যেমন, সাধারণভাবে বললে, অর্থের প্রচলন পণ্যদ্রব্যটির সঞ্চলন কিংবা তাদের বিপরীতধর্মী রূপান্তরণসমূহের একটি প্রতিক্ষেপণ ছাড়া আর কিছুই নয়, তেমনি অর্থ প্রচলনের গতিবেগ পণ্যদ্রবাদির স্থানবদলের দ্রুতত। এক প্রস্ত রূপান্তরণের আরেক প্রস্থ রূপান্তরণের সঙ্গে অব্যাহত গ্রন্থিবদ্ধতা, বস্তুর ক্ষিপ্রগতি সামাজিক আন্তঃপরিবর্তন, সঞ্চলনের ক্ষেত্র থেকে পণ্যদ্রব্যাদির দ্রুত অন্তর্ধান এবং সমান দ্রুততার সঙ্গে নতুন নতুন পণ্যদ্রব্যের দ্বারা তাদের স্থানগ্ৰহণ ইত্যাদির প্রতিফলন ছাড়া আর কিছুই নয়। সুতরাং অর্থ প্রচলনের গতিবেগের মধ্যে আমরা পাচ্ছি বিপরীতমুখী অথচ পরিপূরক পর্যায়গুলির স্বচ্ছন্দ ঐক্য, পণ্যদ্রব্যাদির উপযোগ গত দিকের মূল্যগত দিকে রূপ পরিবর্তনের, এবং তাদের মূল্যগত দিকের পুনঃ উপযোগগত দিকে রূপ-পরিবর্তনের স্বচ্ছন্দ ঐক্য, কিংবা বিক্রয় ও ক্রয়ের দুটি প্রক্রিয়ার ঐক্য। অন্যদিকে, অর্থ-প্রচলনের গতিবেগে ব্যাহতাবস্থা প্রতিফলিত করে এই দুটি প্রক্রিয়ার বিচ্ছিন্ন বিপরীতধর্মী পর্যায়সমূহে পৃথগীভবন, প্রতিফলিত করে বস্তুর রূপ-পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এবং অতএব সামাজিক লেনদেনের ক্ষেত্রেও, অচলাবস্থা। খোদ সঞ্চলন থেকেই অবশ্য এই অচলাবস্থার কি কাৰ্বণ তার কোনো হদিশই পাওয়া যায় না; সঞ্চলন কেবল ব্যাপারটাকে গোচরীভূতই করে। জনসাধারণ, যারা অর্থের প্রচলনবেগের ব্যাহতা বস্থার সঙ্গে সঙ্গেই যুগপৎ প্রত্যক্ষ করে সঞ্চলনের পরিধিমধ্যে অর্থের আবিভাব ও তিরোভাবের গতিমস্থরতা, তারা স্বভাবতই এই ব্যাহতাবস্থার জন্য দায়ী করে সঙ্কলনী মাধ্যমটির পরিমাণগত স্বল্পতাকে।[১২]
একটি নির্দিষ্ট সময়কালে সঞ্চলনশীল মাধ্যম হিসেবে কার্যরত অর্থের মোট পরিমাণ নির্ধারিত হয়, এক দিকে, সঞ্চলনশীল পণ্যদ্রব্যাদির মোট দামের দ্বারা এবং অন্য দিকে, কত দ্রুততার সঙ্গে রূপান্তরণসমূহের বিপরীতধর্মী পর্যায়গুলি একে অপরকে অনুসরণ করে, তার দ্বারা। এই দ্রুততার উপরে নির্ভর করে মোট দামের কত অনুপাতকে প্রত্যেকটি মুদ্রার দ্বারা গড়ে বাস্তবায়িত করা যায়। কিন্তু সঞ্চলনশীল পণ্যসমূহের মোট দাম নির্ভর করে ঐ পণ্যগুলির পরিমাণ এবং সেই সঙ্গে সেগুলির দামসমূহেও উপরে। অবশ্য, দামসমূহের পরিস্থিতি, সঞ্চলনশীল পণ্যগুলির পরিমাণ এবং অর্থের প্রচলন-বেগ-এই তিনটি বিষয়ই হচ্ছে অস্থিতিশীল। সুতরাং, বাস্তবায়িতব্য দামগুলির যোগফল এবং কাজে কাজেই, ঐ যোগফলের উপরে নির্ভরশীল সঞ্চলনশীল মাধ্যমটির পরিমানও পরিবর্তিত হবে এই উপাদান-ত্রয়ীর অসংখ্য পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে। এইসব পরিবর্তনের মধ্যে আমরা কেবল সেই পরিবর্তনগুলি নিয়েই আলোচনা। করব; দামের ইতিহাসে যে-পরিবর্তনগুলি গ্রহণ করেছে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
দাগসমূহ যখন স্থির থাকে, তখন সঞ্চলনশীল পণ্যদ্রব্যাদির বৃদ্ধি প্রাপ্তির ফলে কিংবা অর্থের প্রচলন-বেগের হ্রাসপ্রাপ্তির ফলে কিংবা এই দুইয়েরই সম্মিলিত ক্রিয়ার ফলে সঞ্চলনশীল মাধ্যমটির পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে পারে। অন্যদিকে, পণ্যদ্রব্যাদির সংখ্যা হ্রাসপ্রাপ্তির ফলে কিংবা তাদের সঞ্চলন বৃদ্ধি প্রাপ্তির ফলে সঞ্চলনশীল মাধ্যমটির পরিমাণ হ্রাস পেতে পারে।
