এটা ধরে নিলে আমরা দেখি যে সঞ্চলনের মাধ্যমের পরিমাণ নির্ধারিত হয় বাস্তবায়িতব্য দামসমূহের যোগফলের দ্বারা। এখন যদি আমরা আরো একটু ধরে নিই যে, প্রত্যেকটি পণ্যের দামই নির্দিষ্ট, তা হলে এটা পরিষ্কার যে দামসমূহের যোগফল নির্ভর করে সঞ্চলনের অন্তর্গত পণ্যসমূহের মোট সম্ভারের উপরে। এটা বুঝতে খুব বেশী মাথা ঘামানোর দরকার পড়েনা যে এক কোয়ার্টার গমের জন্য যদি খরচ লাগে £২, তা হলে ১০০ কোয়ার্টার গমের জন্য খরচ লাগবে £২০০ এবং ২০০ কোয়ার্টারের জন্য £৪ ০ ০ ইত্যাদি ইত্যাদি আর এই কারণেই গম বিক্রীত হলে যে পরিমাণ অর্থ স্থানান্তরিত হয় তা-ও বিক্রীত গমের পরিমাণে বৃদ্ধিপ্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধি পায়।
যদি পণ্যের মোট সম্ভার স্থির থাকে, তা হলে সঞ্চলনশীল অর্থের পরিমাণ পরিবর্তিত হয় ঐ পণ্যগুলির দামসমূহে হ্রাসবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে। দাম পরিবর্তনের ফলে দামসমূহের যোগফল বৃদ্ধি বা হ্রাস পেলে সঞ্চলনশীল অর্থের পরিমাণেও বৃদ্ধি বা হ্রাস ঘটে। এই পরিণতি ঘটাবার জন্য এটা মোটেই আবশ্যিক নয় যে, সব পণ্যের সব দামই একই সঙ্গে বৃদ্ধি বা হ্রাস পেতে হবে। কিছু কিছু প্রধান প্রধান সামগ্রীর দাম বৃদ্ধি বা হ্রাস ঘটাই সমস্ত পণ্যের দামের যোগফল, এক ক্ষেত্রে, বৃদ্ধি এবং অন্য ক্ষেত্রে, হ্রাস ঘটাবার পক্ষে যথেষ্ট এবং সেই কারণেই বেশী বা কম পরিমাণ অর্থ সঞ্চলনশীল করার পক্ষে যথেষ্ট। পণ্যদ্রব্যাদির মুল্যে বস্তুতঃই যে পরিবর্তন ঘটে, দামের পরিবর্তন তার অনুরূপই হোক কিংবা দামের পরিবর্তন কেবল বাজারদামের ওঠা-নামার ফলশ্রুতিই হোক, সঞ্চলনের মাধ্যমের পরিমাণের উপর তার ফল একই হয়।
ধরে নেওয়া যাক যে নিম্নলিখিত জিনিসগুলি বিভিন্ন এলাকায় যুগপৎ বিক্রয় করা হবে কিংবা অংশত রূপান্তরিত হবে : ১ কোয়ার্টার গম, ২০ গজ ছট কাপড, একখানা বাইবেল এবং ৪ গ্যালন মদ। যদি প্রত্যেকটি জিনিসেরই দাম হয় ২ পাউণ্ড করে এবং ফুলতঃ, বাস্তবায়িতব্য মোট দাম হয় ৮ পাউণ্ড, তা হলে এটা পরিষ্কার যে অর্থে অঙ্কে ৮ পাউণ্ড সঞ্চলনে যাবে। পক্ষান্তরে, এই একই জিনিসগুলি যদি নিম্নলিখিত রূপান্তরণ শৃংখলের মধ্যে এক-একটি করে গ্রন্থিস্বরূপ হয় : ১ কোয়ার্টার গম-২ পাউণ্ড-২০ গজ ছিটকাপড়-২ পাউণ্ড-বাইবেল-২ পাউণ্ড-৪ গ্যালন মদ-২ পাউণ্ড, তা হলে ঐ পাউণ্ড দুটির বিভিন্ন পণ্যের একের পর এক সঞ্চলন ঘটায় এবং পর্যায়ক্রমে তাদের দামগুলিকে তথ। ঐ দামগুলির যোগফলকে তথা ৮ পাউকে বাস্তবায়িত করাবার পরে অবশেষে মদ-বিক্রেতার পকেটে এসে বিরাম লাভ করে। দেখা যাচ্ছে £২ (দুটি পাউণ্ড) চার বার নড়ল। অর্থের একই খণ্ডগুলির এই যে বারংবার স্থান-পরিবর্তন তা পণ্য দ্রব্যাদির দু’বার রূপ পরিবর্তনের—সঞ্চলনের দুটি পর্যায়ের মারফৎ বিপরীত দিকে তাদের গতির—এবং বিভিন্ন পণ্য-দ্রব্যের রূপান্তরণসমূহের মধ্যেকার গ্রন্থিবন্ধনের—অনুষঙ্গী।