কিন্তু তাদের গোষ্ঠীর “মহাজন”-দের প্রতি তাদের আবেগপূর্ণ ও পার্বত্য দেবভক্তির জন্য ধীর গেইলদের আরো তিক্ত প্রায়শ্চিত্ত করা তখনো বাকি ছিল। তাদের মাছের গন্ধ তাদের “মহাজনদের নাকে গিয়ে পৌছাল। তারা তার মধ্যে কিছু মুনাফার গন্ধ পেল এবং লণ্ডনের বড় বড় মৎস্য-ব্যবসায়ীদের কাছে সমুদ্র-তীর ভাড়া দিয়ে দিল। দ্বিতীয় বারের মত গেইলদের শিকারের মত তাড়া করে দেওয়া হল।[৩১]
কিন্তু, সর্বশেষে, মেষ-চারণ-ভূমির অংশ বিশেষকে রূপান্তরিত করা হল মৃগ সংরক্ষণীতে। সকলেই জানা আছে যে, ইংল্যাণ্ডে কোনো সত্যিকারের বন নেই। বড় বড় লোকের বাগানে যেসব হরিণ থাকে, সেগুলি গৃহপালিত গবাদি পশুর মত শান্তশিষ্ট, লণ্ডনের পৌরপতিদের ( ‘অল্ডারম্যান’-দের) মত স্থূলকায়। সুতরাং স্কটল্যাণ্ডই হল এই “মহৎ আবেগ”-এর শেষ অবলম্বন। ১৮৪৮ সালে সমার্স বলেন, “নোতুন নোতুন বন ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে উঠছে।” এখানে গেইক-এর একধারে আপনি পাচ্ছেন গ্লেনফেশির নোতুন বন; এবং ওখানে আরেক ধারে পাচ্ছেন আর্ড ভেরিকির নোতুন বন। একই লাইনে আপনি পাচ্ছেন ব্ল্যাক মাউন্ট, এক বিশাল পতিত ভূখণ্ড, সম্প্রতি বনে রূপান্তরিত। পূর্ব থেকে পশ্চিমে—আবারভীনের প্রতিবেশ থেকে ওবানের পাহাড়ি অঞ্চল পর্যন্ত—আপনার কাছে এখন প্রসারিত বনের পর বনের এক একটানা লাইন; অন্য দিকে, হাইল্যাণ্ডস-এর অপরাপর অংশে বিরাজ করছে লচ আর্কেইগ, গ্ল্যোরি, গ্লেনমোরিস্ট ইত্যাদি জায়গার নোতুন নোতুন বনগুলি। যেসব নদী-বাহিত উপত্যকায় আগে ছিল মোট কৃষক-গোষ্ঠীর বসতি, সেখানে এখন আমদানি করা হয়েছে ভেড়ার পাল এবং ঐ কৃষকেরা তাড়িত হয়েছে আরো অপকৃষ্ট, আরো অনুর্বর জমিতে জীবিকার সন্ধান করতে। এখন হরিণ, ভেড়ার স্থান দখল করছে এবং তা আবার ছোট প্রজাদের বেদখল করে দিচ্ছে, যারা স্বভাবতই তাড়িত হল আরো অপকৃষ্ট জমিতে এবং আরো চরম দারিদ্র্যের নিষ্পেষণে। হরিণ-বন[৩২] এবং মানুষ জন এক সঙ্গে থাকতে পারে না। হয় একে, নয় ওকে জায়গা ছেড়ে দিতে হবেই। যেমন গত এক-চতুর্থ শতাব্দী ধরে বন বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমন আরো এক-চতুর্থ শতাব্দী ধরে তা বৃদ্ধি পাক, এবং গেইলরা তাদের জন্মভূমি থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাক।” হাইল্যাণ্ডস-এর স্বত্বাধিকারীদের মধ্যে এই তৎপরতা কিছু অংশের কাছে একটা আকাঙ্ক্ষা, কিছু অংশের কাছে মৃগয়া-প্রেম… আবার যারা আরো বাস্তব বুদ্ধিসম্পন্ন, এমন কিছু অংশের কাছে এটা একটা বৃত্তি যা তারা অবলম্বন করে একমাত্র মুনাফার দিকে নজর রেখে। কারণ এটা একটা ঘটনা যে, একটি পাহাড়-সারিকে মেষ-চারণ হিসাবে ভাড়া দেবার তুলনায় বনের মধ্যে একটি মৃগ-মৃগয়াক্ষেত্র মালিকের কাছে অনেক ক্ষেত্রেই বেশি মুনাফাজনক।