[* এন. এফ. ড্যানিয়েলসন-এর কাছে লেখা তার ২৮শে নভেম্বর, ১৮৭৮ তারিখের চিঠিতে মার্কস প্রস্তাব করেন যে তার এই বাক্যটি এইভাবে পুনলিখিত করা হোক, আর বাস্তবিক পক্ষে, প্রত্যেক গজ ছিট-কাপড়ের মূল্যও সমগ্র-সংখ্যক গজের উপরে ব্যয়িত সামাজিক শ্রমের বাস্তবায়িত রূপের একটি অংশমাত্র’-রুশ সংস্করণ মার্কস-এঙ্গেলস-লেনিন-তালিন ইনষ্টিটিউট’-এর টীকা।]
তা হলে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে পণ্যের। অর্থের সঙ্গে প্রেমাসক্ত, কিন্তু “যথার্থ প্রেমের পথ কখনো মসৃণগতি নয়”। শ্রমের গুণগত বিভাজন যেভাবে সংঘটিত হয়, ঠিক সেই একই স্বতঃস্ফূর্ত ও আপতিক ভাবে সংঘটিত হয় শ্রমের মাত্রাগত বিভাজন। সুতরাং পণ্যসম্ভারের মালিকেরা আবিষ্কার করে, যে-শ্রমবিভাজন তাদেরকে ভিন্ন ভিন্ন স্বতন্ত্র ব্যক্তি মালিকে পরিণত করে, ঠিক সেই একই শ্রমবিভাজন উৎপাদনের সামাজিক প্রক্রিয়াকে এবং সেই প্রক্রিয়ার অন্তর্গত ব্যক্তিগত উৎপাদন কারীদের পারস্পরিক সম্পর্ককে সেই উৎপাদনকারীদের ইচ্ছা-অনিচ্ছা থেকে মুক্ত করে, এবং ব্যক্তি-মালিবদের আপাত-দৃশ্য পারস্পরিক স্বাতন্ত্রকে উৎপন্ন দ্রব্যসমূহের মাধ্যমে বা সাহায্যে সাধারণ ও পারস্পরিক সাপেক্ষতার একটি প্রণালীর দ্বারা পরিপুরিত করে।
শ্রম-বিভাজন শ্ৰজাত দ্রব্যকে পণ্যে পরিবর্তিত করে এবং এইভাবে তার অর্থে পরিবর্তনের পর্যায়টিকে আবশ্যিক করে তোলে। একই সময়ে আবার তা এই পর্যায়ান্তিক পরিবর্তনের সম্পাদনাকে আপতিক করে তোলে। এখানে অবশ্য আমরা কেবল তার অখণ্ডতার ব্যাপারটি নিয়ে আলোচনা করছি এবং সেই কারণেই তার পুরে।গতিকে স্বাভাবিক বলে ধরে নিচ্ছি। অধিকন্তু, এই পরিবর্তন যদি আদৌ ঘটে অর্থাৎ আলোচ্য পণ্যটি যদি একেবারেই অবিক্রেয় না হয়, তা হলে এই রূপান্তর অবশ্যই ঘটে- যদিও প্রাপ্ত দাম মূল্যের চেয়ে অস্বাভাবিক ভাবে বেশী বা অস্বাভাবিক কম হতে পারে।
বিক্রেতা তার পণ্যের বদলে পায় সোনা এবং ক্রেতা তার সোনার বদলে পায় একটি পণ্য। যে ঘটনাটি আমরা এখানে প্রত্যক্ষ করছি, তা এই যে, একটি পণ্য এবং সোনার-২০ গজ ছিট কাপড় এবং ২ পাউণ্ড-এর-হাত বদল এবং জায়গা বদল হয়েছে, অর্থাৎ তাদের বিনিময় হয়েছে। কিন্তু কিসের সঙ্গে পণ্যটি বিনিমিত হল? তারই নিজের মূল্য যে আকার পরিগ্রহ করেছে, সেই আকারের সঙ্গে তথা সর্বজনীন সমার্ঘটির সঙ্গে। এবং ঐ সোন বিনিমিত হল কিসের