যষ্ঠ এডোয়ার্ড : তাঁর রাজত্বের প্রথম বছরের ১৫৪৭ সালের একটি বিধানে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যদি কেউ কাজ করতে অস্বীকার করে, তা হলে যে-ব্যক্তি তাকে কুড়ে বলে নিন্দা করেছে, সে সেই ব্যক্তির শোলাম (Slave) হিসাবে বাধা থাকতে বাধ্য থাকবে। মনিব তাকে খেতে দেবে রুটি আর জল, পাতলা ঝোল এবং ফেলে-দেওয়া। মাংস, যা সে উপযুক্ত বলে মনে করে। তার অধিকার থাকবে, চাবুক ও শিকলের সাহায্যে, তাকে দিয়ে যেকোনো কাজ করাবার-তা, সে কাজ যতই জঘন্য হোক না। কেন। যদি কোন গোলাম এক পক্ষ কাল গরহাজির থাকে, তা হলে সে সারা জীবনের জন্য গোলামিতে দণ্ডিত হবে এবং তার কপালে ও পিঠে “S” এই অক্ষরটি ছাপ মেরে দেওয়া হবে, যদি সে তিন বার পালিয়ে যায়, তা হলে তাকে দুবৃত্ত বলে ফাসী দেওয়া হবে। মনিব তাকে বিক্রি করতে পারে, দিয়ে দিতে পারে, গোলাম হিসাবে ভাড়া খাটাতে পারে—ঠিক যেন সে একটা ব্যক্তিগত অস্থাবর সম্পত্তি বা গোজাতীয় পশু। যদি গোলামেরা মনিবের বিরুদ্ধে কোনো কিছু চেষ্টা করে, তা হলেও তাদের ফাসী কাঠে প্রাণ দিতে হবে। শান্তিরক্ষী বিচারক’ (জাস্টিস অব দি পিস’) শিকারের মত সেই বদমাশদের খুঁজে বার করবে। যদি এমন ঘটে যে, একজন ভবঘুরে (Vagabond) কুড়েমি করে তিন দিন কাটিয়ে দিয়েছে, তাকে তার জন্মভূমিতে নিয়ে যাওয়া হবে, আগুন-গরম লাল-গনগনে এক লোহা দিয়ে তার বুকের উপরে একে দেয়া হবে ” এবং শিকল পরিয়ে দিয়ে কাজে লাগানো হবে রাস্তায় কিংবা অন্য কোনো খাটুনিতে। যদি ভবঘুরেটি তার জন্মভূমির ভুল ঠিকানা দিয়ে থাকে, তা হলে তাকে আজীবন এই জায়গার, এর অধিবাসীদের কিংবা পৌর-নিগমের গোলাম হয়ে থাকতে হবে, এবং তার গায়ে “S” অক্ষরটি ছাপ মেরে দেওয়া হবে। সকল মানুষেরই অধিকার আছে, ভবঘুরে দের ছেলেমেয়েদের নিয়ে যাবার এবং তাদের শিক্ষানবীশ হিসাবে কাজ করাবার ছেলে হলে ২৪ বছর বয়সের যুবক হওয়া পর্যন্ত আর মেয়ে হলে পরে ২০ বছর বয়সের যুবতী হওয়া পর্যন্ত। যদি তারা পালিয়ে যায়, তা হলে এই বয়স পর্যন্ত তারা হবে তাদের মনিবদের গোলাম; মনিবেরা যদি চায়, তা হলে তারা তাদের শিকল দিয়ে বেঁধে রাখতে পারে, চাবুক দিয়ে মারতে পারে ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রত্যেক মনিবই পারে তার গোলামের গলায়, হাতে বা পায়ে একটা লোহার বলয় পরিয়ে রাখতে, যাতে করে তাকে সহজেই চেনা যায় বা তার সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়।[১] এই বিধানটির শেষ অংশে সংস্থান রাখা হয়েছে যে, যদি কোন জায়গা বা লোক তাদের খাদ্য ও পানীয় যোগাতে এবং কাজ জোগাড় করে দিতে ইচ্ছুক থাকেন, সেই জায়গা বা লোক কিছু গরিব মানুষকে নিযুক্ত করতে পারে। এই ধরনের প্যারিশ-গোলাম ইংল্যাণ্ডে উনিশ শতকের অনেক কাল পর্যন্ত রাখা হয়েছে। তাদের বলা হত “চৌকিদার”।
