রবার্ট সমার্স-এর পূর্বোল্লিখিত বইটি প্রকাশের ১৮ বছর পরে, ১৮৬৬ সালের এপ্রিল মাসে, অধ্যাপক লিয়োন লেভি ‘সোসাইটি অব আর্টস-এ মেষ-চারণভূমির মৃগ বনে রূপান্তরের উপরে একটি বক্তৃতা করেন, যাতে তিনি স্কটিশ হাইল্যাণ্ডে ঘনায়মান সর্বনাশের ছবি আঁকেন। তিনি বলেন, “নিজনীকরণ এবং মেষ-চারণ ক্ষেত্রকে মৃগবনে রূপান্তরীকরণ—এই দুটি হল বিনা-ব্যয়ে আয়ের সর্বাপেক্ষা সুবিধাজনক পন্থা। মেষ চারণক্ষেত্রকে মৃগ-বনে রূপান্তরিত করা হাইল্যাণ্ডে বহুল প্রচলিত। জমিদারেরা একদিন যেমন মানুষদের নির্বাসিত করেছিল, আজ তেমন মেষদের নির্বাসিত করে নোতুন প্রজাদের স্বাগত জ্ঞাপন করে-বন্য পশু ও পালকযুক্ত পাখি। একজন ফফর শায়ারে ডালহৌসির আর্লের জমিদারি থেকে জন ও গ্রোটস অবধি হেঁটে যেতে পারেন, একবারও বনভূমি পরিত্যাগ না করে। এই বনগুলির অনেকগুলিতে শেয়াল, বন বিড়াল, পশমি-নেউল, নেউল, খাটাশ এবং আল্পাইন শশক বেশ সুপ্রাপ্য; অন্যদিকে ইদুর, কাঠবিড়ালী ও খরগোশ গ্রামে গ্রামে আশ্রয় নিয়েছে বিরাট বিরাট এলাকা, যে গুলিকে তথ্যগত বিবরণীতে বর্ণনা করা হয়েছে অতি উৎকৃষ্ট সমৃদ্ধ জমি হিসাবে, সেগুলিকে সর্বপ্রকার কৃষি ও উন্নয়ন থেকে রুদ্ধ করে রাখা হয়েছে এবং নিয়োজিত করা হয়েছে মুষ্টিমেয় মানুষের বছরে সামান্য কিছুদিনের কৌতুকের জন্য। ১৮৬৬ সালের ২রা জুনের ‘ইকনমিস্ট পত্রিকা লিখেছে, ‘সাদারল্যাণ্ডের একটি সবচেয়ে সুন্দর মেষ-চারণক্ষেত্র, এ বছর যার ইজারা শেষ হবার পরে বাৎসরিক ১,০০০ পাউণ্ড খাজনায় বন্দোবস্ত দেবার প্রস্তাব করা হয়েছিল, সেই মেষ-চারণক্ষেত্রটিকে রূপান্তরিত করা হচ্ছে মৃগ-বনে। এখানে আমরা প্রত্যক্ষ করছি সামন্ততন্ত্রের আধুনিক প্রবৃত্তিগুলি আজও কাজ করছে সেদিনের মত, যেদিন নর্মান-বিজেতা: ধ্বংস করেছিল তিরিশটি গ্রাম—সৃষ্টি করতে নয়া বন। ২০ লক্ষ একর সম্পূর্ণ রূপে পতিত’ অথচ তার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে স্কটল্যাণ্ডের সবচেয়ে উর্বর সব জমি। গ্লেন্টিট-এর প্রাকৃতিক দুর্বাদল ছিল পারে সবচেয়ে পুষ্টিকর ঘাস। বেন অল্ডারের হরিণ-বন ছিল বহু-বিস্তৃত ব্যাডেনক অঞ্চলের সর্বোত্তম বিচরণক্ষেত্র; ব্ল্যাক মাউন্টের একটা অংশ ছিল স্কটল্যাণ্ডে কালো-মুখো ভেড়ার সবচেয়ে ভাল চারণক্ষেত্র। নিছক কৌতুক-ক্রীড়ার জন্য স্কটল্যাণ্ডের কী বিরাট আয়তন জমিকে অনাবাদি ফেলে রাখা হয়েছে, তা বোঝা যায় যখন মনে করা যায় যে তা সমগ্র পার্থের সমান। বেন অল্ডারের বন-সম্পদের পরিমাণ থেকে কিছুটা ধারণা করা যায় এই সবলে আরোপিত উষরতা থেকে কী বিরাট ক্ষতি হয়েছে। এই জমি ১৫০০০ ভেড়ার তৃণ যোগাত। সমস্ত বনভূমিই অনুৎপাদনশীল। জার্মান সাগরের তলায় তা ডুবে থাকলেও একই ব্যাপার হত।”এই ধরনের তৈরী-কা উষরতা বা মরুভূমি আইনসভার সুদৃঢ় হস্তক্ষেপের সাহায্যে প্রতিরুদ্ধ হওয়া উচিত।
