.
অ—প কিংবা ক্রয়
পণ্যের দ্বিতীয় তথা সর্বশেষ রূপান্তরণ
যেহেতু অর্থ হচ্ছে বাকি সমস্ত পণ্যের রূপান্তরিত আকার, তাদের সাধারণ পরকীকরণের ফলশ্রুতি, সেহেতু সে নিজেই বিনা বাধায়, বিনা শর্তে পরকীকরণীয়। সে সমস্ত দামকেই পেছন দিক থেকে পডে, এবং এইভাবে, বলা যায় যে, বাকি সমস্ত পণ্যের দেহে নিজেকে একে দেয়—যেসব পণ্য তাকে দেয় তার নিজের ব্যবহার মূল্য বাস্তবায়িত করার সামগ্রীটি। একই সময়ে, বিভিন্ন দাম তথা অর্থের প্রতি বিভিন্ন পণ্যের মনোহরণ কটাক্ষপাত, তার পরিমাণের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে, তার রূপ পরিবর্তনীয়তার সীমা নিরূপণ করে দেয়। যেহেতু প্রত্যেকটি পণ্যই অর্থে রূপায়িত হবার পরেই পণ্য হিসেবে অন্তহিত হয়ে যায়, সেহেতু স্বয়ং অর্থ থেকে এটা বলা অসম্ভব যে কেমন করে সে তার মালিকের অধিকারে চলে গিয়েছিল অথবা কোন্ জিনিস তাতে পরিবর্তিত হয়েছিল। তা সে অর্থ যে উৎস থেকেই আসুক না কেন। এক দিকে সে যখন প্রতিনিধিত্ব করছে একটি বিক্রিত পণ্যের, অন্যদিকে সে তখন প্রতিনিধিত্ব করছে এমন একটি পণ্যের যেটা ক্রয় করা হবে।[৫]
অ—প, একটি ক্রয়, আবার একই সঙ্গে প-অ, একটি বিক্রয়; একটি পণ্যের সর্বশেষ রূপান্তরণ হচ্ছে আরেকটি পণ্যের সর্বপ্রথম রূপান্তরণ। আমাদের তন্তুবায় বন্ধুটির বেলায়, তার পণ্যের জীবনবৃত্ত শেষ হল বাইবেল এর সঙ্গে, যাতে সে পুন:-রূপ পরিবর্তিত করেছে তার ২টি পাউণ্ডকে। কিন্তু ধরুন, তন্তুবায়ের দ্বারা বিমুক্ত পাউণ্ড ২টিকে যদি বাইবেল-এর বিক্রেতা মদে রূপ-পরিবর্তিত করে অর্থ-প, তা হলে প-অ—প ( ছিট-কাপড়, অর্থ, বাইবেল)-এর সর্বশেষ পর্যায়টি হবে, আবার প-অ অর্থাৎ প—অ—প (বাইবেল, অর্থ, মদ্য )-এর প্রথম পর্যায়টিও। একটি বিশেষ পণ্যের উৎপাদনকারীর হাতে থাকে দেবার মতো সেই একটি জিনিসই, সেটাকেই সে বিক্রয় করে প্রায়ই বিরাট বিরাট পরিমাণে; কিন্তু তার বহু সংখ্যক ও বহুবিধ অভাব তাকে বাধ্য করে অসংখ্য ক্রয়ের মধ্যে তার আদায়ীকত দামকে, বিযুক্ত অর্থের মোট পরিমাণকে বিভক্ত করে দিতে। সুতরাং একটি বিক্রয়ের পরিণতি ঘটে বহুবিধ জিনিসের বহুসংখ্যক ক্ৰয়ে। একটি পণ্যের সর্বশেষ রূপান্তরণ এইভাবে সংঘটিত করে অন্যান্য বহুবিধ পণ্যের সর্বপ্রথম রূপান্তরণসমূহের একটি সামূহিক সমষ্টি।
