.
খ. অর্থের চলাচল*
প-অ-প-এর রূপ পরিবর্তনের ফলে, অর্থাৎ যার দ্বারা শ্ৰমজাত বস্তুগত দ্রব্যাদির সঞ্চলন সংঘটিত হয়, তার রূপ পরিবর্তনের ফলে প্রয়োজন হয়ে পড়ে যে কোন একটি পণ্যের আকারে একটি নির্দিষ্ট মূল্য উক্ত প্রক্রিয়াটির সূচনা করবে এবং আবার, একটি পণ্যের আকারেই তার সমাপ্তি ঘটাবে। অতএব, একটি পণ্যের গতিক্রম হচ্ছে একটি আবর্তস্বরূপ। অন্যদিকে, এই গতিক্রমের রূপই এই রকম যে অর্থ এই আবর্ত সংঘটিত করতে পারে না। এর ফলে অর্থের প্রত্যাবর্তন ঘটে না, যা ঘটে তা হচ্ছে তার যাত্রাবি থেকে ক্রমেই আরো আরো দূরে তার অপসারণ। যতক্ষণ পর্যন্ত বিক্রেতা তার অর্থের সঙ্গে শক্তভাবে লেগে থাকে—যে অর্থ তার পণ্যেরই রূপ পরিবর্তিত আকার, ততক্ষণ পর্যন্ত উক্ত পণ্যটি তার রূপান্তরণের প্রথম পর্যায়েই থেকে যায়—সে তখন তার গতিপথের কেবল অর্ধেকটা পর্যন্ত পৌঁছেছে। কিন্তু যে-মুহূর্তে সে ঐ প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণায়িত করে ফেলে, যে মুহূর্তে সে তার বিক্রয়টিকে একটি ক্রয়ের দ্বারা অনুপুরণ করে, সেই মুহূর্তেই ঐ অর্থ তার হাত থেকে বেহাত হয়ে যায়। এ কথা সত্য যে আমাদের তন্তুবায় বন্ধুটি যদি বাইবেলখানা কেনার পরে আরো ছিটকাপড় বিক্রয় করে, তা হলে তার অর্থ ফিরে আসে। কিন্তু অর্থের এই যে ফিরে আসাটা তা কিন্তু প্রথম ২০ গজ ছিটকাপড়ের সঞ্চলনের দরুণ নয়; ঐ সঞ্চলনের দরুণ নয়; ঐ সঞ্চলনের ফলে তো অর্থ চলে গিয়েছিল ঐ বাইবেলখানার বিক্রেতার হাতে। তন্তুবায় ব্যক্তিটির হাতে অর্থের প্রত্যাবর্তন সংঘটিত হয় কেবল তখনি, যখন একটি নতুন পণ্যের সঙ্গে সঞ্চলন-প্রক্রিয়ার পুননবায়ন বা পুনরাবর্তন ঘটে—যে পুনবায়িত প্রক্রিয়াটিরও তার পূর্ববর্তী প্রক্রিয়াটির মতো একই পরিণতিতে সমাপ্তি ঘটে। অত এব, পণ্যদ্রব্যাদির সঞ্চলনের দ্বারা যে গতি অর্থে সঞ্চারিত হয়, তা তাকে—এক পণ্য মালিকের হাত থেকে আরেক পণ্য-মালিকের হাতে যাবার যে গতিপথ, সেই গতিপথে —তার যাত্রাবিন্দু থেকে ক্রমাগত দূর থেকে আরো দূরে সরিয়ে নেবার একটি নিরন্তর গতির রূপ ধারণ করে। এই গতিপথই হচ্ছে তার চলাচলের পথক্ৰম (Cours de la monnaie)।
[* ইংরেজি অনুবাদকের টাকা-উপশিরোনাম : শব্দটি এখানে ব্যবহার করা হয়েছে তার মূল অর্থে-হাত থেকে হাতে যাবার জন্য অর্থ যে পথ অনুসরণ করে, সেটি বোঝাবার উদ্দেশ্য; এ পথটি কিন্তু সঞ্চলন থেকে ভিন্নতর।]
