আবত গঠনকারী এই যে দুটি আকার পরিবর্তন তা আবার একই সময়ে অন্য দুটি পণ্যের দুটি বিপরীতমুখী আংশিক রূপান্তরণ। এক ও অভিন্ন একটি পণ্য, এখানে ছিট-কাপড়, খুলে দেয় তার রূপান্তরণ-সমূহের একটি পর্যায়ক্রমে এবং পূর্ণ করে দেয় আরেকটি পণ্যের এখানে গমের রূপান্তরণ। প্রথম পর্যায়ে তথা বিক্রয়ে। ছিট-কাপড় তার নিজের ব্যক্তিরূপেই এই দুটি ভূমিকা পালন করে থাকে। কিন্তু তারপর সোনায় পরিবর্তিত হয়ে সে তার নিজের দ্বিতীয় এবং চূড়ান্ত রূপান্তরণ সম্পূর্ণায়িত করে এবং সেই সঙ্গে তৃতীয় আরেকটি পণ্যের প্রথম রূপান্তরণে সাহায্য করে। অতএব, নিজের ভিন্ন ভিন্ন রূপান্তরণের গতিপথে একটি পণ্য যে আবর্ত সৃষ্টি করে তা অন্যান্য পণ্যের আবর্তসমূহের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে ভাবে জড়িত। এই সমস্ত ও বিভিন্ন আবর্তের মোট যোগফলই হচ্ছে পণ্যসমূহের সঞ্চলন।
দ্রব্যের বদলে দ্রব্যের প্রত্যক্ষ লেনদেন ( দ্রব্য-বিনিময়) ব্যবস্থা থেকে পণ্য সঞ্চলন ব্যবস্থা কেবল বহিঃরূপের দিক থেকেই নয় অন্তর্বস্তুর দিক থেকেও ভিন্নতর। ঘটনাবলীর গতিধারাটাই বিবেচনা করে দেখুন। কার্যত তন্তুবায় তার ছিট-কাপড় বিনিময় করেছে বাইবেলের সঙ্গে অর্থাৎ তার নিজের পণ্য বিনিময় করেছে অন্য কারো পণ্যের সঙ্গে। কিন্তু এটা কেবল তত দূর পর্যন্তই সত্য, যত দূর পর্যন্ত সে নিজে সংশ্লিষ্ট। গমের সঙ্গে তার ছিট-কাপড়টির বিনিময় ঘটেছে-এই ঘটনা সম্পর্কে আমাদের তন্তুবায় বন্ধুটি যতট। অবহিত ছিল, বাইবেলের ক্রেত ব্যক্তিটি, যে তার ভিতরটা গরম রাখবার জন্য কিছু চাইছে, সে-ও তার বাইবেলখানার বদলে ছিট কাপড় বিনিময় করা সম্পর্কে তার চেয়ে বেশী আগ্রহান্বিত ছিল না। খ-এর পণ্য ক-এর পণ্যের জায়গা নেয় কিন্তু ক এবং খ পরস্পর এই দুটি পণ্যের বিনিময় করে না। এমন ঘটনা অবশ্য ঘটতে পারে যে ক এবং খ একজনের কাছ থেকে অন্যজন যুগপৎ ক্রয় করেছে কিন্তু এমন বিরল ব্যতিক্রমগুলি কোন ক্রমেই পণ্য সঞ্চলনের সাধারণ অবস্থাবলীর আবশ্যিক ফলশ্রুতি নয়। এখানে এক দিকে আমরা দেখতে পাচ্ছি পণ্যের বিনিময় কেমন করে প্রত্যক্ষ দ্রব্য-বিনিময় প্রথার সঙ্গে অচ্ছেদ্যভাবে জড়িত সমস্ত স্থানগত ও ব্যক্তিগত সীমানাকে ভেদ করে এবং সামাজিক শ্রমের উৎপন্নসমূহের সঞ্চলনের বিকাশ ঘটায়, অন্য দিকে আমরা দেখতে পাচ্ছি কেমন করে তা স্বতস্ফূর্তভাবে উদ্ভূত এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণ বহিভূত সামাজিক সম্পর্কসমূহের একটি গোটা জালের বিকাশ ঘটায়। কৃষক তার গম বিক্রয় করেছে বলেই তো তন্তুবায় তার কাপড় বিক্রয় করতে সক্ষম হয়, আবার তন্তুবায় তার কাপ ও বিক্রয় করেছে বলেই তো আমাদের হটলপুর তার বাইবেল বিক্রয় করতে সক্ষম হয়, আর যেহেতু হটপুর তার অমৃত-জীবনের বারি বিক্রয় করেছে সেহেতু চোলাইকার তার ‘সঞ্জীবনী সুধা বিক্রয় করতে সক্ষম হয় ইত্যাদি ইত্যাদি।
