এখন কোন একটি পণ্যের মালিকের সঙ্গে, ধরা যাক, আমাদের পুরোনো বন্ধু ছিট-কাপড়ের তন্তুবায়ের সঙ্গে, তার কর্মক্ষেত্রে অর্থাৎ বাজারে যাওয়া যাক। তার ২০ গজ ছিট কাপড়ের একটা নির্দিষ্ট দাম আছে ২ পাউণ্ড। সে ২ পাউণ্ডের বদলে তার পণ্যটি বিনিময় করল এবং তার পরে পুরনো দিনের ভালো মানুষ যা করে। থাকত তাই করল-সে তার পরিবারের জন্য ঐ একই দামের একখানি বাইবেল কিনল এবং তার হাতের টাকাটা-ঐ পাউণ্ড দুটি-হাতছাড়া করল। ঐ যে ছিট কাপড় তা তার কাছে একটি পণ্য-মাত্র, মূল্যের আধারমাত্র; তাকে সে সোনার বিনিময়ে, অর্থাৎ ছিট-কাপড়টি মূল্য-রূপের বিনিময়ে পরকীকৃত করল; এই সোনা তথা মূল্যরূপটিকে সে আবার হস্তান্তরিত করল আরেকটি পণ্যের জন্য তথা বাইবেল খানির জন্য—সে বাইবেলখানি তার পরিবারে স্থান পাবে একটি উপযোগপূর্ণ সামগ্রী হিসেবে, পরিবারের লোকজনদের কাছে আরাধ্য গ্রন্থ হিসেবে। এই বিনিময় প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণায়িত হল দুটি বিপরীত অথচ পরিপুরক রূপান্তরণের মাধ্যমে পণ্যটির অর্থ রূপান্তরণ এবং ঐ অর্থের আকার পণ্যে পুনঃরূপান্তরণ। এই রূপান্তরণের দুটি পর্যায়ই আমাদের তন্তুবায় বন্ধুটির দুটি সুস্পষ্ট লেনদের—বিক্রয় বা অর্থের জন্য পণ্যের বিনিময়, আবার ক্রয় বা পণ্যের জন্য অর্থের বিনিময় এবং দুটি কাজের ঐক্য হল : ক্রয়ের জন্য বিক্রয়।
আমাদের তন্তুবায় বন্ধুটির কাছে গোটা লেনদেনটির ফলশ্রুতি হল এই যে ছিট কাপড়ের মালিক না হয়ে, সে এখন হল বাইবেলখানির মালিক; তার মূল পণ্যটির পরিবর্তে তার মালিকানায় এসেছে একই মূল্যের অথচ ভিন্নতর উপযোগিতার অন্য একটি পণ্য। একই উপায়ে সে জীবনধারনে অন্যান্য উপায়-উপকরণ এবং উৎপাদনের উপায়-উপকরণ করে থাকে। তার দৃষ্টিকোণ থেকে, গোটা প্রক্রিয়াটির ফল যা দাড়ালো তা অন্য কারো শ্রমজাত দ্রব্যের জন্য নিজের শ্রমজাত দ্রব্যের বিনিময় ছাড়া, নিছক দ্রব্যের বদলে দ্রব্য বিনিময় ছাড়া আর কিছুই নয়।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে বিবিধ পণ্যের বিনিময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের মধ্যে নিম্নলিখিত পরিবর্তনগুলি সংঘটিত হয়।
পণ্য—অর্থ-পণ্য
প-অ—প
সংশ্লিষ্ট দ্রব্যগুলির পথে সমগ্র প্রক্রিয়াটির ফল হল একটি পণ্যের জন্য আরেকটি পণ্যের বিনিময়-বাস্তবায়িত সামাজিক শ্রমের সঞ্চলন। যখন এই ফলটি অর্জিত হয়ে যায়, গোটা প্রক্রিয়াটাও শেষ হয়ে যায়।
প–অঃ প্রথম রূপান্তরণ বা বিক্রয়