এখন যদি আমরা একটি পণ্যের সম্পূর্ণীকৃত রূপান্তরণটিকে সামগ্রিকভাবে বিচার করি, তা হলে দেখতে পাই যে, প্রথমে, তা গঠিত হয় দুটি বিপরীত কিন্তু পরিপুর্বক গতিক্রমের দ্বারা প—অ এবং অপ। পণ্যের এই দুটি বিপরীতমুখী আকার পরিবর্তন সংঘটিত হয় মালিকদের পক্ষ থেকে দুটি বিপরীতমুখী সামাজিক ক্রিয়ার দ্বারা আর এই ক্রিয়াগুলি আবার তার দ্বারা সম্পাদিত বিভিন্ন ভূমিকার উপরে যথােচিত অর্থ নৈতিক অভিধায় ভূষিত করে দেয়। ব্যক্তি যখন বিক্রয় করে সে তখন বিক্রেতা; আবার সে যখন ক্রয় করে, সে তখন ক্রেতা। কিন্তু যেমন যে-কোনো পণ্যের এই ধরণের প্রত্যেকটি আকার-পরিবর্তনে পরেই তার দুটি রূপ, পণ্যরূপ ও অর্থরূপ, যুগপৎ দৃশ্যমান হয়—অবশ্য দুটি বিপরীত মেরুতে, ঠিক তেমনি প্রত্যেক বিক্রেতারই প্রতিপক্ষে থাকে একজন ক্রেতা এবং প্রত্যেক ক্রেতারই প্রতিপক্ষে থকে একজন বিক্রেতা। যখন কোন বিশেষ একটি পণ্য পণ্যরূপ ও অর্থপ—তার দুটি রূপের মধ্য দিয়ে পরপর অতিক্রান্ত হয় তখন তার মালিকও পরপর অতিক্রান্ত হয় তার বিক্রেতারূপ ভূমিকা থেকে তার তোরূপ ভূমিকায়। সুতরাং বিক্রেতা এবং ক্রেতা হিসেবে এই যে বিভিন্ন চরিত্র তা স্থায়ী নয়, বরং পণ্য সঞ্চলনে যে বিভিন্ন ব্যক্তি নিযুক্ত থাকে এই বিভিন্ন চরিত্র পালাক্রমে সেই ব্যক্তিদের সঙ্গে লগ্ন হয়।
সরলতম রূপে একটি পণ্যের সম্পূর্ণ রূপান্তণের মধ্যে নিহিত থাকে চারটি চরম বিন্দু এবং তিনটি নাটকীয় চরিত্র। প্রথমে একটি পণ্য মুখোমুখি হয় অর্থের সঙ্গে, অর্থ হচ্ছে পণ্যটির মূল্যের দ্বারা পরিগৃহীত রূপ, এবং তা তার নিরেট বস্তুরূপে অবস্থান করে ক্রেতার পকেটে। পণ্যের মালিক এইভাবে আসে অর্থের মালিকের সংস্পর্শে। এখন যত তাড়াতাড়ি পণ্যটি অর্থে পরিবর্তিত হয় তত তাড়াতাড়ি অর্থ হয় তার ক্ষণস্থায়ী সমার্ঘ রূপ-যে সমার্ঘ রূপটির ব্যবহার মূল্য দৃশ্যমান হয় অন্যান্য পণ্যের দেহে। প্রথম আকার পরিবর্তনের অন্তিম সীমা হল অর্থ, আবার এই অর্থই হল দ্বিতীয় অকার পরিবর্তনের যাত্রা-বিন্দু। প্রথম লেনদেনে যে ব্যক্তিটি থাকে বিক্রেতা সেই ব্যক্তিটিই দ্বিতীয় লেনদেনে হয়ে পড়ে ক্রেতা; আর এই দ্বিতীয় লেনদেনের মঞ্চে আবির্ভূত হয় তৃতীয় এক পণ্য মালিক।[৬]
পরস্পরে বিপরীত এই যে দুটি পর্যায়-যা একটি পণ্যের রূপান্তর সম্পূর্ণায়িত করে। সেই পর্যায় মিলেই রচনা করে একটি গতিক্রম, একটি আবর্ত : পণ্য-রূপ, পণ্য রূপের পরিহার এবং আবার সেই পণ্য রূপে প্রত্যাবর্তন। সন্দেহ নেই যে পণ্যটি এখানে দেখা দেয় ভিন্ন ভিন্ন দুটি চেহারায়। যাত্রা-বিন্দুতে সে তার মালিকের কাছে ব্যবহার-মূল্য থাকে না; সমাপ্তি বিন্দুতে সে কিন্তু হয়ে যায় একটি ব্যবহার-মূল্য। একই রকমে অর্থ প্রথম পর্যায় দেখা দেয় মূল্যের একটি ঘনীভূত স্ফটিক হিসেবে—এমন একটি স্ফটিক যার মধ্যে পণ্যটি ব্যগ্রভাবে ঘনত্ব পরিগ্রহ করে, এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে তা আবার বিগলিত হয়ে পরিণত হয় এমন একটি ক্ষণস্থায়ী সমার্থরূপে-যার ভবিতব্য হচ্ছে একটি ব্যবহার মূল্যের দ্বারা স্থানচ্যুত হওয়া।