[১১] এই যে বিপরীতমুখী অথচ পরস্পর পরিপূরক পর্যায়সমূহ—রূপান্তরণের প্রক্রিয়াটি যেগুলি দিয়ে গঠিত সেগুলি যুগপৎ অতিক্রান্ত হয় না—অতিক্রান্ত হয় পরম্পরাক্রমে। সুতরাং সমগ্ৰ ক্ৰমটির সম্পূৰ্ণায়নের জন্য সময় লাগে। সেই জন্যই অর্থের প্রচলন-বেগ পরিমাপ করা হয় একটি অখণ্ড একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কতবার স্থান বদল করেছে তার সংখ্যা দিয়ে। ধরুন, ৪টি জিনিসের সঞ্চলনে লাগে একটি দিন। ঐ দিনটিতে বাস্তবায়িত করতে হবে ৮ পাউণ্ড পরিমাণ মোট দাম, দুটি অর্থখণ্ডের স্থানবদলের সংখ্যা হচ্ছে চার এবং সঞ্চলুনে চলনশীল অর্থ হচ্ছে ২ পাউণ্ড। সুতরাং সঞ্চলন চলাকালীন একটি নির্দিষ্ট সময়কালের জন্য আমরা পাই নিম্নলিখিত সম্পর্কটি : সঞ্চলন-মাধ্যম হিসেবে কার্যরত অর্থের পরিমাণ = পণ্যদ্রব্যগুলির দামসমূহের যোগফল : একই নামের মুদ্রাসমূহের স্থান বদলের সংখ্যা। সাধারণ ভাবে এই নিয়মটি সত্য।
একটি নির্দিষ্ট দেশে একটি নির্দিষ্ট সময়ে পণ্যসমূহের মোট সঞ্চলন একদিকে গঠিত হয় অসংখ্য বিচ্ছিন্ন ও যুগপৎ-সংঘটিত আংশিক রূপান্তরণসমূহের দ্বারা, বিক্রয় যা একই সঙ্গে আবার ক্রয় তার দ্বারা, যাতে প্রত্যেকটি মুদ্রা কেবল একবার করেই স্থান বদল করে; অন্যদিকে গঠিত হয় রূপান্তরণের অসংখ্য স্বতন্ত্র ক্রমের দ্বারা, যেগুলি অংশত চলে পাশাপাশি, অংশত পরস্পরের সঙ্গে মেশামিশি, যেগুলির প্রত্যেকটি ক্রমে প্রত্যেকটি মুদ্রা কয়েকবার স্থান-বদল করে, অবস্থানুযায়ী স্থানবদলের সংখ্যা কখনো হয় বেশী, কখনো কম। একই নামের সমস্ত সঞ্চলনশীল মুদ্রার স্থানবদলের সংখ্যাকে নির্দিষ্ট ধরে নিলে, আমরা ঐ দামীয় একটি মুদ্রার স্থানবদলের গড় সংখ্যা বা অর্থের প্রচলন বেগের গড় হার বের করতে পারি। প্রত্যেক দিনের শুরুতে যে-পরিমাণ অর্থ সঞ্চলনে নিক্ষিপ্ত হয়, তা অবশ্য নির্ধারিত হয় একই সঙ্গে পাশাপাশি সঞ্চলনশীল সমস্ত পণ্যের দামসমূহের যোগফলের দ্বারা। কিন্তু একবার সঞ্চলনে নামলে তারপরে, বলা যায় যে, মুদ্রাগুলি হয় পরস্পরের জন্য দায়িত্বশীল। একটি মুদ্রা যদি তার প্রচলন বেগ বৃদ্ধি করে, তা হলে অন্যটি হয় তার নিজের প্রচলন-বেগ হ্রাস করে অথবা একেবারেই সঞ্চলনের বাইরে চলে যায়। কেননা সঞ্চলনে কেবল সেই পরিমাণ সোনাই আত্মভূত হতে পারে যা, একটি মাত্র মুদ্রা বা উপাদানের স্থানবদলের সংখ্যার গড়ের দ্বারা বিভক্ত হলে, হবে বাস্তবায়িতব্য মোট দামের সমান। সুতরাং আলাদা আলাদা খণ্ডগুলির স্থানবদলের সংখ্যা যদি বৃদ্ধি পায়, তা হলে সঞ্চলনশীল ঐ খণ্ডগুলির মোট সংখ্যা হ্রাস পায়। যদি স্থানবদলের সংখ্যা হ্রাস পায়, তা হলে খণ্ডগুলির মোট সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। যেহেতু সঞ্চলনে যত অর্থ আত্মভূত হতে পারে তার পরিমাণ একটি নির্দিষ্ট গড় প্রচলন বেগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট, সেই হেতু সঞ্চলন থেকে একটি নির্দিষ্টসংখ্যক ‘সভরিনকে নিস্কষিত করতে হলে যা আবশ্যক তা হচ্ছে একই সংখ্যক এক পাউণ্ডের নোট সঞ্চলনে নক্ষেপ করা, এ কৌশলটা সব ব্যাংক-ব্যবসায়ীর কাছেই সুবিদিত।