পণ্যের দেহ থেকে সোনার দেহ মুল্যের এই যে উম্ফন, অন্যত্র আমি তাকে অভিহিত করেছি পণ্যের ‘Salto mortale’ বলে। যদি তার কমতি হয়, তা হলে পণ্যটির নিজের কোনো ক্ষতি হয় না, কিন্তু মালিকের ক্ষতি হয় নিশ্চয়ই। শ্রমের সামাজিক বিভাজনের ফলে তার প্রম হয় যেমন একপেশে তার অভাবগুলি হয় তেমন অনেক পেশে। আর ঠিক এই কারণেই তার শ্রমের ফল তার সেবায় লাগে কেবল বিনিময়মূল্য হিসেবেই। কিন্তু অর্থে রূপান্তরিত না হওয়া পর্যন্ত তার শ্রম ফল সমাজস্বীকৃত সর্বজনীন সমার্থরূপের গুণাবলী অর্জন করে না। কিন্তু সেই অর্থ থাকে অন্য কারো পকেটে। সেই পকেট থেকে তাকে প্রলুব্ধ করে বাইরে নিয়ে আসতে হলে আমাদের বন্ধুর পণ্যটিকে হতে হবে সব কিছুর উপরে ঐ অর্থের অধিকারীর কাছে ব্যবহার মূল্য ভূষিত। এই কারণে, উক্ত পণ্যে ব্যয়িত শ্রমকে হতে হবে এমন এক ধরনের যা সামাজিক ভাবে প্রয়োজনীয়, এমন এক ধরনের যা সামাজিক শ্রম-বিভাগেরই একটি শাখা স্বরূপ। কিন্তু শ্রম-বিভাগ হচ্ছে এমন একটি উৎপাদন-প্রণালী যা গড়ে উঠেছে এবং বেড়ে উঠতে থাকে স্বতঃস্ফুত ভাবে উৎপাদনকারীদের অজান্তে। বিনিময়ে পণ্যটি হয়তো এমন কোনো নতুন ধরনের শ্ৰম-ফলত হতে পারে যা নতুন করে উদ্ভূত কোনো অভাব বোধের পরিতৃপ্তি সাধনের কিংবা, এমন কি নতুন করে কোনো অভাব বোধের উদ্ভব ঘটানোর দাবি নিয়ে হাজির হতে পারে। একটি নির্দিষ্ট পণ্য-উৎপাদনের উদ্দেশ্যে কোন উৎপাদনকারীর পরিচালনায় পরিচালিত বহুবিধ উৎপাদন প্রক্রিয়ার মধ্যে একটি মাত্র প্রক্রিয়া হয়েও গতকালের কোনো একটি উৎপাদন প্রক্রিয়া আজকে নিজেকে এই সংযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে নিজেকে একটি স্বতন্ত্র এম-শাখা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে এবং নিজেকে অসম্পূর্ণ উৎপন্ন-দ্রব্যটিকে একটি স্বতন্ত্র পণ্য হিসেবে বাজারে পাঠাতে পারে। অবস্থাবলী এই ধরনের বিচ্ছেদের পক্ষে পরিণত হতেও পারে, আবার না-ও হতে পারে। আজই ঐ পণ্যটি সামাজিক অভাব-বোধের তৃপ্তি সাধন করছে। আগামীকাল অন্য কোনো ঘোগ্যতার উৎপন্ন-দ্রব্য অংশতঃ বা সম্পূর্ণতঃ তার জায়গা দখল করে নিতে পারে। অধিকিন্তু যদি আমাদের তন্তুবায় বন্ধুটির শ্রম সমাজ স্বীকৃত এম-বিভাগের একটি শাখা বলে পরিগণিত, তা সত্বেও কিন্তু কেবল এই ঘটনা কোন ক্রমেই তার ২০ গজ ছিট কাপড়ের উপযোগিতাকে নিশ্চয়ীকৃত করে না। অন্যান্য প্রত্যেকটি অভাবের মতো সমাজের কাছে ছিট কাপড়ের অভাবও সীমাবদ্ধ এবং সেই কারণেই যদি প্রতিদ্বন্দ্বী তন্তুবায়দের উৎপন্ন ছিট-কাপড়ের সমাজের এই বিশেষ অভাবটি পুরোপুরি মিটে গিয়ে থাকে তা হলে আমাদের বন্ধুটির উৎপন্ন ছিট কাপড হয়ে পড়বে বাড়তি, ফালতু, এবং কাজেকাজেই অকেজো। একথা ঠিক যে মানুষ দানের ঘোড়াতে যাচাই করে নেয়না কিন্তু আমাদের বন্ধুটিত দান-খয়রাতের জন্য তার ছিট-কাপড় নিয়ে বাজারে আনাগোনা করে না। কিন্তু ধরুন, যদি তার উৎপন্নদ্রব্য