… যে শিকারী হরিণ-বনের খোঁজে থাকে, সে কেবল তার টাকার থলির সীমা ছাড়া আর কোনো হিসাবের দ্বারাই তার আর্থিক প্রস্তাবকে সীমিত করে না। নর্মান রাজাদের অনুসৃত নীতি যে দুঃখ-দুর্দশা সৃষ্টি করেছিল, তার তুলনায় হাইল্যাণ্ডস এর উপরে চাপিয়ে দেওয়া দুঃখ-দুর্দশা বড় কম ছিল না। হরিণের বিচরণক্ষেত্র ক্রমেই আরো বৃদ্ধি পেয়েছে এবং মানুষকে ততই শিকারের মত তাড়া করে সংকীর্ণ থেকে আরো সংকীর্ণ বৃত্তের মধ্যে নিবদ্ধ করা হয়েছে। মানুষের অধিকারগুলিকে একটা একটা করে নাশ করা হয়েছে। এবং অত্যাচারও দিনের পর দিন বেড়ে চলেছে। আমেরিকা বা অস্ট্রেলিয়ায় পতিত জমিগুলি থেকে যেমন গাছপালা ও ঝোপঝাড় সাফ করে ফেলা হয়, তেমনি একটি স্থিরীকৃত নীতি হিসাবেই, একটি কৃষিগত আবশ্যিকতা হিসাবেই, স্বত্বাধিকারীরা মানুষজনকে সাফাই করার এবং ছড়িয়ে দেবার কর্মকাণ্ড অনুসরণ করে থাকে, এবং এই কর্মকাণ্ড চলতে থাকে ধীর-স্থির, ব্যবসায়িক পদ্ধতিতে। [৩৩]
গীর্জার অধিকারভুক্ত সম্পত্তি লুণ্ঠন, রাষ্ট্রের খাস-জমির প্রতারণামূলক আয়ত্তীকরণ, সাধারণ জমিগুলি সবলে অপহরণ, সামন্ততান্ত্রিক ও গোষ্ঠীগত সম্পত্তির জবর-দখল এবং বেপরোয়া সন্ত্রাস-সৃষ্টির মাধ্যমে সেগুলিকে আধুনিক ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে রূপান্তরিতকরণ-এইগুলিই হল আদিম সঞ্চয়নের সরল-নিস্পাপ বিভিন্ন পদ্ধতি। এইগুলিই ধনতান্ত্রিক কৃষিকার্যের জন্য ক্ষেত্ৰ-জয় করল, জমিকে মূলধনের অংশবিশেষে পরিণত করল এবং শহরের শিল্পগুলির জন্য সৃষ্টি করল একটি মুক্ত” ও আইনের আশ্রয়-বহির্ভূত সর্বহারা-শ্রেণী।
————
১. ক্ষুদ্র মালিকেরা, যারা নিজেদের ক্ষেত নিজেদের হাতে চাষ করত এবং মোটামুটি যোগ্যতা ভোগ করত, তারা তখন জাতির একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে করেছিল, যা তারা আজকে করেনা। যদি সে কালের সর্বশ্রেষ্ঠ পরিসংখ্যানমূলক লেখকদের বিশ্বাস করা যায়, তা হলে অন্তত ১০৬০,০০০ স্বত্বাধিকারী, তাদের পরিবারবর্গ সহ, নিশ্চয়ই ছিল সমগ্র জনসংখ্যার এক-সপ্তমাংশ; তারা তাদের জীবিকা সংগ্রহ করুত নিঃশর্ত স্বত্বভুক্ত ছোট ঘোট জমি থেকে। এই ক্ষুদে জমিদারদের গড় আয় ছিল বছরে ৬০ থেকে ৭০ পাউণ্ড। হিসাব করে দেখা গিয়েছিল যে, যারা নিজেদের জমি চাষ করত, তাদের সংখ্যা যারা অপরের জমি চাষ করত, তাদের চেয়ে বেশি ছিল। (মেকলে, ‘হিস্টরি অব ইংল্যাণ্ড, ১ম সং, পৃঃ ৩৩৩, ৩৩৪)। এমন কি সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ তৃতীয় ভাগেও ইংল্যাণ্ডের ৪ ভাগ মানুষ ছিল কৃষিজীবী (ঐ, ৪১৩)। আমি এখানে মেকলেকে উদ্ধৃত করছি কেননা ইতিহাস-বিকৃতকারী এই লোকটি এই ধরনের তথ্য যথাসম্ভব কম করেই দেখাবেন।