প্রত্যক্ষ দ্রব্য-বিনিময় প্রথার মতো পণ্য-সঞ্চলন, ব্যবহার-মূল্যসমূহের হাত ও জায় ল সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে যায় না। কোন পণ্যের রূপান্তরণের আবর্ত থেকে খসে যাবার পরে অর্থের অন্তর্ধান ঘটে না। তা নিরন্তর সঞ্চলনের আঙ্গিনায় অন্যান্য পণ্যের শূন্যস্থলে নতুন নতুন জায়গায় স্থান পায়। যেমন, ছিট কাপড়ের সম্পূর্ণায়িত রূপান্তরণে ছিট-কাপড় অর্থ-বাইবেল এই রূপান্তরণে ছিট কাপড় সবার আগে সঞ্চলনের বাইরে চলে যায় এবং অর্থ তার স্থান গ্রহণ করে। পরে বাইবেল চলে যায় সঞ্চনের বাইরে, এবং অর্থ আবার তার স্থান গ্রহণ করে। যখন একটি পণ্য আরেকটি পণ্যের স্থান গ্রহণ করে, তখন অর্থ সর্বদাই তৃতীয় কোন ব্যক্তির হাতে লেগে থাকে।[৭] সঞ্চলন অর্থের প্রত্যেকটি রন্ধ্র থেকে ঘাম ঝরিয়ে দেয়।
এমন একটা আপ্তবাক্য চালু আছে যে, যেহেতু প্রত্যেকটি বিক্রয়ই হচ্ছে একটি ক্রয়, আবার প্রত্যেকটি ক্রয়ও হচ্ছে একটি বিক্রয় সেহেতু পণ্য-সঞ্চলন আবশ্যিক ভাবেই বিক্রয় ও ক্রয়ের সাম্যাবস্থায় পরিণতি লাভ করে—এই ধরনের আপ্তবাক্য বালসুলভ সিদ্ধান্ত ছাড়া আর কিছুই নয়। যদি এর অর্থ হয় যে বাস্তব বিক্রয়ের সংখ্যা বাস্তব ক্রয়ের সংখ্যার সমান, তা হলে এটা হয়ে পড়ে নিবৃক পুনরুক্তি। কিন্তু আসলে এর যা বক্তব্য তা হচ্ছে এটা প্রমাণ করা যে প্রতেক বিক্রেতাই তার সঙ্গে বাজারে একজন করে ক্রেতাকে নিয়ে আসে। তেমন কিছুই অবশ্য ঘটে না। বিক্রয় এবং ক্রয়—এই দুটি মিলে হয় একটি অভিন্ন ক্রিয়া-পণ্য মালিক এবং অর্থমালিকের মধ্যে একটি বিনিময়, একটি চুম্বকের দুটি বিপরীত মেরুতে অবস্থিত দুজন ব্যক্তির মধ্যে বিনিময়। যখন একক ব্যক্তির দ্বারা সম্পন্ন হয়, তখন তারা হয় মেরুসদৃশ বিপরীত চরিত্রের দুটি সুস্পষ্ট ক্রিয়া। সুতরাং বিক্রয় এবং ক্রয়ের অভিন্নতার মানে দাঁড়ায় যে পণ্যটি উপযোগিতা, বিহীন, যদি তাকে ছুড়ে দেওয়া হয় সঞ্চলনের অরাসায়নিক বকযন্ত্রে, তা হলে তা অর্থের আকারে আর ফিরে আসে না; ভাষান্তরে বলা যায় যে তা তার মালিকের দ্বার। বিক্রীত হতে পারবেনা—আর সেই জন্যেই অর্থের মালিকের দ্বারা ক্রীত হতে পারবেনা। অভিজ্ঞতার আরো মাঝে দাঁড়ায় যে