এলিজাবেথ, ১৫৭২ : ১৩ বছরের কাছাকাছি বয়সের লাইসেন্সবিহীন ভিখারীদের কঠোর ভাবে বেত মারা হবে এবং বাঁ কানে দাগিয়ে দেওয়া হবে, যদি না কেউ তাদের দু বছরের জন্য কাজে নেয়; এই অপরাধ দ্বিতীয় বার করলে, তাদের বয়স যদি ১৮ বছরের বেশি হয়, তা হলে ফাসী দেওয়া হবে—যদি না কেউ তাদের দুবছরের জন্য কাজে নেয়; কিন্তু তৃতীয় বার অপরাধ করলে আর দয়া দেখানো হবে। না, জনস্বার্থের বিরোধী হিসাবে ফাসী দেওয়া হবে। অনুরূপ আইন : এলিজাবেথের ১৮ নং বিধান, অনুচ্ছেদ ১৩, এবং ১৫৯৭ সালের আরো একটি। [২]
প্রথম জেমস : ঘুরে ঘুরে ভিক্ষা করে এমন যে-কোন লোককে ঘোষণা করা হত বদমাশ এবং ভবঘুরে বলে। শান্তিরক্ষী বিচারকদের কর্তৃত্ব ছিল সংক্ষিপ্ত অধিবেশনে তাদের প্রকাশ্যে চাবুক মারানোর এবং প্রথম বারের অপরাধের জন্য ৬ মাসের কারাদণ্ড দেবার, দ্বিতীয় বারের অপরাধের জন্য ২ বছরের কারাদণ্ড দেবার। জেলে থাকা কালে ঐ বিচারকের বিবেচনা অনুযায়ী যত বার ঠিক মনে করা হবে, তাকে তত চাবুক মারা হবে। সংশোধনের অতীত ও বিপজ্জনক বলে বিবেচিত দুবৃত্তদের বাঁ হাতে “R” অক্ষরটি দাগিয়ে দেওয়া হবে এবং কঠোর শ্রমে নিয়োজিত করা হবে। এই আইনগুলি কার্যতঃ বলবৎ ছিল আঠারো শতকের সূচনাকাল পর্যন্ত, খারিজ করা হয় কেবল অ্যানের ১২ নং বিধানের দ্বারা, অনুচ্ছেদ ২৩।
একই রকমের আইন পাশ করা হয়েছিল ফ্রান্সে, যেখানে সতেরো শতকের মাঝা মাঝি প্যারিসে গড়ে উঠেছিল ভবঘুরেদের (ছন্নছাড়াদের) এক রাজা। এমন কি চতুর্দশ লুই-এর রাজত্বকালের গোড়ার দিকেও ১৬ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে কোন স্বাস্থ্যবান লোককে যদি কর্মহীন জীবনধারণের উপায়হীন অবস্থায় দেখা যেত, তাকে সরাসরি গোলাম হিসাবে দাঁড়-টানা জাহাজে পাঠিয়ে দেওয়া হত ( ১৭৭৭ সালের ১৩ই জুলাইয়ের অধ্যাদেশ)। নেদারল্যাণ্ডস-এর জন্য পঞ্চম চালস-এর আইন (অক্টোবর, ১৫৩৭), হল্যাণ্ডের রাজ্য ও শহরগুলির জন্য প্রথম বিধি (১০ মার্চ, ১৬১৪), ইউনাইটেড প্রভিন্সেস-এর “প্ল্যাকাট” (২৬শে জুন, ১৬৪৯) ইত্যাদি একই প্রকৃতির আইন।
এইভাবেই কৃষি-জনসংখ্যাকে, উৎকট ও বীভৎসআইনের সাহায্যে, প্রথম জোর করে জমি থেকে উৎখাত করা হল, বাড়ি-ঘর থেকে তাড়িয়ে দেয়া হল; তার পরে, চাবুক মেরে শায়েস্তা করা হল, দাগী করে দেওয়া হল এবং নিপীড়নে-নির্যাতনে মজুরি ব্যবস্থার নব-বিধানের জন্য তৈরি করে নেওয়া হয়।