পণ্যদ্রব্যাদির দামসমূহের সাধারণ বৃদ্ধিপ্রাপ্তি ঘটলেও সঞ্চলনশীল মাধ্যমটির পরিমাণ স্থিতিশীলই থাকবে—যদি পণ্য সংখ্যা স্থির থেকে দাম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সঞ্চলনশীল পণ্যদ্রব্যাদির সংখ্যা অনুপাতিক ভাবে হ্রাস পায় কিংবা দাম যে হারে বৃদ্ধি পায়, অর্থেব প্রচলন-বেগও সেই হারে বৃদ্ধি পায়। দাম বৃদ্ধির তুলনায় পণ্য সংখ্যা দ্রুততর ভাবে হ্রাস পেলে কিংবা অর্থের প্রচলন-বেগ দ্রুততর ভাবে বৃদ্ধি পেলে সঞ্চলনশীল মাধ্যমটির পরিমাণ হ্রাস পেতে পারে।
পণ্যদ্রব্যদির দামসমূহের সাধারণ হ্রাসপ্রাপ্তি ঘটলেও সঞ্চলনশীল মাধ্যমটির পরিমাণ স্থিতিশীলই থাকবে-যদি দাম হ্রাসের সঙ্গে সমান অনুপাতে পণ্যের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। কিংবা ঐ একই অনুপাতে অর্থের প্রচলন-বেগ হ্রাস পায়। সঞ্চলনশীল মাধ্যমটির পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে–যদি দাম হ্রাস পাবার তুলনায় দ্রুততর ভবে পণ্যের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় কিংবা সঞ্চলনের গতিশীলতা দ্রুততর ভাবে হ্রাস পায়।
বিভিন্ন উপাদানের হ্রাসবৃদ্ধি পরস্পরকে নিরপেক্ষ করে দিতে পারে, যার ফলে তাদের নিরন্তর অস্থিতিশীলতা সত্ত্বেও, বাবায়িতব্য দামগুলির ঘোগফল এবং সঞ্চলনশীল অর্থের পরিমাণ স্থির থাকতে পারে; অতএব, বিশেষ করে যদি আমরা দীর্ঘ সময়কালের কথা বিবেচনা করি, তা হলে আমরা দেখতে পাই যে কোন দেশে অর্থের পরিমাণের গড় মাত্রা থেকে বিচ্যুতি আমাদের প্রাথমিক অনুমান থেকে অনেক অল্পতর — অবশ্য কিছুকাল অন্তর অন্তর শিল্পগত ও বাণিজ্যগত সংকটজনিত যে প্রচণ্ড আথালি-পাথালি দেখা দেয় কিংবা আরো কম ঘন ঘন অর্থের মূল্যে যে ওঠানামা ঘটে থাকে তা এ ক্ষেত্রে ধরা হয় নি।
সঞ্চলনশীল মাধ্যমটির পরিমাণ নির্ধারিত হয় সঞ্চলনশীল পণ্যগুলির দামসমূহের যোগফল এবং অর্থ-প্রচলনের গড় গতিবেগ[১৩] দ্বারা-এই যে নিয়ম, এটিকে এই ভাবেও বিবৃত করা যায় : পণ্যসমূহের মূল্যগুলি এবং তাদের রূপান্তরণসমূহের গড় গতিশীলতা নির্দিষ্ট থাকলে, অর্থ প্রচলিত মহার্ঘ ধাতুটির পরিমাণ নির্ভর করে ঐ মহার্ঘ ধাতুটিরই মূল্যের উপরে। দামসমূহই নির্ধারিত হয় সঞ্চলনশীল মাধ্যমটির পরিমাণের দ্বারা এবং সঞ্চলনশীল মাধ্যমটির পরিমাণ নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট দেশের মহার্ঘ ধাতুগুলির পরিমাপের উপরে[১৪]–এই যে ভ্রান্ত মত, এর প্রবক্তারা একে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন এই অসম্ভব প্রকল্পের উপরে যে যখন তারা প্রথম সঞ্চলনে প্রবেশ করে তখন পণ্যদ্রব্যাদির কোন দাম থাকে না এবং অর্থেরও থাকে না কোন মূল্য এবং একবার সঞ্চলনে প্রবেশ করার পরেই কেবল পণ্যসম্ভারের একটি আঙ্গেয় অংশ বিনিমিত হয় মহার্ঘ ধাতুপের একটি আঙ্গেয় অংশের সঙ্গে।[১৫]