সঙ্গে? বিনিমিত হল তার নিজেরই ব্যবহার মূল্যের একটি রূপের সঙ্গে। ছিট-কাপড়ের মুখোমুখি সোনা অর্থের রূপ ধারণ কেন? কারণ ছিট-কাপড়ের ২ পাউণ্ড দাম তথা অর্থ-রূপ তাকে এরই মধ্যে অর্থ-রূপে অভিব্যক্ত সোনার সঙ্গে সমীকৃত করে দিয়েছে। পরকীকৃত হবার সঙ্গে সঙ্গে অর্থাৎ যে মুহূর্তে তার ব্যবহার মূল্য সোনাকে আকৃষ্ট করে যে সোনা এর আগে তার। দামের মধ্যে বিস্তৃত ছিল কেবল ভাবগত ভাবে, সেই মুহূর্তে পণ্য তার মূল্যটিকে অর্থাৎ পণ্যরূপটিকে পরিহার করে। অতএব দেখা যাচ্ছে যে কোনো পণ্যের দাম কিংবা তার মূল্যের ভাবগত রূপের বাস্তবায়ন হচ্ছে সেই একই সঙ্গে অর্থের ভাবগত ব্যবহার মূল্যের বাস্তবায়ন; কোন পণ্যের অর্থে রূপ-পরিগ্রহণের মানে হল সেই একই সঙ্গে অর্থেরও পণ্যে রূপ-পরিগ্রহণ। বাহ্যতঃ যাকে মনে হয় একটিমাত্র একক প্রক্রিয়া বলে কার্যত সেটি হচ্ছে একটি দ্বৈত প্রক্রিয়া পণ্য মালিকের মেরু থেকে এটাকে বলা হয় ‘বিক্রয’, অর্থ মালিকের বিপরীত মেরু থেকে এটা হচ্ছে ‘ক্রয়’। ভাষান্তরে একটা বিক্রয় মানেই একটা ক্ৰয়। প—অ আবার অ—প ও বটে।[১]
এ পর্যন্ত আমরা মানুষদের বিবেচনা করেছি কেবল তাদের একটি মাত্র অর্থনৈতিক অবস্থানে, সেটা হল পণ্যসমূহের বিভিন্ন মালিকের অবস্থানে, যে অবস্থানে থেকে তারা অন্যদের ম-ফলকে আত্মসাৎ করে এবং তা করতে গিয়ে তাদের নিজেদের শ্রম থেকেই তাদেরকে পরকীকৃত করে। সুতরাং অর্থের অধিকারী এমন একজন মালিকের সঙ্গে যদি একজন পণ্য মালিককে সাক্ষাৎ করতে হয়, তা হলে যা দরকার হয় তা হচ্ছে এই : হয়, অর্থের অধিকারী ব্যক্তিটির তথা ক্রেতা ব্যক্তিটির শ্রমের ফল নিজেই হবে অর্থ, নিজেই হবে সোনা, মানে সেই সামগ্রী যা দিয়ে অর্থ তৈরী হয়; আর নয়তো, তার শ্রম ফল হবে এমনটি যা এরই মধ্যে তার আবরণ পালটে ফেলেছে এবং ব্যবহার্য ( উপযোগী) জিনিসের মূল রূপটিকে পরিহার করেছে। যাতে করে সে অর্থের ভূমিকা পালন করতে পারে তার জন্য সোনাকে অবশ্যই কোন না কোন বিন্দুতে অথবা অত্র বাজারে প্রবেশ লাভ করতে হবে। এই বিন্দুটি লক্ষ্য করা যায় সংশ্লিষ্ট ধাতুটির উৎপাদনের উৎসক্ষেত্রে যে জায়গায় সমান মূল্যের অন্য কোন উৎপন্নের সঙ্গে শ্রমের অব্যবহিত ফল হিসেবে সোনার বিনিময় সংঘটিত হয়। সেই মুহূর্ত থেকে তা সর্বদাই হয় কোন পণ্যের বাস্তবায়িত দামের প্রতিনিধি।