অধিকন্তু, অর্থের মধ্যে পণ্যদ্রব্যাদির মূল্য সমূহের স্বতন্ত্র বাস্তবতা আছে বলেই অর্থ কাজ করে সঞ্চলনের উপায় হিসেবে। সুতরাং সঞ্চলনের মাধ্যম হিসেবে তার যে গতি কম তা আসলে নিজ নিজ রূপ পরিবর্তনে নিরত পণ্যদ্রব্যাদিরই গতিক্রম মাত্র। এই ঘটনা অবশ্যই অর্থের চলাচল প্রক্রিয়ায় নিজেকে দৃশ্যমান করে তুলবে। যেমন* ছিট কাপড় সর্বপ্রথমে তার পণ্যরূপকে পরিবর্তিত করে অর্থরূপে। তার প্রথম রূপান্তরণে দ্বিতীয় পর্যায়টি প-ম, তথা অর্থরূপটি তারপরে পরিণত হয় তার চূড়ান্ত রূপান্তরণের প্রথম পর্যায়ে, তথা বাইবেল-এ তার পুনঃ-রূপ-পরিবর্তনে। কিন্তু এই দুটি রূপ-পরিবর্তনে প্রত্যেকটিই সম্পাদিত হয় পণ্য এবং অর্থের মধ্যে বিনিময়ের দ্বারা, তাদের পারস্পরিক স্থানচ্যুতির দ্বারা। একই মুদ্রাগুলি বিক্রেতার হাতে আসে উক্ত পণ্যের পরকীকৃত রূপ হিসেবে এবং তাকে পরিত্যাগ করে পণ্যটির চুড়ান্ত ভাবে পরকীকরণীয় রূপ হিসেবে। তার স্থানচ্যুতি হয় দুবার। ছিটকাপড়ের প্রথম রূপান্তরণে ফলে ঐ মুদ্রাগুলি যায় তন্তুবায়ের পকেটে, দ্বিতীয় রূপান্তরণের ফলে সেগুলির নিম্ফান্তি ঘটে সেখান থেকে। একই পণ্যের এই দুটি বিপরীতমুখী পরিবর্তন প্রতিফলিত হয় একই মুদ্রসমূহের দুবার, কিন্তু বিপরীত দিকে, পুনরাবৃত্ত স্থানচ্যুতিতে।
[* এখানে (যেমন ছিট কাপড় থেকে সাধারণভাবে পণ্য” পৃঃ ৯১) চতুর্থ জার্মান সংস্করণের সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষা কবে ইংরেজি সংস্করণে পরিবতিত করা হয়েছে।]
পক্ষান্তরে যদি রূপান্তরণের কেবল একটিমাত্র পর্যায় অতিক্রান্ত হয়, যদি কেবলমাত্র বিক্রয় কিংবা কেবলমাত্র ক্রয়ই সংঘটিত হয়, তা হলে একটি নিদিষ্ট মুদ্রা কেবল একবার মাত্রই তার স্থান পরিবর্তন করে। তার দ্বিতীয় স্থান পরিবর্তন সর্বদাই প্রকাশ করে পণ্যটির দ্বিতীয় রূপান্তরণ, অর্থ থেকে তার পুনঃপরিবর্তন। একই পণ্যসমূহের স্থানচ্যুতির ঘন ঘন পুনরাবৃত্তি কেবল যে একটি পণ্য যে রূপান্তরণ ক্রমের মধ্য দিয়ে অতিক্রান্ত হয়েছে তাই প্রতিফলিত করে, তা-ই নয়, তা সাধারণভাবে পণ্যজগতের অসংখ্য রূপান্তরণের পারস্পরিক গ্রন্থিবন্ধনকেও প্রতিফলিত করে থাকে। এ কথা বলা বাহুল্য যে, এই সমস্ত কিছুই প্রযোজ্য কেবল পণ্যদ্রব্যাদির সরল সঞ্চলনের ক্ষেত্রে–বর্তমানে যে-রূপটি আমরা আলোচনা করছি একমাত্র তারই ক্ষেত্রে।
পণ্যমাত্রই যখন প্রথম সঞ্চলনে প্রবেশ করে এর প্রথম পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে, তখন সে তা করে আবার সঞ্চলনের বাইরে চলে যাওয়ার জন্য, এবং অন্যান্য পণ্যদ্রব্যের দ্বারা স্থানচ্যুত হবার জন্য। পক্ষান্তরে সঞ্চলনের মাধ্যম হিসেবে অর্থ কিন্তু নিরন্তর সঞ্চলনের পরিধির মধ্যেই থাকে এবং এই পরিধির মধ্যেই ঘোরাফেরা করে। সুতরাং প্রশ্ন দেখা দেয়, কী পরিমাণ অর্থ এই পরিধির মধ্যে নিরন্তর আত্মভূত হয়?