২৮. পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ থেকে উৎখাতদের বিরুদ্ধে রক্তাক্ত আইন-প্রণয়ন
অষ্টবিংশ অধ্যায়– পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ থেকে উৎখাতদের বিরুদ্ধে রক্তাক্ত আইন–প্রণয়ন
।।পার্লামেন্টের আইনের দ্বারা বলপূর্বক মজুরির হ্রাস-সাধ।।
সামন্ততান্ত্রিক পোস্তবর্গের বাহিনীগুলিকে ভেঙ্গে দেওয়া এবং জমি থেকে জনগণকে সবলে উৎখাত করার ফলে যে-সর্বহারা-সংখ্যার সৃষ্টি হল, সেই “মুক্ত” সর্বহারা-সংখ্যা যত দ্রুত বেগে বিশ্বের প্রাঙ্গণে নিক্ষিপ্ত হল, সম্ভবত সেই সংখ্যাকে তত দ্রুত নিজের মধ্যে ধারণ করার ক্ষমতা নবজাত ম্যানুফ্যাকচারগুলির ছিল না। অন্য দিকে, চিরাভ্যস্ত জীবন-যাত্রা থেকে আচমকা বিচ্ছিন্ন এই লোকগুলিও তেমন চটপট তাদের নোতুন পরিবেশের শৃংখলার সঙ্গে নিজেদেরকে মানিয়ে নিতে পারল না। তারা দলে দলে পরিণত হল ভিখারী, লুঠেরা ও ভবঘুরে—কিছুটা নিজেদের প্রবণতা থেকে কিন্তু বেশিটা ঘটনার প্রকোপ থেকে। এই কারণেই পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষে এবং গোটা ষোড়শ শতাব্দী ধরে গোটা ইউরোপ জুড়ে চলল ভবঘুরে-বৃত্তির বিরুদ্ধে রক্তাক্ত আইন-প্রণয়ন। বর্তমান শ্রমিক-শ্রেণীর পিতৃ-পুরুষদের দণ্ডিত হতে হল তাদের জোর করে ভবঘুরে ও নিঃষে রূপান্তরিত হবার দরুন। আইন তাদের গণ্য করল “স্বেচ্ছামূলক” অপরাধী হিসাবে এবং ধরে নিল যে, পুরনো অবস্থার অধীনে কাজ করা তাদের নিজেদের সদিচ্ছার উপরে নির্ভর করে, অথচ যে-অবস্থা এখন আর বিদ্যমান নেই।
ইংল্যাণ্ডে এই আইন-প্রণয়ন শুরু হল সপ্তম হেনরির আমল থেকে।
অষ্টম হেনরি, ১৫৩. বৃদ্ধ ও কাজ করতে অক্ষম ভিখারীরা পেল একটা করে ভিখারী ‘লাইসেন্স’। অন্য দিকে, শক্ত-সমর্থ ভবঘুরেদের জন্য বরাদ্দ হল কশাঘাত ও কারাবাস। তাদের বেঁধে দেওয়া হত গাড়ির পেছনে এবং ক্রমাগত চাবুক মারা হত যে-পর্যন্ত না তাদের শরীর থেকে রক্ত ঝরতে শুরু করত; তারপরে শপথ নিতে হত যে তারা ফিরে যাবে নিজ নিজ জন্মভূমিতে বা গত তিন বছর যেখানে বাস করেছে, সেখানে এবং নিজেদেরকে নিয়োজিত করবে শ্রমে।” কী কঠোর পরিহাস! অষ্টম হেনরির ২৭তম বিধানে পূর্বোক্ত আইনটির পুনরাবৃত্তি করা হল কিন্তু সেই সঙ্গে নতুন নোতুন ধারা যুক্ত করে তাকে আরো জোরদার করা হল। ভবঘুরেবৃত্তির জন্য দ্বিতীয় বার গ্রেফতার হলে আবার চাবুক মারা হবে এবং সেই সঙ্গে কানের অর্ধেকটা কেটে দেওয়া হবে; কিন্তু তৃতীয় বার ঋলন হলে লনকারীকে দাগী অপরাধী এবং সাধারণ স্বার্থের শক্ত হিসাবে ফাসী দেওয়া হবে।
