এটাই যথেষ্ট নয় যে সমাজের এক মেরুতে শ্রমের অবস্থাগুলি মূলধনের আকারে স্তুপীকৃত হল এবং অন্য মেরুতে দলে দলে মানুষ সমবেত হল—এমন সব মানুষ যাদের শ্রমশক্তি ছাড়া বেচবার মত আর কিছু নেই। এটাও যথেষ্ট নয় যে তারা তা স্বেচ্ছায় বিক্রি করতে বাধ্য হল। ধনতান্ত্রিক উৎপাদনে অগ্রগতি গড়ে তোলে এমন এক শ্রমিক শ্ৰেণী, যা শিক্ষা, ঐতিহ্য ও অভ্যাসের দরুন ঐ উৎপাদন-পদ্ধতির অবস্থাগুলিকে দেখে প্রকৃতির নিয়মাবলীর মত স্বতঃসিদ্ধ ঘটনা হিসাবে। ধনতান্ত্রিক উৎপাদন-পদ্ধতির সংগঠন যদি একরাব পূর্ণ বিকশিত হয়ে যায়, তা হলে তা সমস্ত প্রতিরোধের অবসান ঘটায়। একটি আপেক্ষিক উত্ত-জনসংখ্যার নিরন্তর প্রজনন শ্রমের যোগান ও চাহিদার নিয়মটির দাবি মেটায় এবং, স্বভাবতই, মজুরিকে ধরে রাখে এমন এক চাপের মধ্যে, যা মূলধনের প্রয়োজন সাধন করে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক-সমূহের নিরেট কর্তৃত্ব ধনিকের কাছে শ্রমিকের বশ্যতাকে সম্পূর্ণ করে তোলে। অর্থ নৈতিক অবস্থাবলীর বাইরে, প্রত্যক্ষ বলপ্রয়োগ অবশ্য তখনো ব্যবহার করা হয়, কিন্তু ব্যতিক্রম হিসাবে। মামুলি ঘটনা-প্রবাহে, শ্রমিককে ছেড়ে দেওয়া যায় “উৎপাদনের প্রাকৃতিক নিয়মাবলী”-র উপরে অর্থাৎ, মূলধনের উপরে তার নির্ভশীলতার উপরে-যে-নির্ভরশীলতার উদ্ভব ঘটে খোদ উৎপাদনের অবস্থাগুলি থেকেই এবং চিরস্থায়ীভাবে নিশ্চয়ীকৃত হয় সেগুলির দ্বারাই। ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের ঐতিহাসিক উৎপত্তিকালে ব্যাপারটা ভিন্নরকম। উদীয়মান বুর্জোয়া শ্রেণী চায় রাষ্ট্রের ক্ষমতার দ্বারা মজুরি নিয়ন্ত্রণ করতে, অর্থাৎ, উদ্বৃত্ত-মূল্য উৎপাদনের সীমার মধ্যে তাকে ধরে রাখতে, শ্রম-দিবসকে দীর্ঘতর করতে এবং স্বয়ং শ্রমিকে অধীনতার স্বাভাবিক মাত্রার মধ্যে বেঁধে রাখতে-বুর্জোয়া শ্রেণী এটা করতে চায় এবং করতে পারেও। আদিম সঞ্চয়নের এটা একটা আবশ্যিক উপাদান।
চতুর্দশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে যে মজুরিশ্রমিক শ্রেণীর উদ্ভব খটে, তারা তখন এবং তার পরবর্তী শতকে ছিল জনসংখ্যার কেবল একটি অত্যন্ত ক্ষুদ্র অংশ—এক দিকে গ্রামাঞ্চলে চাষীদের স্বাধীন স্বত্বাধিকারের দ্বারা এবং অন্য দিকে শহরে গিল্ড-সংগঠনের দ্বারা তারা তাদের অবস্থান ছিল সুরক্ষিত। গ্রামে এবং শহরে মনিব এবং শ্রমিক সামাজিক ভাবে ছিল খুব কাছাকাছি। মূলধনের কাছে শ্রমের বশ্যতা ছিল কেবল আনুষ্ঠানিক, অর্থাৎ, উৎপাদন-পদ্ধতির নিজেরাই তখনো ছিলনা কোন নির্দিষ্ট ধন তান্ত্রিক চরিত্র। স্থির মূলধনের তুলনায় অস্থির মূলধনের প্রাধান্য ছিল অনেক বেশি। সুতরাং, মূলধনের প্রত্যেকটি সঞ্চয়নের সঙ্গে মজুরি-শ্রমের চাহিদা বৃদ্ধি পেত, অন্য দিকে, শ্রমের মোগান তাকে অনুসরণ করত মন্থর গতিতে। জাতীয় উৎপাদনের একটা বৃহৎ অংশ—যা পরবর্তী কালে পরিবর্তিত হল ধনতান্ত্রিক সম্মনের ভাণ্ডারে তা তখন পর্যন্ত প্রবেশ করত শ্রমিকের পরিভোগ ভাণ্ডারে।