কোন একটি দেশে প্রতিদিনই একই সময়ে কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে পণ্যদ্রব্যাদির অগণিত একপেশে রূপান্তরণ ঘটে, অর্থাৎ, অগণিত বিক্রয় ও ক্রয় সংঘটিত হয়। কল্পনায় আগেভাগেই পণ্যদ্রব্যগুলি বিশেষ বিশেষ পরিমাণ অর্থের সঙ্গে সমীকৃত হয়। এবং যেহেতু, বর্তমানে আলোচনাধীন সঞ্চলন-রূপটিতে, অর্থ এবং পণ্যদ্রব্যাদি সর্বদাই সশরীরে পরস্পরের মুখোমুখি হয়, একটি হয় ক্রয়ের ইতিবাচক মেরুটি থেকে আর অন্যটি বিক্রয়ের নেতিবাচক মেরুটি থেকে, সেইহেতু এটা স্পষ্ট যে সঞ্চলনের কত পরিমাণ উপায়ের দরকার হবে, সেটা আগেভাগেই নির্ধারিত হয়ে যায় সংশ্লিষ্ট সমস্ত পণ্যদ্রব্য যোগফলের দ্বারা। বস্তুতঃ, অর্থ সেই পরিমাণ বা সেই অঙ্ক সোনারই প্রতিনিধিত্ব করে, যা আগে ভাগেই ভাবগত ভাবে পণ্যদ্রব্যাদির দামসমূহের যোগফলের মধ্যে প্রকাশ পেয়ে যায়। সুতরাং এইদুটি পরিমাণের সমতা স্বতঃস্পষ্ট। আমরা অবশ্য জানি যে পণ্যাদির মূল্যসমূহ যদি স্থির থাকে, তা হলে তাদের দামগুলি সোনার (অর্থের বস্তুগত উপাদানের) মূল্যের পরিবর্তনের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়ে যায়—সোনার মূল্য যে হারে বাড়ে পণ্যের দাম সে হারে কমে, সোনার মূল্য যে হারে কমে পণ্যের দাম সে হারে বাড়ে। এখন, সোনার মূল্যে এই ধরনের ওঠা-নামার ফলে, পণ্যদ্রব্যগুলির দাম-সমূহের যোগফলে নামা-ওঠা ঘটে, তাহলে সঞ্চলনে প্রয়োজনীয় অর্থের সেই হারে নামা-ঠা ঘটবে। এটা সত্য যে, এক্ষেত্রে সঞ্চলন-মাধ্যমের পরিমাণে এই যে পরিবর্তন তা সংঘটিত হয় স্বয়ং অর্থের দ্বারাই—কিন্তু এটা যে ঘটে তা তার সঞ্চলন-মাধ্যম হিসেবে যে ভূমিকা তার গুণে নয়, ঘটে মূল্যের পরিমাপ হিসেবে তার যে ভূমিকা তার গুণে। প্রথমতঃ, পণ্যের দাম অর্থের মূল্যের বিপরীত দিকে পরিবর্তিত হয় আর অন্য দিকে সঞ্চলন মাধ্যমের পরিমাণ পণ্যের দামের সঙ্গে পরিবর্তিত হয় সরাসরি ভাবে একই দিকে। ঠিক এই একই জিনিস ঘটত, যদি, ধর! যাক, সোনার মূল্যে হ্রাস না ঘটে সোনার আসল মূল্যের পরিমাপ হিসেবে রূপার প্রতিষ্ঠা ঘটত, কিংবা যদি রূপার মূল্য বৃদ্ধি না পেয়ে সোনা রূপাকে মূল্যের পরিমাপের আসন থেকে উৎখাত করে দিতে পারত। একটি ক্ষেত্রে, আগেকার চালু সোনার পরিমাণ থেকে অধিকতর পরিমাণ রূপা হত; অন্য ক্ষেত্রে, আগেকার চালু রূপার পরিমাণ থেকে অল্পতর পরিমাণ সোনা চালু হত। উভয় ক্ষেত্রেই অর্থের বস্তুগত উপাদানটির অর্থাৎ যে-পণ্যটি মূল্যের পরিমাপ হিসেবে কাজ করে, সেই পণ্যটির মূল্যে পরিবর্তন ঘটত এবং সেই কারণেই যে-সব পণ্য নিজেদের মূল্য অর্থের অঙ্কে প্রকাশ করে সেই সব পণ্যের দামগুলিও পরিবর্তিত হত, পরিবর্তিত হত চালু অর্থের পরিমাণও যায় কাজই হচ্ছে ঐ দামগুলিকে