[২] নিজের উৎপাদনের উৎসক্ষেত্রে অন্যান্য পণ্যের সঙ্গে তার বিনিময় ছাড়াও, সোন? তা সে যারই হাতে থাক না কেন সোনা হচ্ছে মালিকের দ্বারা পরকীকৃত কোন পণ্যের রূপান্তরিতু আকার; এ হচ্ছে একটি বিক্রয়ের তথা প-অ এই রূপান্তরণের ফল। [৩] অন্যান্য পণ্য যখন নিজ নিজ মূল্য সোনার অঙ্কে পরিমাপ করতে লাগল এইভাবে উপযোগী সামগ্রী হিসেবে তাদের স্বাভাবিক আকারের সঙ্গে ভাবগত ভাবে তার প্রতি তুলনা করতে থাকল আর এইভাবে তাকে তাদের মূল্যের আকারে পরিণত করল, তখনি সোনা হয়ে উঠল ভাবগত ভাবে অর্থ তথা মূল্য সমূহের পরিমাপ। পণ্যাবলীর সাধারণ পরকীকরণের মাধ্যমে, নিজ নিজ স্বাভাবিক আকার সহ-উপযোগী দ্রব্য হিসেবে তাদের স্থান পরিবর্তনের মাধ্যমে এবং এর ফলে বাস্তবে তাদের বিভিন্ন মূল্যের মৃত বিগ্রহে পরিণত হবার মাধ্যমেই সোনা বস্তুতই অর্থ হয়ে উঠল। পণ্যের যখন এই অর্থ-আকার ধারণ করে, তখন সমজাতীয় মনুষ্য-শ্রমের এক ও অভিন্ন সমাজ-স্বীকৃত মূর্ত বিগ্রহে নিজেদের রূপান্তরিত করার জন্য তারা তাদের স্বাভাবিক ব্যবহার মূল্যের প্রত্যেকটি চিহ্ন থেকে এবং শ্রমের যে বিশেষ বিশেষ ধরন থেকে তাদের সৃষ্টি সেই সব ধরন থেকে নিজেদের সম্পূর্ণ মুক্ত করে নেয়। কেবল একটা মুদ্রা দেখেই আমরা বলতে পারি না কোন বিশেষ পণ্যের সঙ্গে তার বিনিময় হয়েছে। অর্থ-রূপের অধীনে সব পণ্যই একইরকম দেখায়। সুতরাং, অর্থ মাটিও হতে পারে, যদিও মাটি অর্থ নয় : আমরা ধরে নিচ্ছি যে, দুটি স্বর্ণখণ্ড যার বিনিময়ে আমাদের তন্তুবায় বন্ধুটি তার ছিট কাপড় হাতছাড়া করেছে সেই দুটি স্বর্ণ খণ্ড এক কোয়ার্টার গমের রূপান্তরিত আকার, ছিটকপিডের বিক্রয় প-অ আবার একই সঙ্গে তার ক্রয়ও বটে অপ। কিন্তু বিক্রয় হচ্ছে এমন একটি প্রক্রিয়ার প্রথম ক্রিয়া যার শেষ হয় বিপরীত প্রকৃতির একটি লেনদেনে যথা বাইবেল-এর ক্রয়; অপর পক্ষে, ছিট কাপডের ক্রয়, যার শুরু হয়েছিল একটি বিপরীত প্রকৃতির ক্রিয়ায়, যথা গমের বিক্রয় প-অ (ছিট কাপড়-পণ্য, যা হচ্ছে প—অপ (ছিট কাপড়—অর্থ-বাইবেল) এর প্রথম পর্যায়, তা হচ্ছে আবার অ—প (অর্থ-ছিট কাপড়। ও, আরেকটি গতিক্রমের শেষ পর্যায় প-অ-প (গম—অর্থ-ছিট কাপড়)। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, একটি পণ্যের প্রথম রূপান্তরণ, পণ্য থেকে অর্থে তার রূপ-পরিবর্তন আবার আবশ্যক ভাবেই একই অন্য কোন পণ্যের দ্বিতীয় রূপান্তরণ, তার অর্থ থেকে পণ্যে রূপ-পরিবর্তন।[৪]