মজুরি-শ্রম সম্পর্কে আইন-প্রণয়ন ( শুরু থেকেই যার লক্ষ্য ছিল শ্রমিকের শোষণ এবং অগ্রগতির সঙ্গে যা থেকে গেল সমান ভাবে শ্রমিকের স্বার্থবিরোধী )[৩] ইংল্যাণ্ডে সূচিত হয় ১৩৪৯ সালে তৃতীয় এভোয়ার্ডের শ্রমিক-বিধি” (স্ট্যাটিউট অব লেবর”) প্রণয়ন থেকে। ১৩৫০ সালে ফ্রান্সে রাজা জন-এর নামে জারি করা অধ্যাদেশ এই “শ্রমিক-বিধি”-র অনুরূপ। ইংল্যাণ্ডে ও ফ্রান্সের আইন পাশাপাশি চলত এবং তাদের বিষয়বস্তুও হত অভিন্ন। কর্ম-দিবসের বাধ্যতামূলক সম্প্রসারণ-সংক্রান্ত শ্রম বিধি সম্পর্কে আমি আগেই আলোচনা করেছি (দশম অধ্যায়, তৃতীয় পরিচ্ছেদ); সুতরাং এখানে আর সে বিষয়ে ফিরে যাবনা।
‘শ্রমিক-বিধি’ গৃহীত হয়েছিল কমন সভার জরুরি উদ্যোগে। জনৈক টোরি সরল মনে বলেন, আগে গরিবেরা দাবি করত এত উচু মজুরি যে তাতে শিল্প ও সম্পদ বিপন্ন হত। পরে তাদের মজুরি হল এত নিচু যে তাতেও শিল্প ও মজুরি সমান ভাবে, বরং সম্ভবত, আরো বেশি ভাবে বিপন্ন হল, তবে অন্য দিক থেকে[৪] শহর এবং গ্রামের জন্য, জিনিস-পিছু এবং দিন-পিছু, এক মজুরি-তালিকা আইনের দ্বারা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হল। কৃষি-শ্রমিকদের নিজেদের ভাড়া খাটাতে হত বছরের জন্য, শহরের শ্রমিকদের “খোলা বাজারে”। আইনে যে-মজুরি নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে, তার চেয়ে বেশি দেওয়া নিষিদ্ধ ছিল, বেশি দিলে, ছিল কারাদণ্ডের বিধান; কিন্তু বেশি দেওয়ার চেয়ে বেশি নেওয়া ছিল আরো কঠোর ভাবে দণ্ডনীয়। (এলিজাবেথের ‘শিক্ষানবিশ বিধির ১৮ ও ১৯ ধারায় বেশি মজুরি-দাতার জন্য যেখানে ১০ দিনের কারাদণ্ডের ব্যবস্থা, সেখানে বেশি মজুরি-গ্রহীতার জন্য ব্যবস্থা ২১ দিনের কারাদণ্ডের। ১৩৪৪ সালের একটি বিধি এই দণ্ড আরো বর্ধিত করল এবং মনিবদের ক্ষমতা দিল দৈহিক শাস্তির সাহায্যে আইনতঃ ধার্য মজুরিতে শ্রম আদায় করে নিতে। রাজমিস্ত্রি ও ছুতোর-মিস্ত্রির যে-সব সন্মিলন, চুক্তি ও শপথের মাধ্যমে নিজেদেরকে পারস্পরিক বন্ধনে আবদ্ধ করে, সেগুলিকে অসিদ্ধ ও অবৈধ বলে ঘোষণা করা হল। চতুর্দশ শতাব্দী থেকে ১৮২৫ সাল পর্যন্ত শ্রমিকদের কোনো সম্মিলন ছিল বে-আইনী; ঐ বছরে ট্রেড ইউনিয়ন-বিরোধী আইন প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। ১৩৪৪ সালের শ্রম বিধি রএবং তার বিবিধ অনুবিধির আসল মর্মবাণী স্পষ্ট ভাবে প্রকট হয়ে পড়ে এই ঘটনায় যে, রাষ্ট্র মজুরির সর্বোচ্চ মাত্রা বেঁধে দিলনা।