বাস্তবায়িত করা। আমরা আগেই দেখেছি যে সঞ্চলনের পরিধির মধ্যে একটা ফাক আছে যার ভিতর দিয়ে সোনা (কিংবা সাধারণভাবে অর্থের বস্তুগত উপাদান। তার মধ্যে প্রবেশ করে একটা নির্দিষ্ট মূল্যের পণ্য হিসেবে। সুতরাং অর্থ যখন মূল্যের পরিমাপ হিসেবে তার কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করে, যখন সে বিবিধ দাম প্রকাশ করে, তখন তার মূল্য ইতিমধ্যেই নির্ধারিত হয়ে গিয়েছে। এখন যদি তার মূল্য পড়ে যায়, তা হলে এই ঘটনা প্রথম প্রতিফলিত হয় সেই সব পণ্যের দাম পরিবর্তনের মধ্যে যেসব পণ্য মহার্ঘ ধাতুগুলির সঙ্গে সরাসরি পণ্য-বিনিময় প্রথায় বিনিমিত হয় সেই সব ধাতুর উৎপাদনের উৎসস্থলেই। অন্যান্য পণ্যসামগ্রীর বৃহত্তর অংশ দীর্ঘকাল ধরে হিসেব করা হতে থাকে মূল্য পরিমাপের পূর্বতন প্রাচীন ও অলীক মূল্য রূপের দ্বারা বিশেষ করে সেই সব সমাজে যেগুলি রয়ে গিয়েছে সভ্যতার নিম্নতর বিভিন্ন পর্যায়ে। যাই হোক একটি পণ্য অন্য পণ্যকে তাদের অভিন্ন মূল্য-সম্পর্কের মাধ্যমে সংক্রামিত করে, যাতে করে তাদের সোনায় বা রূপায় প্রকাশিত দামগুলি ক্রমে ক্রমে তাদের আপেক্ষিক মূল্যের দ্বারা নির্ধারিত বিভিন্ন নির্দিষ্ট অনুপাতে স্থিতি লাভ করে—যে পর্যন্ত না সমস্ত পণ্যের মূল্যসমূহ চূড়ান্ত ভাবে অর্থরূপী ধাতুর নতুন মূল্যের অঙ্কে নির্ধারিত না হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘটে মহার্ঘ ধাতুসমূহের পরিমাণে নিরন্তর বৃদ্ধি; এই বৃদ্ধি ঘটে, তার কারণ মহার্ঘ ধাতুগুলির উৎপাদনের উৎস সমূহেই দ্রব্য-বিনিময় প্রথা অনুসারে তাদের সঙ্গে বহুবিধ জিনিসের যে প্রত্যক্ষ বিনিময় ঘটে থাকে, তারই দরুন উক্ত জিনিস গুলির জায়গায় ক্রমাগত ঐ ধাতুগুলির স্থানগ্রহণের ক্রমিক ফলশ্রুতি। অতএব যে অনুপাতে পণ্যদ্রব্যাদি সাধারণ ভাবে তাদের সত্যকার দাম অর্জন করে, যে-অনুপাতে তাদের মূল্য মহার্ঘ ধাতুটির হ্রাস মূল্যের হিসেবে নিরূপিত হয়, সেই অনুপাতেই ঐ নতুন দামগুলি বাস্তবায়িত করার জন্য ধাতুটির প্রয়োজনীয় পরিমাণেরও সংস্থান করা হয়। সোনা ও রূপার নতুন নতুন সরবরাহের আবিষ্কারের একদেশ-দশী পর্যবেক্ষণের ফলে সপ্তদশ শতকের এবং বিশেষ করে অষ্টাদশ শতকের কোন কোন অর্থনীতিবিদ এই মিথ্যা সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন যে, সঞ্চলনের উপায় হিসেবে সোনা ও রূপার পরিমাণে বৃদ্ধিপ্রাপ্তির ফলেই পণ্যদ্রব্যাদির দাম বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়েছিল। এখন থেকে সোনার মূল্যকে নির্দিষ্ট ধরে নিয়েই আমরা আলোচনায় এগোব; আর তা ছাড়া, বাস্তবিক পক্ষে, যখনি আমরা কোন পণ্যের দাম হিসেব করি সোনার মূল্য, অস্থায়ী ভাবে হলেও, নির্দিষ্টই থাকে।