একটি সত্যকার ব্যবহার মূল্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং সেই হেতু অর্থকে আকর্ষণ করে? তখন প্রশ্ন জাগবে, কতটা অর্থ সে আকর্ষণ করবে? সন্দেহ নেই যে সংশ্লিষ্ট জিনিসটির মূল্য আয়তনের মুখপাত্রস্বরূপ যে দাম সেই দামের মধ্যেই উত্তরটি আগেভাগেই ধরে নেওয়া হয়েছে। আমাদের বন্ধুটি অবশ্য তার দামের হিসেবে হঠাৎ কোন ভুলও করে বসতে পারে, সে ক্ষেত্রে এই ধরনের ভুল বাজারে গিয়ে অনতি বিলম্বেই সংশোধিত হয়ে যাবে; তাই এই ধরনের ভুলচুক আমরা আমাদের আলোচনার বাইরে রাখছি। আমরা ধরে নিচ্ছি যে সে তার উৎপন্ন দ্রব্যে কেবল ততটা পরিমাণ শ্রম-সময় ব্যয় করেছে, যতটা পরিমাণ শ্রম-সময় গড় হিসেবে সামাজিক ভাবে প্রয়োজনীয়। তা হলে, দাম হচ্ছে কেবল একটা অর্থ-নাম তার পণ্যটিতে যে পরিমাণ সামাজিক শ্রম বাস্তবায়িত হয়েছে তারই অর্থ-নাম। কিন্তু আমাদের তন্তুবায় বন্ধুটির অনুমতি ব্যতিরেকেই তার অজ্ঞাতসারেই বয়নের পুরনো ধাঁচের পদ্ধতিটি বদলে গেল। সে ক্ষেত্রে গতকাল পর্যন্ত এক গজ ছিট-কাপড় বুনতে সামাজিক ভাবে প্রয়োজনীয় যে-পরিমাণ শ্রম-সময়ের দরকার পড়ত, আজ থেকে তা আর দরকার পড়ে না। তখন আমাদের বন্ধুটির যারা প্রতিযোগী, তারা যে-দাম চাইছে, সেই দামের উল্লেখ করে অর্থের মালিক এই ঘটনাটা ব্যগ্র ভাবে প্রমাণ করতে চেষ্টা করবে। আমাদের বন্ধুটির দুর্ভাগ্য যে তন্তুবায়ের সংখ্যায় অল্প নয় আর তারা দূরদূরান্তেও অবস্থান করে না। সর্বশেষে, ধরে নেওয়া যাক যে বাজারে উপস্থাপিত ছিট-কাপড়ের প্রত্যেকটি টুকরো যে-পরিমাণ শ্রম-সময় সামাজিক ভাবে প্রয়োজনীয় তা থেকে মোটেই বেশী শ্রম সময় ধারণ করছে না। তা সত্ত্বেও কিন্তু ছিট-কাপড়ের এই সমস্ত টুকরোগুলির মোট পরিমাণ প্রয়োজনাতিরিক্ত শ্রম-সময় ধারণ করে থাকতে পারে। গজ প্রতি ১ শিলিং এই স্বাভাবিক দামে বাজার যদি মোট পরিমাণ ছিট-কাপড়কে উদৱস্থ করতে না পারে তা হলে প্রমাণ হয়ে যায় যে সমাজের মোট শ্রমের অবাঞ্ছনীয় রকমের একটা বড় অংশ বয়নের আকারে ব্যয় করা হয়েছে। প্রত্যেকটি তন্তুবায় ব্যক্তিগত ভাবে যদি তার উৎপন্ন দ্রব্যের উপরে সামাজিক ভাবে প্রয়োজনীয় শ্রমের অতিরিক্ত শ্রম ব্যয় করত, তা হলে যে ফল হত, এক্ষেত্রেও ফল তাই হবে। জার্মান প্রবচনটির ভাষায় এখানে আমরা বলতে পারি। এক সঙ্গে ধরা এক সঙ্গে মরা। বাজারে সমস্ত ছিট কাপড় তখন গণ্য হয় বাণিজ্যের একটি মাত্র অখণ্ড সামগ্রী হিসাবে যার মধ্যে এক-একটি টুকরো হচ্ছে এক-একটি খণ্ডাংশ মাত্র। আর বাস্তবিক পক্ষে, প্রত্যক গজ ছিট কাপড়ের মূল্য হচ্ছে এক ও অভিন্ন সমজাতীয় মনুষ্য-শ্রমের সুনির্দিষ্ট, সামাজিক ভাবে স্থিরীকৃত পরিমাণের বাস্তবায়িত রূপ মাত্র।*