অর্থের চলাচল হচ্ছে একই প্রক্রিয়ার নিরন্তর ও একঘেয়ে পুনরাবৃত্তি। পণ্য সব সমযেই থাকে বিক্রেতার হাতে আর ক্রয়ের উপায় হিসেবে অর্থ সব সময়েই থাকে। ক্রেতার হাতে। আর অর্থ যে ক্রয়ের উপায় হিসেবে কাজ করে, তা করে ঐ পণ্যটির দামকে বাস্তবায়িত করেই। বাস্তবায়নের ফলে পণ্যটি বিক্রেতার হাত থেকে ক্রেতার হাতে স্থানান্তরিত হয়, এবং সেই সঙ্গে ক্রেতার হাতের অর্থও বিক্রেতার হাতে স্থানান্তরিত হয়; সেখানে আবার তা আরেকটি পণ্যের সঙ্গে একই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অতিক্রান্ত হয়। অর্থের গতির এই যে একপেশে চরিত্র তার উদ্ভব ঘটে পণ্যের গতির একপেশে চরিত্র থেকেই কিন্তু এই ঘটনাটি থাকে অবগুণ্ঠিত। পণ্য-সঞ্চলনের নিজস্ব প্রকৃতি থেকেই, তার বিপরীত আকৃতির উদ্ভব ঘটে। একটি পণ্যের প্রথম রূপান্তরণ যে কেবল অর্থের গতিক্রমেই লক্ষ্য করা যায়, তা-ই নয়; খোদ পণ্যটির গতিক্রমেও তা লক্ষ্য করা যায়। পক্ষান্তরে দ্বিতীয় রূপান্তরণে গতিক্রমটি আমাদের কাছে দেখা দেয় একমাত্র অর্থেরই গতিক্রম হিসেবে। পণ্য সঞ্চলনের প্রথম পর্যায়ে অর্থের সঙ্গে পণ্যেরও স্থানান্তর ঘটে। তার পরে, উপযোগপূর্ণ সামগ্রী হিসেবে পণ্যটি সঞ্চলন থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে পৰিভভাগের অন্তর্গত হয়।[৯] তার জায়গায় আমরা পাই তার মূল্য-অকার—অর্থ। তার পরে পণ্যটি প্রবেশ করে তার সঞ্চলনের দ্বিতীয় পর্যায়ে নিজের স্বাভাবিক আকারে নয়, অর্থের আকারে। সুতরাং গতির নিরন্তর রক্ষিত হয় একমাত্র অর্থের দ্বারাই এবং যে গতিক্ৰম পণ্যের বেলায় আত্মপ্রকাশ করে একটি বিপরীতমুখী চরিত্রের দুটি প্রক্রিয়া হিসেবে, সেই একই গতিক্রম অর্থের বেলায় আত্মপ্রকাশ করে নিত্য নতুন পণ্যের সমাগমে স্থান থেকে স্থানান্তরে পরিবর্তনের একটি নিরন্তর ধারার মতো। সুতরাং পণ্য-সঞ্চলনের ফলে এক পণ্যের পরিবর্তে অন্য পণ্যের স্থলাভিষেকের আকারে যে ফলশ্রুতি সংঘটিত হয়, তা এমন একটি আকার ধারণ করে যে মনে হয় যেন পণ্যের রূপ-পরিবর্তনের মাধ্যমে তা ঘটেনি, বরং তা ঘটেছে সঞ্চলনের মাধ্যম হিসেবে অর্থ যে কাজ করে তারই মাধ্যমে, এমন একটি ক্রিয়ার মাধ্যমে যা আপাতদৃষ্টিতে গতিহীন পণ্যদ্রবাদিকে সঞ্চলিত করে এবং যে সব মানুষের কাছে তাদের কোন ব্যবহার-মূল্য নেই সেই সব মানুষের হাত থেকে তাদের স্থানান্তরিত করে এমন সব মানুষের হাতে যাদের কাছে তাদের ব্যবহার-মূল্য আছে এবং সঞ্চলিত করে এমন একটি দিকে যা অর্থের দিকের বিপরীতমুখী। অর্থ নিরন্তর পণ্য দ্রব্যাদিকে সঞ্চলন থেকে তুলে নিচ্ছে এবং তাদের জায়গায় নিজে এসে দাড়াচ্ছে এবং এই ভাবে সে নিরন্তর তার যাত্রাবিন্দু থেকে দূরে সরে সরে যাচ্ছে। অতএব যদিও অর্থের গতিক্রম পণ্য-সঞ্চলনের গতিক্রমেরই অভিব্যক্তি, তা হলেও যেন বিপরীতটাই ঘটনা হিসেবে প্রতীয়মান হয়; মনে হয় যেন পণ্যের সঞ্চলনই হচ্ছে অর্থের গতিক্রমের ফলশ্রুতি।[১০]