বিনিময়-যদি তা ঘটেও থাকে তা হলেও তা ঘটায় পণ্যের জীবনে একটা বিশ্রামের কাল, একটা অবকাশ—তা সে অল্পস্থায়ীই হোক আর দীর্ঘস্থায়ীই হোক। যেহেতু একটি পণ্যের প্রথম রূপান্তরণ একই সঙ্গে একটি বিক্রয় এবং ক্রয়, সেই হেতু এটা নিজেই একটা স্বতন্ত্র প্রক্রিয়া। ক্রেতা পায় পণ্য অর বিক্রেতা পায় অর্থ তথা এমন একটি পণ্য যা যেকোনো সময়ে সঞ্চলনে প্রবেশ করতে প্রস্তুত। কেউই বিক্রয় করতে পারে না-যদি অন্য কেউ ক্রয় না করে। কিন্তু যেহেতু সে বিক্রয় করেছে, সেইহেতুই কেউতো সঙ্গে সঙ্গেই ক্রয়ের জন্য বাধ্য থাকে না। সরাসরি দ্রব্য-বিনিময় প্রথা স্থান-কাল-ব্যক্তি ইত্যাদি বিষয়ে যেসব সীমাবদ্ধতা আরোপ করে, সঞ্চলন ব্যবস্থা সে সব কিছুকে ভেঙেচুরে বেরিয়ে যায় এবং তা সে করে দ্রব্য-বিনিময় প্রথায় একজনের নিজের উৎপন্ন দ্রব্যের পরকীকরণ এবং আরেকজনের উৎপন্ন দ্রব্যের আপনীকরণের মধ্যে যে অভিন্নতা থাকে, সেই অভিন্নতাকে বিক্রয় ও ক্রয়ের বৈপরীত্যে বিভিন্ন করে দিয়ে। এই দুটি স্বতন্ত্র এবং বিপরীতমুখী ক্রিয়ার মধ্যে একটি অন্তর্নিহিত ঐক্য আছে, তা মূলতঃ একত্র কথা বলা, আর অন্তর্নিহিত একত্ব নিজেকে প্রকাশ করে একটি বাহ্যিক বৈপরীত্যের মধ্যে—এ কথা বলার মানে একই। একটি পণ্যের সম্পূর্ণ রূপান্তরণের দুটি পরিপূরক পর্যায়ের মধ্যবর্তী অবকাশ যদি খুব বেশী হয়, বিক্রয় এবং ক্রয়ের মধ্যকার বিচ্ছেদ যদি বেশী হয়, তা হলে তাদের মধ্যকার অন্তরঙ্গ সুযোগ, তাদের একত্ব, নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে সৃষ্টি করে একটি সংকট। ব্যবহার-মূল্য এবং মূল্যের এই যে বৈপরীত্য; প্রত্যক্ষ সামাজিক শ্রম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে ব্যক্তিগত শ্রম বাধ্য, একটা বিশেষ ধরনের মূর্ত শ্রম যে নির্বিশেষ অমৃত মনুষ্য-শ্রমের রূপে চালু থকতে বাধ্য-এই যে সব দ্বন্দ্ব; বিষয়ের ব্যক্তিরূপ এবং ব্যক্তির দ্বারা বিষয়ের প্রতিনিধিত্ব—এই যে দ্বন্দ্ব; এই সমস্ত বৈপরীত্য এবং দ্বন্দ্বই অন্তনিহিত থাকে পণ্যের অন্তরে এবং একটি পণ্যের রূপান্তরণের বৈপরীত্যসংকুল পর্যায়সমূহে সংঘটিত পণ্যের গতি প্রক্রিয়া। স্বভাবতই এই প্রক্রিয়াগুলি আভাসিত করে সংকটের সম্ভাবনা-হা, কেবল, সম্ভাবনাই তার বেশী কিছু নয়। এই যে নিছক সম্ভাবনা তার বাস্তবে রূপায়ণ হচ্ছে এক দীর্ঘ সম্পর্ক ক্রমের ফলশ্রুতি—কিন্তু সরল সঞ্চলনের বর্তমান বিষয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে আপাতত সে সম্পর্ক আমাদের সামনে অনুপস্থিত।[৮]
