওয়া যে মুদ্রাগুলি চানু থাকে, সেগুলির ক্ষেত্রে এটাই হচ্ছে একমাত্র ভূমিকা। যতক্ষণ পর্যন্ত তা চালু থাকে ততক্ষণ পর্যন্তই প্রত্যেকটি মুদ্রা কেবল মুদ্র বা সঞ্চলনী মাধ্যম। কিন্তু এটা কেবল সেই ন্যূনতম পরিমাণ সোনর ক্ষেত্রেই সত্য যার স্থান কাগজ গ্রহণ করতে পারে। সেই ন্যূনতম পরিমাণটি নিরন্তর সঞ্চলনের পরিধির মধ্যেই থাকে, নিরন্তর সঞ্চলনী মাধ্যম হিসেবেই কাজ করতে থাকে, এবং একান্ত ভাবে সেই কাজেই ব্যস্ত থাকে। অতএব, তার গতিক্রম প—অপ রূপান্তরনটির বিপরীত পর্যায়গুলির-যে-পর্যায়গুলিতে পণ্যেরা তাদের মূলরূপসমূহের মুখোমুখি হয় কেবল অচিরাং অন্তর্হিত হয়ে যাবার জন্যই–সেই পর্যায়গুলির অব্যাহত পরম্পরা ছাড়া আর কিছুই প্রতিনিধিত্ব কবে না। এক্ষেত্রে একটি পণ্যের বিনিময়-মূল্যে নিরপেক্ষ অস্তিত্ব একটি ক্ষণস্থায়ী কায়াভাস মাত্র যায় মাধ্যমে পণ্যটি অচিরাৎ অন্য একটি পণ্যের দ্বারা স্থানচ্যুত হয়। অতএব, এই যে প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে অর্থ এক হাত থেকে অন্য হাতে অপসারিত হয়, এই প্রক্রিয়ায় অর্থের নিছক প্রতীকী অস্তিত্বই যথেষ্ট। বলা যায় যে তার কার্যগত অস্তিত্ব তার বস্তুগত অস্তিত্বকে আত্মভৃত করে ফেলে। পণ্যের দামের ক্ষণস্থায়ী এবং বিষয়গত প্রতিক্ষেপণ হবার দরুন, এ কেবল কাজ করে নিজের প্রতীক হিসেবে এবং সেই কারণেই সে স্থানচ্যুত হতে পারে একটি প্রতীকের দ্বারা।[২০] অবশ্য একটি জিনিস আবশ্যিক; এই প্রতীকটির অবশ্যই থাকতে হবে নিজস্ব একটি বিষয়গত সামাজিক সিদ্ধতা এবং এটা এই কাগুজে অর্থ অর্জন করে তার বাধ্যতামূলক প্রচলনের বলে। রাষ্ট্রের এই বাধ্যতামূলক ব্যবস্থাটি কার্যকরী হতে পারে কেবল সঞ্চলনের সেই আভ্যন্তরিণ পরিধির মধ্যে যা তার রাষ্ট্রিক সীমানার সঙ্গে সমবিস্তৃত এবং কেবল এই মধ্যেই অর্থ সঞ্চলনী মাধ্যম হিসেবে তার ভূমিকা পরিপূর্ণভাবে পালন করে অথবা মুদ্রা হিসেবে কাজ করে।
